ঈদের আগে আগুনে নিভে গেলো দুই পরিবারের স্বপ্ন
2026-03-20 - 04:31
২৮ বছর বয়সী মুনতাসির সোলায়মান আবিদ এবং ৫২ বছর বয়সের মোহাম্মদ ইউনুস। চট্টগ্রামের টেরিবাজারের কে বি অর্কিড প্লাজায় লাগা আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন তারা। সঙ্গে ভেঙে গেছে দুটি পরিবারের স্বপ্নও। বয়সে ফারাক থাকলেও স্বপ্ন ও কাজে দুজন সমান সমান। কিন্তু একটি আগুন কেড়ে নিয়েছে দুটি পরিবারের স্বপ্ন। আবিদ ওই মার্কেটের মিলানো সুজ নামের একটি দোকানে নৈশপ্রহরীর কাজ করতেন। দিনে আরেক প্রতিষ্ঠানে করতেন নিরাপত্তাপ্রহরীর কাজ। আর্থিক অনটনের মধ্যে সংসারে স্বচ্ছলতা আনার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন আবিদ। প্রস্তুতি চলছিল বিদেশ যাওয়ার। কিন্তু বিধিবাম। অন্যদিকে ইউনুস করতেন দর্জির কাজ। পুরো রমজানে অতিরিক্ত আয়ের আশায় করতেন নিয়মের চেয়েও বেশি কাজ। রমজানে বাড়ি যাওয়া হতো না। রাতভর কাজ করে, সেহরি ও ফজরের নামাজ আদায়ের পর ভবনটির ছয়তলার এবাদতখানায় দু-এক ঘণ্টা ঘুমাতেন তারা। বৃহস্পতিবার ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে ঘুম ভাঙে তাদের। কিন্তু অতিরিক্ত ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে নিস্তেজ হয়ে যান তারা। এক ঘণ্টার মধ্যে আগুন নির্বাপণ করে ছয়তলা থেকে তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত আবিদের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের পাচুরিয়া গ্রামে এবং মোহাম্মদ ইউনুসের বাড়ি একই উপজেলার জিরি সাইদাঁইর গ্রামের মির্জাবাড়িতে। একদিন পরই ঈদ। পরিবারের সবাই ঈদের আনন্দ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই আনন্দ বিষাদে পরিণত করেছে দুই পরিবারে উপার্জনক্ষম দুই ব্যক্তির নিহত হওয়ার ঘটনা। চট্টগ্রামের টেরিবাজারের কে বি অর্কিড প্লাজায় আগুনে দুইজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দুই পরিবারে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবিদ ও ইউনুস দুজনই দুই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম। আবিদের প্রতিবেশী শিক্ষক নাছির উদ্দীন বলেন, ‘আবিদ একটি সিকিউরিটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। বাড়তি উপার্জনের জন্য প্রতি বছর রমজানে টেরিবাজারের কোনো না কোনো দোকানে রাতের বেলা কাজ করতেন আবিদ। এবার আগুন লাগা মার্কেটটিতে একটি জুতার দোকানে চাকরি নিয়েছিলেন। সেহেরি খেয়ে মার্কেটের ষষ্ঠতলায় এবাদতখানায় ঘুমাতে যান। আগুন লেগেছিল ওই ভবনের চতুর্থতলায়। কিন্তু আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।’ আরও পড়ুন চট্টগ্রামে বহুতল ভবনে আগুনে প্রাণ গেলো দুইজনের টেরিবাজারে অগ্নিকাণ্ড: নিহতদের প্রতি শোক জানিয়ে সহায়তার আশ্বাস মেয়রের তিনি বলেন, ‘আবিদ দুই বছর আগে বিয়ে করেন। তিন মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। এবার সন্তানকে নিয়ে প্রথম ঈদ করার কথা ছিল তার। বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। তাই অতিরিক্ত কিছু আয়ের জন্য রাতদিন খাটুনি করে আসছিলেন। এখন পুরো পরিবারের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।’ অন্যদিকে দর্জি বাবার হাত ধরেই এ পেশায় জড়ান ইউনুস। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে নগরীর টেরিবাজারে দর্জির কাজ করতেন। পুরো রমজানে শতশত মানুষের জামা তৈরি হয়েছে ইউনুসের হাত দিয়ে। ইউনুসের হাতে বানানো জামা পরে অনেকে যখন ঈদ আনন্দ করবেন তখন তার পরিবারে বইবে চাপা কান্না। তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জনক ইউনুস। ইউনুসের একমাত্র মেয়ের জামাই মোহাম্মদ রাশেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার শ্বশুর টেরিবাজারের পাকিজা টেইলার্সে দর্জির মাস্টার হিসেবে কাজ করতেন। সারারাত কাজ করে সেহেরি খেয়ে অর্কিড প্লাজার ষষ্ঠতলার এবাদতখানায় ঘুমাতে গিয়েছিলেন। আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।’ রাশেদ জানান, বছরের পুরো সময় পটিয়া থেকে আসা-যাওয়া করলেও রমজানের পুরো মাস কর্মস্থলেই থাকতেন তিনি। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক আবদুল মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের দুটি স্টেশনের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। মার্কেট-কাম-রেসিডেন্স টাইপের ১২ তলা ভবনটির চতুর্থতলায় আগুন লাগে। আমরা ওই ফ্লোরেই আগুনকে সীমাবদ্ধ রাখতে সক্ষম হই।’ তিনি বলেন, ‘অর্কিড প্লাজার চতুর্থতলায় আগুন লাগলেও ভেন্টিলেশন না থাকায় কয়েকটি ফ্লোরে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। আমরা ছয়তলার মসজিদ থেকে তিনজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠাই। মূলত ধোঁয়ার কারণে তারা আটকা পড়েছিলেন এবং শ্বাসকষ্টে মারা যান।’ এমডিআইএইচ/বিএ