শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে যে সব ভুল এড়ানো জরুরি
2026-03-23 - 05:41
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পদ গড়ার সম্ভাবনা অপার। তবে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখেও পড়েন। বাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সাধারণ ভুল এড়াতে পারলেই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব এবং বিনিয়োগ হতে পারে আরও নিরাপদ ও লাভজনক। বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো গুজবনির্ভর বিনিয়োগ। বাজারে প্রায়ই ‘ইনসাইড’ তথ্য বা দ্রুত লাভের প্রলোভন দেখিয়ে নানা ধরনের খবর ছড়ানো হয়। যাচাই-বাছাই ছাড়া এসব তথ্যের ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ করলে বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়। না বুঝে বিনিয়োগ করাও বিনিয়োগকারীদের একটি সাধারণ ভুল। অনেকেই কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসার ধরন কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশ্লেষণ না করেই শেয়ার কিনে ফেলেন। এতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং প্রত্যাশিত রিটার্ন পাওয়া কঠিন হয়। একক খাত বা একটি কোম্পানিতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করাও বড় ঝুঁকির কারণ। কোনো নির্দিষ্ট খাতে মন্দা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। তাই বিনিয়োগ বৈচিত্র্য বা ডাইভারসিফিকেশন নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে অনেক বিনিয়োগকারী অন্যের কথায় বা গুজবের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করেন। এটি বড় ধরনের ভুল। বাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী হয়, তখন অনেকেই দেরিতে প্রবেশ করেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।-ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় অতিরিক্ত কেনাবেচা বা ট্রেডিংও অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামায় বিচলিত হয়ে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিলে বিনিয়োগকারীরা লোকসানের মুখে পড়েন। এ ক্ষেত্রে ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবই প্রধান সমস্যা। বিনিয়োগে মানসিকতার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লোভ ও আতঙ্ক- এই দুই প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের বড় ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়। দাম বাড়লে অতিরিক্ত লোভে উচ্চ দামে শেয়ার কেনা ও দাম কমলে আতঙ্কে কম দামে বিক্রি করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোম্পানির স্পন্সর ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং স্বচ্ছতা যাচাই না করাও একটি বড় ভুল। একটি কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের সততা, অভিজ্ঞতা ও অতীত রেকর্ড ভবিষ্যৎ পারফরম্যান্সে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষণ না করলেও বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। গুজবের ভিত্তিতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা ঠিক না। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, অতীত পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কোম্পানির সঙ্গে কারা আছেন এসব তথ্যসহ সার্বিক তথ্য ভালো করে যাচাই-বাছাই করা উচিত।-ডিএসইর সাবেক পরিচালক মো. শাকিল রিজভী অতীত পারফরম্যান্স মূল্যায়ন না করাও বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। নিয়মিত ডিভিডেন্ড প্রদান, আয়ের প্রবৃদ্ধি, পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও কোনো আইনি জটিলতা রয়েছে কি না তা বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি। অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারকে ব্যাংকের মতো নিরাপদ মনে করেন, যা একটি ভুল ধারণা। শেয়ারবাজারে ঝুঁকি বেশি এবং ভুল সিদ্ধান্তে অল্প সময়েই বড় ক্ষতি হতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাজার অনুকূলে না থাকলে ঋণের চাপ বিনিয়োগকারীর আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের এ ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাজারের নীতিগত পরিবর্তন, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তগুলো বিনিয়োগে প্রভাব ফেলতে পারে। এসব বিষয়ে নজর না রাখাও বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সার্বিকভাবে বলা যায়, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কোনো জুয়া নয়, এটি একটি পরিকল্পিত আর্থিক কার্যক্রম। যথাযথ জ্ঞান, বিশ্লেষণ, ধৈর্য ও সচেতনতার মাধ্যমে বিনিয়োগ করলে সফলতা অর্জন সম্ভব। অন্যথায়, হঠকারী সিদ্ধান্তই বিনিয়োগকারীদের বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা কোন ধরনের ভুল বেশি করেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক বিনিয়োগকারী অন্যের কথায় বা গুজবের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করেন। এটি বড় ধরনের ভুল। বাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী হয়, তখন অনেকেই দেরিতে প্রবেশ করেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।’ তিনি বলেন, ‘শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ খুবই গুরুত্বাপূর্ণ। কোনো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের আগে সেই কোম্পানির স্পন্সর ও ব্যবস্থাপনা কতটা দক্ষ ও স্বচ্ছ তা যাচাই করা জরুরি। ম্যানেজমেন্টের সততা, অভিজ্ঞতা ও অতীত কর্মকাণ্ড কোম্পানির ভবিষ্যৎ পারফরম্যান্সে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।’ ‘যে খাতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, সে খাত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা না থাকলে অভিজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। অজ্ঞতাবশত বিনিয়োগ করা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘অনেকেই শেয়ারবাজারকে ব্যাংকের মতো নিরাপদ মনে করেন, যা ভুল ধারণা। ব্যাংকে জমা রাখা টাকার একটি নিরাপত্তা থাকে, কিন্তু শেয়ারবাজারে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে অল্প সময়েই বিনিয়োগের বড় অংশ হারানোর ঝুঁকি থাকে।’ ঋণ করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা কতটা সঠিক সিদ্ধান্ত- এমন প্রশ্নের উত্তরে সাইফুল ইসলাম বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে আমি ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করাকে সব সময় নিরুৎসাহিত করি। ১৫ শতাংশ হারে সুদ দিয়ে এই মার্কেটে লাভ করা কঠিন। দুই-চারজন হয় তো মুনাফা করতে পারে, বেশিরভাগই মুনাফার দেখা পায় না।’ ডিএসইর সাবেক পরিচালক মো. শাকিল রিজভী বলেন, ‘গুজবের ভিত্তিতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা ঠিক না। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, অতীত পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কোম্পানির সঙ্গে কারা আছেন এসব তথ্যসহ সার্বিক তথ্য ভালো করে যাচাই-বাছাই করা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঋণ পরিহার করে, উদ্বৃত্ত অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত। কোনো পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ অর্থ একবারে বিনিয়োগ করা ঠিক না। বিনিয়োগের আগে সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পোর্টফোলিও সাজাতে পারলে শেয়ারবাজার থেকে ভালো মুনাফা করা সম্ভব।’ এমএএস/এএসএ