ব্যবসায়ী সংগঠনে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত, তবে বিজিএমইএতে দৃষ্টান্ত
2026-03-08 - 09:24
বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে কর্মে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য উৎপাদন শিল্পে নারীরা এখন বড় একটি কর্মশক্তি। তাদের শ্রম ও অবদান দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে উৎপাদন খাতে এই দৃশ্যমান উপস্থিতি ব্যবসায়ী সংগঠন যেমন ফেডারেশন এবং অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে তেমনভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বিভিন্ন ফেডারেশন, চেম্বার ও ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালনা পর্ষদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনো খুবই সীমিত। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ বোর্ডেই নারী সদস্যের সংখ্যা খুব কম, আবার কোথাও কোথাও কোনো নারী পরিচালকই নেই। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) ১৮ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে কোনো নারী পরিচালক নেই। একইভাবে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) ৩৫ সদস্যের বোর্ডেও কোনো নারী পরিচালক নেই। এমসিসিআইর সহসভাপতি সিমিন রহমান (বাঁয়ে) ও পরিচালক উজমা চৌধুরী, ছবি: সংগৃহীত অন্যদিকে, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) ১৫ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে মাত্র দুইজন নারী পরিচালক রয়েছেন। সহসভাপতি হিসেবে রয়েছেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান এবং পরিচালক হিসেবে রয়েছেন মেঘনা ব্যাংকের চেয়ারপারসন ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (অর্থ) উজমা চৌধুরী। ফিকির সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী (বাঁয়ে) ও পরিচালক রুবাবা দৌলা, ছবি: সংগৃহীত ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) ১৬ সদস্যের বোর্ডে নারীর সংখ্যা দুইজন। এ প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুপালী হক চৌধুরী। পরিচালক হিসেবে আছেন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ওরাকলের বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর রুবাবা দৌলা। বিসিআইর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী (বাঁয়ে) ও পরিচালক রেহানা রহমান, ছবি: সংগৃহীত বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) ২৪ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে নারী পরিচালক আছেন দুইজন। এখানে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হিসেবে আছেন ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী। পরিচালক হিসেবে আছেন সিনোটেক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেহানা রহমান। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) ২৭ সদস্যের বোর্ডে তিনজন নারী পরিচালক রয়েছেন। মুন্নু ফেব্রিকস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আফরোজা খানম রিতা, স্কয়ার ফ্যাশন ইয়ার্নস লিমিটেডের পরিচালক সঞ্চিয়া চৌধুরী এবং ইসমাইল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাদ গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর-ই-ইয়াসমিন ফাতিমা। আফরোজা খানম রিতা, নূর-ই-ইয়াসমিন ফাতিমা ও সঞ্চিয়া চৌধুরী (বাঁ থেকে), ছবি: সংগৃহীত এদের মধ্যে আফরোজা খানম রিতা বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মুন্নু গ্রুপ ও সহযোগী সব প্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগ করেছেন। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) তুলনামূলকভাবে একটি ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছে। সংগঠনটির ৩৫ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে বর্তমানে পাঁচজন নারী পরিচালক রয়েছেন, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। পাঁচজনের একজন সহসভাপতি। বিজিএমইএর ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক, যা নারী নেতৃত্বের বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিজিএমইএতে সহসভাপতি হিসেবে আছেন দেশ গার্মেন্টস লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যারিস্টার ভিদিয়া অমৃত খান। পরিচালক হিসেবে যমুনা ডেনিমস লিমিটেডের পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, মাসকো ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের পরিচালক ফাহিমা আখতার, রুমানা ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুমানা রশিদ ও শাইনেস্ট অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিহা আজিম। বিজিএমইএর সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান, পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, রুমানা রশিদ, ফাহিমা আখতার ও সামিহা আজিম (বাঁ থেকে), ছবি: সংগৃহীত বিজিএমইএতে আগে একজন নারী সভাপতি থাকলেও ৩৫ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে সর্বোচ্চ মাত্র দুইজন নারী পরিচালক ছিলেন। তবে একসঙ্গে এইবারই সর্বোচ্চ। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, বোর্ডে পাঁচজন নারী সদস্যের থাকা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং নারী নেতৃত্বের প্রসারে একটি গঠনমূলক বার্তা বহন করে। এটি তৈরি পোশাকশিল্পে নেতৃত্বের পরিসরকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলেছে। যারা বোর্ডে আছেন তারা কেবল পরিচয়ের জোরে নয়, নিজ নিজ যোগ্যতায় এই অবস্থানে এসেছেন। বিশেষ করে ‘সেকেন্ড জেনারেশন’ উদ্যোক্তা হিসেবে তাদের উঠে আসা আমাদের শিল্প খাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, তারা ভালো করছেন। এই বিশ্বাস ও আস্থা নারী নেতৃত্ব বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন দৃষ্টিভঙ্গি শুধু সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করবে না, বরং শিল্প খাতে কর্মরত লাখো নারীর জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। ‘শিল্পখাতে আমাদের এই প্রতিনিধিত্ব নিঃসন্দেহে দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম ও আন্তরিক প্রচেষ্টার ফল। আমরা দক্ষতা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করি, আর সদস্যরা আমাদের ওপর আস্থা রেখেই নেতৃত্বের জন্য নির্বাচন করেছেন’, বলে জানান বিজিএমইএ সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান। তিনি বলেন, ‘আমরা বোর্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি এবং শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে নানা ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছি, যাতে তারা দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্পে টিকে থাকতে পারে এবং তাদের পুরুষ সহকর্মীদের মতোই ভবিষ্যতে শিল্পের নেতৃত্বে উঠে আসতে পারে।’ অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পরিচালনা পর্ষদে নারীর উপস্থিতি বাড়লে নারী উদ্যোক্তাদের কণ্ঠস্বর হবে আরও জোরালো, বিশেষ করে তাদের অধিকার ও ন্যায্য দাবির পক্ষে। শ্রমিকদেরও বিশ্বাস, নারী পরিচালকরা তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সমস্যাগুলো তুলে ধরবেন এবং একটি নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। নারীর কর্মপরিবেশের প্রতীকি ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি ‘একজন নারীই আরেকজন নারী শ্রমিকের প্রয়োজন, কষ্ট আর বাস্তবতা সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারেন। কারণ তারা নিজেরাও একই রকম অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এসেছেন। সেই অনুভব থেকেই আমরা বিশ্বাস করি, নারী পরিচালকরা আমাদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল ও বন্ধুভাবাপন্ন হবেন’, বলে মন্তব্য করেছেন, রুবিনা ইসলাম নামের এক পোশাকশ্রমিক, যিনি মিরপুরের ভিশন গ্রুপের একটি কারখানায় কাজ করেন। তিনি আরও বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্তি আমাদের আশাবাদী করেছে। তারা নিশ্চয়ই শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করবেন এবং আমাদের অধিকার রক্ষায় পুরুষ পরিচালকদের চেয়ে বেশি আন্তরিক হবেন।’ ‘বিজিএমইএর বোর্ডে পাঁচজন নারী পরিচালক অবশ্যই প্রশংসনীয়। দীর্ঘদিনের পুরুষপ্রধান মালিকানার ধরন এবার পরিবর্তনের পথে হেঁটেছে, এবং নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী উদ্যোক্তাকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের সমান সুযোগ দিতে হবে কাজ করার ক্ষেত্রে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে উৎসাহী করতে হবে’, বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। ‘তবে শুধু বিজিএমইএর বোর্ডে নয়, এই ধরনের উপস্থিতি দেশের সব ফেডারেশন, চেম্বার ও ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালনা পর্ষদে থাকা উচিত। আমি মনে করি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য নারীদের সব সুবিধা ন্যায্যতার ভিত্তিতে দেওয়া হলে নারীর ক্ষমতায়ন হবে।’ আইএইচও/এমএমএআর