যুদ্ধের আগুনে জ্বালানি বাজার, বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটুকু?
2026-03-06 - 05:23
বিশ্ব মানচিত্রে সরু নীল একটি রেখা; কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতির শিরায়-উপশিরায় যার স্পন্দন। সেই হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা আসার পর থেকে বাংলাদেশে আতঙ্কের ঢেউ চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তা অনুভব করা যায় বন্দর এলাকার গুদামে, শিল্পকারখানার উৎপাদন লাইনে, ব্যাংকের এলসি ডেস্কে, এমনকি নিত্যপণ্যের বাজারে। দূরবর্তী এক সমুদ্রপথে সামরিক হুঁশিয়ারি আমাদের জন্য কেন এত বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজকের লেখা। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা-পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ৩৩ থেকে ৪০ কিলোমিটার। এই সংকীর্ণ জলরেখা দিয়ে প্রতিদিন গড়ে দুই কোটি ব্যারেল তেল চলাচল করে। এ তথ্য শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি বিশ্ববাজারের জ্বালানি-দামের থার্মোমিটার। ঘোষণার একদিনের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, এই উথালপাতাল ঢেউ বাংলাদেশে কতটা আছড়ে পড়বে? প্রথম ধাক্কা এসেছে বাণিজ্যে। মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে ওই অঞ্চল থেকে; রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের। সংখ্যাগুলো শুনতে শুষ্ক, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে হাজারো কারখানা, লক্ষাধিক শ্রমিক, অগণিত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জীবন-জীবিকা। হরমুজ ঘিরে অনিশ্চয়তার পর শিপিং লাইনগুলো বুকিং স্থগিত করেছে। চট্টগ্রাম বন্দর, বেসরকারি ডিপো, এমনকি কলম্বোতেও কনটেইনার আটকে আছে। এক হাজারের বেশি কনটেইনার জটের খবর। এ শুধু পণ্য আটকে থাকা নয়, নগদ প্রবাহ থেমে যাওয়া। খাদ্যপণ্য, পানীয়, তৈরি পোশাক, হিমায়িত মাছ সবখানেই থমকে থাকা। বড় শিল্পগোষ্ঠীর শত শত কনটেইনার বিভিন্ন বন্দরে পড়ে আছে; ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকেরা আরও বেশি ঝুঁকিতে। তাদের পণ্য মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আশঙ্কা, ব্যাংক ঋণের কিস্তি, শ্রমিকের বেতন সব মিলিয়ে অচলাবস্থার প্রতিটি দিন তাদের জন্য ক্ষতির অঙ্ক বাড়াচ্ছে। ক্রেতারা নতুন ক্রয়াদেশ স্থগিত করছেন; কেউ কেউ পাঠানো পণ্যও না নিতে বলছেন। যুদ্ধের অভিঘাত এমনই, গোলার শব্দের চেয়ে অনিশ্চয়তার শব্দ অনেক সময় বেশি বিধ্বংসী। তবে সব আলোচনার কেন্দ্রে জ্বালানি। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন জ্বালানি তেল ব্যবহার করে। এর বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সরকারি সূত্র বলছে, ডিজেলের মজুত আছে প্রায় ১৫ দিনের; কেরোসিন ১০০ দিনের; অকটেন ২০-২৫ দিনের; ফার্নেস অয়েল ৯০ দিনের। এলএনজির ক্ষেত্রেও কিছু কার্গো ইতোমধ্যে হরমুজ পেরিয়ে এসেছে, কয়েকটি নিয়ে সংশয় আছে। আপাতত ‘অচিরে সংকট’ নেই- এ কথা স্বস্তিদায়ক। কিন্তু যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়? জ্বালানি কেবল গাড়ি চালায় না; এটি চালায় কারখানা, সেচপাম্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিবহনব্যবস্থা। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে; পরিবহন খরচ বাড়লে খাদ্য থেকে পোশাক সবকিছুর দাম বাড়ে। মূল্যস্ফীতি এমনিতেই চাপে; তার ওপর জ্বালানির ধাক্কা মানে বহুমাত্রিক অভিঘাত। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যায়। ক্রেতারা বিকল্প বাজারে ঝুঁকতে পারেন। আবার আমদানিনির্ভর কাঁচামালের দাম বাড়লে শিল্পে চাপ বাড়ে। অর্থনীতির প্রতিটি সূচক একে অন্যের সঙ্গে গাঁথা; একটি টান পড়লে গোটা জাল কেঁপে ওঠে। এখানে একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে: হরমুজ প্রণালী সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে সাধারণ পণ্য রপ্তানির প্রধান পথ না হলেও জ্বালানি পরিবহনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সরাসরি কনটেইনার রপ্তানি সাময়িকভাবে বিকল্প রুটে ঘুরে যেতে পারলেও জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা এড়ানো কঠিন। আর জ্বালানি-অস্থিরতা মানেই সার্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন উঠছে, বিকল্প কী? এলএনজির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে; অস্ট্রেলিয়া, অ্যাঙ্গোলা, মালয়েশিয়ার মতো উৎসের কথাও বলা হচ্ছে। তেলের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে কয়েকটি দেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আসে। কিন্তু বৈশ্বিক চাহিদা যদি হঠাৎ বেড়ে যায়, সব দেশ যদি একই সময়ে বিকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ে তবে দাম বাড়বে, সরবরাহও টানাটানি হবে। বাজারের এই বাস্তবতা আমাদের বুঝতে হবে। এই সংকট তাই কেবল তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি কৌশলগত প্রস্তুতির প্রশ্ন। প্রথমত, জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ‘ডে-টু-ডে’ আমদানি নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ; খাদ্য ও জ্বালানি দুই ক্ষেত্রেই। দ্বিতীয়ত, সরবরাহ উৎসের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে চুক্তি কাঠামোতে নমনীয়তা এনে। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন আর কেবল পরিবেশবান্ধবতার বিষয় নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তারও বিষয়। সৌর, বায়ু, এমনকি আঞ্চলিক বিদ্যুৎবাণিজ্য সব বিকল্প খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। হরমুজ প্রণালি তাই কেবল একটি সমুদ্রপথ নয়; এটি আমাদের অর্থনীতির দুর্বলতার আয়না। আমরা কতটা আমদানিনির্ভর, কতটা জ্বালানিনির্ভর, কতটা অল্প মজুতে চলি এই প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে। সংকটের মধ্যেই সুযোগ লুকিয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল, বাজার বহুমুখীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন; এসব পদক্ষেপ এখনই নেওয়া গেলে ভবিষ্যতের ধাক্কা সামাল দেওয়া সহজ হবে। দূরের যুদ্ধ আমাদের ঘরের হিসাব বদলে দেয়- এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও প্রস্তুতি দরকার। মধ্যপ্রাচ্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার, কিন্তু একমাত্র নয়। রপ্তানির বাজার বহুমুখীকরণে যে উদ্যোগ বহুবছর ধরে আলোচনায়, তা বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে। একই সঙ্গে লজিস্টিক অবকাঠামো শক্তিশালী করা, কোল্ড-চেইন উন্নত করা, বিমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো আধুনিক করা- এসব পদক্ষেপ ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের সুরক্ষা দেবে। সরকারের করণীয় এখানেই শেষ নয়। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে দ্রুত পরামর্শ, বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ, বাজারে স্বচ্ছ বার্তা এসবই আস্থা তৈরির পূর্বশর্ত। গুজবের বাজার অর্থনীতির জন্য বিষের মতো; তাই তথ্যপ্রবাহ স্বচ্ছ রাখতে হবে। জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা জনগণকে জানাতে হবে। প্রয়োজনে সাময়িক ভর্তুকি বা শুল্ক-সমন্বয়ের মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সীমিত রাখা যায়। এই সংকট আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়, ভূরাজনীতি থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন নই। দূরবর্তী সমুদ্রপথে উত্তেজনা মানেই ঢাকার বাজারে চাপ। তাই কূটনৈতিক তৎপরতাও গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করে সরবরাহ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া এসবও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার অংশ। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, অতীতে ইরান বহুবার হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুঁশিয়ারি দিলেও বাস্তবে পুরোপুরি বন্ধ করেনি। বর্তমান পরিস্থিতিও কত দূর গড়াবে, তা নিশ্চিত নয়। যুদ্ধ থেমে গেলে বাজার দ্রুত স্বাভাবিকও হতে পারে। কিন্তু নীতি নির্ধারণে আশাবাদ নয়, প্রস্তুতিই হওয়া উচিত ভিত্তি। ‘হয়তো কিছু হবে না’ এই ভরসা নিয়ে অর্থনীতি চালানো যায় না। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মনস্তাত্ত্বিক। অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকে থামায়, ভোক্তার আস্থা কমায়, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। তাই সরকার, ব্যবসায়ী ও আর্থিক খাতকে সমন্বিত বার্তা দিতে হবে- মজুত পরিস্থিতি, বিকল্প উৎস, সরবরাহ পরিকল্পনা সবকিছু নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান। আস্থা ফিরলে বাজারও স্থিতিশীল থাকে। হরমুজ প্রণালি তাই কেবল একটি সমুদ্রপথ নয়; এটি আমাদের অর্থনীতির দুর্বলতার আয়না। আমরা কতটা আমদানিনির্ভর, কতটা জ্বালানিনির্ভর, কতটা অল্প মজুতে চলি এই প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে। সংকটের মধ্যেই সুযোগ লুকিয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল, বাজার বহুমুখীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন; এসব পদক্ষেপ এখনই নেওয়া গেলে ভবিষ্যতের ধাক্কা সামাল দেওয়া সহজ হবে। দূরের যুদ্ধ আমাদের ঘরের হিসাব বদলে দেয়- এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বিচক্ষণ পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং স্বচ্ছ নীতির মাধ্যমে সেই ধাক্কাকে সীমিত রাখা সম্ভব। লেখক : ন্যাশনাল এসোসিয়েট এন্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর। এইচআর/জেআইএম