হানা স্পেনসার ও এক শিশুর কাছে অঙ্গীকার
2026-03-05 - 09:23
“এখন, আমার গ্রাহকদের কাছে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি—আপনারা যে কাজটি করানোর জন্য আমাকে বুক করেছিলেন, সেটি আমাকে বাতিল করতে হতে পারে; কারণ আমি সংসদে যাচ্ছি। সেখানে পৌঁছে আমি আমার মতো কাজ করা সবার জন্য জায়গা করে দেব। অবশেষে আমরাও সিদ্ধান্তের টেবিলে একটি আসন পাব।” বিজয়ের রাতে এই কথাগুলো উচ্চারণ করেন ৩৪ বছর বয়সী এক প্লাম্বার—গ্যাস, লোহা ও প্লাস্টিকের পাইপ নিয়ে দিনযাপন করা এক কায়িক শ্রমজীবী নারী। ২৬ মার্চ যুক্তরাজ্যের উপনির্বাচনে নর্থ ইংল্যান্ডের ডেন্টন-গর্টন আসন থেকে Green Party of England and Wales–এর প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে পঞ্চম সাংসদ হিসেবে তিনি ইতিহাসে নাম লেখান। লেবার-অধ্যুষিত অঞ্চলে এক শ্রমজীবী নারীর এই উত্থান কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রাভিমুখে এক প্রান্তিক কণ্ঠের প্রবেশ। লেবার-দুর্গে সবুজের উত্থান ডেন্টন-গর্টন—উত্তর ইংল্যান্ডের লেবার-অধ্যুষিত এলাকা। বহু বছর ধরেই এখানে লেবারের জয়-জয়কার। মাত্র এক বছর আগে এই আসনে বিপুল ব্যবধানে জিতেছিলেন Andrew Gwynne। কিন্তু একটি হোয়াটসঅ্যাপ কেলেঙ্কারির জেরে পদত্যাগে বাধ্য হলে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়। সেই সুযোগে হানা স্পেনসার কেবল ব্যবধান ঘোচাননি; বরং লেবারের প্রার্থীর চেয়ে প্রায় ৫,৬১৬ ভোট বেশি পেয়ে জয় নিশ্চিত করেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে হানা স্পেনসারের আরোহন কেবল একটি আসনের জয় নয়; এটি মূলধারার রাজনীতিতে সবুজের পদধ্বনি। দীর্ঘদিনের দুই-দলীয় আধিপত্যের ভেতর শ্রমজীবী কণ্ঠের সরাসরি প্রবেশ এক নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দেয়।ডেন্টন-গর্টনের মানুষ যেমন প্রত্যাশা করছেন তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের প্রশ্নগুলো এবার সংসদের টেবিলে উঠবে, তেমনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকরাও দেখছেন—বিভাজন ও শোষণের রাজনীতির বাইরে অন্য এক সম্ভাবনা আছে। এই বিজয়ে কোনো চমকপ্রদ ব্যক্তিত্ব-নির্ভর প্রচারণা ছিল না, ছিল না সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ। ছিল নিত্যদিনের প্রশ্ন—গ্যাসের বিল, বিদ্যুতের দাম, স্কুলের খরচ, চিকিৎসার প্রাপ্যতা, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা। দীর্ঘদিনের ‘লেবার বনাম টোরি’ দ্বৈরথের বাইরে গিয়ে ভোটাররা যেন বললেন—কঠোর পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য চাই। রিফর্ম ইউকের মতো জাতিবিদ্বেষী রাজনৈতিক শক্তিকেও এই আসনে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, তবে তারা দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল । পরিচিত সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক প্রার্থীকে হারিয়ে এক ‘নিবেদিতপ্রাণ প্লাম্বার’ সংসদে যাচ্ছেন—এই প্রতীকী ছবিটিই উপনির্বাচনের মূল বার্তা। “আমার মুসলিম বন্ধু ও প্রতিবেশীরা আমার মতোই—মানুষ” বিজয়ী ভাষণে হানা বারবার আবেগাপ্লুত হয়েছেন। বিশেষ করে রমজানের সময় স্থানীয় এক মসজিদে হামলার চেষ্টার প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। তিনি বলেন, লংজাইটের একটি মসজিদে নারীদের সঙ্গে ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখন কাছেই কুঠার হাতে একজন ঢুকে পড়ে অন্য মসজিদে। বড় কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেনি—কিন্তু সম্ভাবনা যথেষ্ট ছিল শঙ্কার। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সমাজের সব সমস্যার জন্য যে রাজনীতি বারবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বলির পাঁঠা বানায়, তাদের বিরুদ্ধে তিনি কথা বলবেন। “আমার মুসলিম বন্ধু ও প্রতিবেশীরা আমার মতোই—মানুষ।” বিভাজনের বিরুদ্ধে এই মানবিক উচ্চারণ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নতুন নয়; কিন্তু এক শ্রমজীবী নারীর কণ্ঠে তা নতুন শক্তি পায়। “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি...” হানার বক্তৃতার একটি অংশ শুনতে শুনতে মনে পড়ে যায় সুকান্ত ভট্টাচার্য–এর অমর উচ্চারণ— “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।” হানা হয়তো সুকান্তের নাম শোনেননি। কিন্তু তিনি দেখেছেন এক শিশুর চোখ। তাঁর নির্বাচনি প্রচারাভিযানে কোলে নিয়েছিলেন লেইলা নামের ছোট্ট এক মেয়েকে। বিজয়ী-বক্তৃতায় সেই শিশুটিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন—“তুমি যে পৃথিবীতে বড় হয়ে উঠছ, সেটিকে আরও ভালো করার চেষ্টা আমি করব। আমি নিখুঁত নই, কিন্তু সবসময় সঠিক কাজটি করার চেষ্টা করি।” সুকান্ত যেমন অনাহার-ক্লিষ্ট শিশুর মুখে ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন, তেমনি হানার কণ্ঠেও ধ্বনিত হয় সেই দায়বোধ—শ্রমের ন্যায্যতা, জীবনের মর্যাদা, এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি অঙ্গীকার। কঠোর পরিশ্রমের ফল কী? হানার আরেকটি প্রশ্ন গভীরভাবে নাড়া দেয়— “এখন কঠোর পরিশ্রম করলে আসলে কী পাওয়া যায়? যারা সারাজীবন কাজ করে, তারা ঘরে খাবার তুলতে পারে না; সন্তানদের স্কুলের পোশাক কিনতে পারে না; হিটিং জ্বালাতে পারে না; পেনশন দিয়ে চলতে পারে না; কোনো দিন ছুটিতে (হলিডে) যাওয়ার স্বপ্নও দেখতে পারে না।” তিনি এমন কিছু কথা বলেছেন, যেগুলো কেবল আবেগতাড়িত কোনো স্লোগান নয়; এটি ব্রিটিশ শ্রমজীবী সমাজের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের সংক্ষিপ্ত সার। ডেন্টন-গর্টনের নবনির্বাচিত এমপি হানা স্পেনসার তাঁর বিজয়-ভাষণে যখন এ কথা বলেন, তখন তা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা এক রাজনৈতিক দর্শনে পরিণত হয়। তিনি বলেন, জীবন বদলে গেছে। একসময় মানুষ কাজ করত একটি “ভালো জীবন” পাওয়ার জন্য। এখন অনেকেই কাজ করছে কেবল বিলিয়নিয়ারদের পকেট ভরাতে। “We are being bled dry”—আমরা রক্তশূন্য হয়ে যাচ্ছি। এই ‘রক্তশূন্যতা’ কেবল রূপক নয়—এটি উচ্চমূল্য, জ্বালানি সংকট, অস্থির কর্মসংস্থান ও ভেঙে পড়া জনসেবার বাস্তবতা। কঠোর পরিশ্রম করেও যখন মানুষ সন্তানের স্কুলের পোশাক কিনতে পারে না, ঘরে হিটিং জ্বালাতে পারে না, পেনশনে স্বস্তি পায় না—তখন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই প্রশ্ন কেবল ব্যক্তিগত বেদনা নয়; এটি উত্তর-শিল্পায়িত ব্রিটেনের সামাজিক বাস্তবতা। যখন অবকাঠামো ভেঙে পড়ে, রাস্তায় জমে আবর্জনা, দূষিত বাতাসে শহর ধূমায়িত হয়—তখন পরিবেশনীতি আর সামাজিক ন্যায্যতা আলাদা থাকে না। Green Party of England and Wales–এর রাজনীতি এই দুই স্রোতকে একত্রে দেখতে চায়—কমিউনিটি, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ন্যায়কে একই সমীকরণে। মূলধারায় সবুজের পদধ্বনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে হানা স্পেনসারের আরোহন কেবল একটি আসনের জয় নয়; এটি মূলধারার রাজনীতিতে সবুজের পদধ্বনি। দীর্ঘদিনের দুই-দলীয় আধিপত্যের ভেতর শ্রমজীবী কণ্ঠের সরাসরি প্রবেশ এক নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দেয়। ডেন্টন-গর্টনের মানুষ যেমন প্রত্যাশা করছেন তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের প্রশ্নগুলো এবার সংসদের টেবিলে উঠবে, তেমনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকরাও দেখছেন—বিভাজন ও শোষণের রাজনীতির বাইরে অন্য এক সম্ভাবনা আছে। সুকান্তের কবিতার মতোই—এক নবজাতকের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার যদি সত্যিই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়, তবে শ্রমজীবী হাতের কড়া-নাড়ার শব্দ একদিন সিদ্ধান্তের টেবিলেও প্রতিধ্বনিত হবেই। লেখক : বৃটেনপ্রবাসী কলামিস্ট। এইচআর/এএসএম