নাব্য সংকটে বন্ধ নৌচলাচল, মাইলের পর মাইল হেঁটে বালুচর পাড়ি
2026-03-27 - 13:51
ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ নাব্য সংকটে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুলছড়ি লটঘাটে নৌচলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা ধু-ধু বালুচরের কারণে নৌ-চ্যানেলটি অকার্যকর হয়ে পড়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা। এতে স্থবির হয়ে পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতি এবং চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চরাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ। সরেজমিনে দেখা যায়, একসময় যে ব্রহ্মপুত্র নদের বুকজুড়ে পানির স্রোতের ঢেউ খেলা ছিল, সেখানে এখন দিগন্ত জুড়ে শুধুই বালুচর। পুরাতন ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদের সামনের এলাকা থেকে শুরু করে চারদিকে যতদূর চোখ যায়, কেবল ফুটন্ত বালু আর বালু। নদীর বুক চিরে চলা নৌকার সারি, মাঝিদের নেই কোনো হাঁকডাক। নেই যাত্রীদের ভিড়, সবই যেন এখন অতীত। এক সময়ের কোলাহলমুখর ঘাট, আজ নীরব, জনশূন্য। জানা যায়, নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন এরেন্ডাবাড়ী, ফুলছড়ি ও ফজলুপুর সহ চরাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কাজ, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা বাজার করতে এখন তাদের মাইলের পর মাইল তপ্ত বালুচর পেরিয়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হচ্ছে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক শনিবার ও মঙ্গলবার বসা ঐতিহ্যবাহী পুরাতন ফুলছড়ি হাটে আসা-যাওয়া এখন চরম দুর্ভোগ। আগে যেখানে নৌকায় চড়ে অল্প সময়েই হাটে পৌঁছানো যেত, এখন সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করে পায়ে হেঁটে আসতে হচ্ছে চরাঞ্চলের মানুষদের। স্থানীয়দের দাবি, ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা রক্ষায় দ্রুত ড্রেজিং বা কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে। নাব্য সংকটের এই চিত্র কেবল যাতায়াত ব্যবস্থাকেই পঙ্গু করেনি, বরং শত শত শ্রমজীবী পরিবারের ভবিষ্যৎকেও করে তুলেছে অনিশ্চিত। নদীর সেই চিরচেনা কোলাহল এখন স্তব্ধ, সেখানে কেবল খাঁ খাঁ রোদে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলা মানুষের দীর্ঘশ্বাসই এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। দেলুয়াবাড়ি চরের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আগে নৌকায় করে খুব সহজেই হাটে যাতায়াত করতাম। এখন দুই থেকে তিন কিলোমিটার বালুচর হেঁটে পার হতে হয়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের জন্য এই পথ চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেকেই মাঝপথে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই নাব্য সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। চরাঞ্চলের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল নিয়ে হাটে আসতে চরম সমস্যায় পড়ছেন। এতে করে তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাজে ফুলছড়ি এলাকার কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে নৌকায় করে সহজেই পণ্য হাটে নিয়ে আসতাম। এখন সেই সুযোগ নেই। বালুচর পেরিয়ে মালামাল আনা অনেক কষ্টকর, খরচও বেশি পড়ছে। একই এলাকার কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, আগে ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে ঢাকাসহ দূর-দূরান্ত থেকে ফেরা মানুষ এই নৌপথ ব্যবহার করে দ্রুত বাড়ি ফিরতে পারতেন, সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হতো। কিন্তু এখন সেই ব্যস্ত নৌঘাট একেবারে খাঁ খাঁ করছে। অন্যদিকে নদীতে পানি না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় নৌকার মাঝি ও শ্রমজীবী মানুষ। ফুলছড়ি লটঘাটের ফেরি নৌকার মাঝি আনারুল ইসলাম বলেন, একসময় এই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ পারাপার হতো। কয়েক শতাধিক নৌকা চলাচল করত। এখন পানির অভাবে স্থানীয় ৬২টি নৌকা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। আমাদের কোনো আয় নেই। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শুক্কুর আলী ফিরোজ বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের এই চ্যানেলটিতে পানি না থাকায় পুরো চরাঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নৌ-যোগাযোগ বন্ধ থাকায় কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সবক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ- পরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, নাব্য সংকটের কারণে চরাঞ্চলের যাতায়াত প্রায় বন্ধ। এর ফলে উৎপাদিত কৃষি পণ্যগুলোর ন্যায্য মূল্য পান না কৃষকরা। পাশাপাশি পণ্যগুলো সঠিক সময়ে বাজারজাত করতে পারে না। এছাড়াও যাতায়াতে তাদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হবে। এ অঞ্চলের কৃষকদের সুবিধার জন্য মিনি কোল্ড স্টোরেজের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করবো। আনোয়ার আল শামীম/কেএইচকে/এএসএম