অদৃশ্য ট্রমা, দৃশ্যমান প্রভাব
2026-03-05 - 04:33
মানসিক স্বাস্থ্যের অনেক জটিলতার মধ্যে এমন কিছু আছে, যা চোখে দেখা যায় না; কিন্তু জীবনের প্রতিটি স্তরে তার গভীর প্রভাব পড়ে। ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার (ডিআইডি) সচেতনতা দিবস সেই অদৃশ্য বাস্তবতাকেই সামনে আনার একটি দিন। এই দিনটি কেবল একটি রোগ সম্পর্কে জানার সুযোগ নয়; এটি ট্রমা, সহমর্মিতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর আহ্বান। ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার কী? ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার (ডিআইডি) হলো একটি জটিল মানসিক ব্যাধি, যেখানে একজন মানুষের মধ্যে দুই বা ততোধিক স্বতন্ত্র পরিচয় বা সত্ত্বার বিদ্যমান থাকতে পারে। প্রতিটি সত্ত্বার আচরণ, কথা বলার ভঙ্গি, স্মৃতি এমনকি পছন্দ-অপছন্দও আলাদা হতে পারে। এই ব্যাধি সাধারণত শৈশবের দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র ট্রমার সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন একটি শিশু বারবার নির্যাতন, অবহেলা বা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় এবং নিরাপদ আশ্রয় পায় না, তখন তার মস্তিষ্ক নিজেকে রক্ষার উপায় হিসেবে ‘বিচ্ছিন্নতা’ তৈরি করতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই বিচ্ছিন্নতাই আলাদা সত্তা হিসেবে গড়ে ওঠে। সচেতনতা দিবসের গুরুত্ব ডিআইডি সম্পর্কে জনসাধারণের ধারণা এখনো অনেকটাই ভুল বা বিভ্রান্তিকর। সিনেমা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এই ব্যাধিকে অতিরঞ্জিতভাবে দেখানো হয়, যা বাস্তবতাকে আড়াল করে। সচেতনতা দিবসের মূল লক্ষ্য হলো- ভুল ধারণা দূর করা বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরা আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতা বাড়ানো চিকিৎসা ও সহায়তার পথ সহজ করা মানসিক ব্যাধি নিয়ে সামাজিক কলঙ্ক অনেককে চিকিৎসা নিতে নিরুৎসাহিত করে। ফলে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানসিক অসুস্থতা কোনো দুর্বলতা নয়; এটি চিকিৎসাযোগ্য একটি স্বাস্থ্যগত অবস্থা। অদৃশ্য ট্রমা কীভাবে দৃশ্যমান হয়? ডিআইডি আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই স্মৃতির ফাঁক, সময়ের হিসাব হারানো, নিজের আচরণ সম্পর্কে বিভ্রান্তি বা পরিচয়সংকটের অভিজ্ঞতা জানান। কেউ হয়তো দেখলেন, তিনি এমন একটি কাজ করেছেন যা তার মনে নেই। আবার হঠাৎ কণ্ঠস্বর, ভাষা বা আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। এ ছাড়া থাকতে পারে তীব্র উদ্বেগ বা আতঙ্ক, ঘুমের সমস্যা, বিষণ্নতা, আত্মক্ষতির চিন্তা- এই লক্ষণগুলো পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু বাইরের মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারেন না, এর পেছনে গভীর ট্রমা কাজ করছে। আরও পড়ুন: আবহাওয়া বদলালে কাশি? রইলো ঘরোয়া সমাধান প্রসব-পরবর্তী সময়ে রোজা রাখা নিয়ে যা জানা জরুরি ঘুমের ঘাটতি কি গ্যাস্ট্রিক সমস্যা বাড়ায়? চিকিৎসা ও সহায়তা ডিআইডি দীর্ঘমেয়াদি থেরাপির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ট্রমা-কেন্দ্রিক সাইকোথেরাপি, ধাপে ধাপে সত্তাগুলোর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা এবং নিরাপদ মানসিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এসব চিকিৎসার অংশ। প্রয়োজন হলে ওষুধ দিয়ে উদ্বেগ বা বিষণ্নতার উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্বাসযোগ্য ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ। পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের সচেতন আচরণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থতার পথে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখে। সমাজের ভূমিকা ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার সচেতনতা দিবস আমাদের শেখায়, মানসিক স্বাস্থ্যের আলোচনাকে স্বাভাবিক করতে হবে। স্কুল-কলেজে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে কাউন্সেলিং সুবিধা এবং গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল উপস্থাপন এসব পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। আমাদের উচিত কারও আচরণকে ‘অভিনয়’ বা ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে না দেওয়া, প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নিতে উৎসাহ দেওয়া, ট্রমার অভিজ্ঞতাকে সম্মান ও গুরুত্ব দেওয়া। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান অদৃশ্য ট্রমা মানুষের ভেতরে এমন এক জগৎ তৈরি করতে পারে, যা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। কিন্তু তার প্রভাব বাস্তব, গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। এই সচেতনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রত্যেক মানুষের গল্প আলাদা, এবং অনেক গল্পের পেছনে আছে না বলা কষ্ট। সহমর্মিতা, তথ্যভিত্তিক জ্ঞান এবং সামাজিক সমর্থন এই তিনের সমন্বয়েই সম্ভব ডিআইডি সম্পর্কে সঠিক বোঝাপড়া তৈরি করা। অদৃশ্য ট্রমার দৃশ্যমান প্রভাবকে স্বীকৃতি দিয়ে আমরা যদি পাশে দাঁড়াতে শিখি, তবেই গড়ে উঠবে আরও মানবিক ও মানসিকভাবে সুস্থ সমাজ। তথ্যসূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, পিএসিই হসপিটাল জেএস/