TheBangladeshTime

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে চাই সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ

2026-03-15 - 04:24

মির্জা ফারিহা ইয়াসমিন (স্নেহা) বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ এখনো একটি গভীর সামাজিক ব্যাধি। আইন, নীতি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও দেশের বহু এলাকায় এখনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র, অশিক্ষিত ও প্রান্তিক পরিবারগুলো নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপে পড়ে কন্যাশিশুর বিয়ে অল্প বয়সেই দিয়ে দিতে বাধ্য হয়। ফলে একটি মেয়ের শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়ে। ধরে নেই, কোন এক গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিশু মিনু। সে তৃতীয় শ্রেণির একজন ছাত্রী। তার বাবা একজন দিনমজুর। আর্থিক সংকটের কারণে তাদের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। সেখানে তার পড়াশোনার ব্যয় বহন করা পরিবারটির জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এই কারণে পরিবার তার বিয়ের পরিকল্পনা করে। বিষয়টি তার স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা জানতে পেরে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন সম্পর্কে তাদের সচেতন করেন। গ্রামবাংলার অসংখ্য মিনুর গল্প আজো আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। আর্থিক সংকট, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, কুসংস্কার, যৌতুকের ভয়, কিংবা পরিবারে অতিরিক্ত বোঝা মনে করার মানসিকতা এসব কারণ মিলেই অনেক পরিবার কন্যাসন্তানের বয়সের আগেই বিয়ে দিতে চায়। অথচ একটি শিশুর সবচেয়ে বড় অধিকার হলো নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বাধীনতা। বাল্যবিবাহ সেই অধিকারকে নির্মমভাবে কেড়ে নেয়। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। এই বয়সের আগে বিয়ে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী এ অপরাধে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকলেও তার প্রয়োগ সব ক্ষেত্রে কার্যকর হয় না। অনেক সময় প্রভাবশালী মহল, ভুয়া জন্মনিবন্ধন, সামাজিক নীরবতা কিংবা প্রশাসনিক শৈথিল্যের কারণে বাল্যবিবাহ সংঘটিত হয়ে যায়। ফলে আইনের কঠোরতা কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন সবসময় দেখা যায় না। বাল্যবিবাহের ক্ষতি বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি একটি মেয়ের শিক্ষাজীবন প্রায় নিশ্চিতভাবেই থামিয়ে দেয়। অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব, মাতৃত্বের চাপ এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পড়ে তার ব্যক্তিস্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, কম বয়সে গর্ভধারণ মা ও শিশুর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, অপুষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, বাল্যবিবাহ নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক, দাম্পত্য নির্যাতন এবং আর্থিক নির্ভরশীলতাকে আরও গভীর করে। অর্থাৎ, এটি শুধু একটি বিয়ের ঘটনা নয়; বরং দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সহিংসতার এক দুষ্টচক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে। এই বাস্তবতায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধকে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যম সবাইকে একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা মানে শুধু একটি বিয়ে ঠেকানো নয়; বরং একটি শিশুর জীবন, শিক্ষা ও সম্ভাবনাকে রক্ষা করা। প্রথমত, আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও বাল্যবিবাহের আয়োজনের খবর পাওয়া মাত্র স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে হবে। বিয়ের আগে বর-কনের বয়স যাচাই, সঠিক জন্মনিবন্ধন পরীক্ষা এবং জাল কাগজপত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অবৈধ বিয়ের সঙ্গে জড়িত কাজী, অভিভাবক ও আয়োজকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও উপজেলা পর্যায়ের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে কার্যকর ও সক্রিয় করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। অনেক পরিবার অর্থাভাবে মেয়েদের স্কুল ছাড়িয়ে দেয়, পরে বিয়ের আয়োজন করে। তাই দরিদ্র পরিবারের কন্যাশিশুদের জন্য শিক্ষা সহায়তা, উপবৃত্তি, নিরাপদ যাতায়াত, স্কুলে টিকে থাকার পরিবেশ এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। একটি মেয়ে যখন শিক্ষিত হয়, তখন তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয় এবং পরিবারও তাকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শেখে। তৃতীয়ত, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। বাল্যবিবাহের ক্ষতি, আইনি দিক, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে পরিবার ও সমাজকে ধারাবাহিকভাবে জানাতে হবে। মসজিদ, মন্দির, স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবখানেই এ বিষয়ে জোরালো প্রচার চালানো প্রয়োজন। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী, অভিভাবক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাড়াতে হবে। চতুর্থত, অভিযোগ ও প্রতিরোধব্যবস্থাকে সহজলভ্য করতে হবে। যেকোনো বাল্যবিবাহের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ বা ৩৩৩ নম্বরে জানানো, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, পুলিশ বা প্রশাসনের সহায়তা নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সমাজকে বুঝতে হবে, বাল্যবিবাহ ‘পারিবারিক বিষয়’ নয়; এটি আইন, মানবাধিকার ও জাতীয় উন্নয়নের প্রশ্ন। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রাকে অর্থবহ করতে হলে কন্যাশিশুর নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যবিবাহ রোধে আইন আছে, উদ্যোগ আছে, কিন্তু প্রয়োজন আরও বেশি সামাজিক প্রতিশ্রুতি, প্রশাসনিক সক্রিয়তা এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ। কারণ একটি দেশের অগ্রগতি তখনই সত্যিকারের টেকসই হয়, যখন তার মেয়েরা নিরাপদ, শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে। তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এখনই সময় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার। কন্যাশিশুকে বোঝা নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখার মানসিকতাই পারে এই ব্যাধির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। লেখক: শিক্ষার্থী, মার্কেটিং ২য় বর্ষ, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী। আরও পড়ুন দেউলিয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল ব্রিটিশদের সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলো কেএসকে

Share this post: