TheBangladeshTime

চলন্ত অবস্থায় গাড়ি চালকের ভিডিও করা উচিত নয়

2026-03-27 - 11:10

আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করলেই একটা অদ্ভুত এবং একই সাথে আতঙ্কের দৃশ্য চোখে পড়ে। দূরপাল্লার বাসের চালক থেকে শুরু করে ট্রেনের লোকোমাস্টার পর্যন্ত অনেকেই এখন রীতিমতো কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হয়ে উঠেছেন। চলন্ত অবস্থায় স্টিয়ারিং এক হাতে ধরে অন্য হাতে মোবাইল বা ড্যাশবোর্ডে ক্যামেরা বসিয়ে তারা নিয়মিত ভিডিও বানাচ্ছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল এক ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তায় ভিডিও করতে দেখে একটি বাস অনিয়ন্ত্রিতভাবে চালাতে থাকে। একপর্যায়ে রোড ডিভাইডারে মারাত্মকভাবে আঘাত হানে। প্রযুক্তির যুগে মানুষ নিজের দৈনন্দিন কাজ সবার সামনে তুলে ধরতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু এ কাজের জায়গাটা যখন শত শত মানুষের জীবনের সাথে সরাসরি যুক্ত; তখন এই কন্টেন্ট তৈরির নেশা ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাস বা ট্রেন চালানো কোনো সাধারণ কাজ নয়। এর জন্য প্রতিটি সেকেন্ডে দরকার পুরোপুরি মনোযোগ এবং তীক্ষ্ণ সতর্কতা। রাস্তার পরিস্থিতি চোখের পলকে বদলে যেতে পারে। হয়তো হঠাৎ সামনে চলে আসতে পারে অন্য কোনো ছোট গাড়ি, পথচারী অথবা রাস্তার কোনো বাঁক। ঠিক অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চালকের মনোযোগ যদি রাস্তার বদলে ক্যামেরার লেন্সের দিকে থাকে, তবে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটা কেবল সময়ের ব্যাপার। বিজ্ঞান পরিষ্কারভাবে বলে, মানুষ একসাথে একাধিক কাজ পুরোপুরি নিখুঁতভাবে করতে পারে না। ড্রাইভ করার সময় ভিডিও বানানো, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলা বা লাইভ স্ট্রিমিং করা চালকের মনোযোগকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। অনেক চালক হয়তো ভাবেন তারা অনেক দক্ষ, তাই একসাথে দুটো কাজ অনায়াসেই করতে পারবেন। এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই অনেক সময় কাল হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আসা লাইক, কমেন্ট ও শেয়ারের লোভ এক ধরনের নেশার মতো কাজ করে। এই সস্তা জনপ্রিয়তার হাতছানি অনেক সময় চালকদের মূল পেশাদারিত্ব ভুলিয়ে দেয়। তারা বেমালুম ভুলে যান তাদের পেছনের সিটগুলোতে বসে থাকা শত শত যাত্রীর কথা, যাদের জীবনের পুরো দায়িত্ব সেই মুহূর্তে তার হাতে। সামান্য বিনোদন বা ভিডিও থেকে আসা বাড়তি কিছু টাকা আয়ের আশায় তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের এবং যাত্রীদের মৃত্যুকে ডাক দিচ্ছেন। আরও পড়ুন ঈদে গ্রামে যাবেন, সঙ্গে গাড়ি-বাইকের যেসব কাগজপত্র রাখবেন সড়ক বা রেল দুর্ঘটনার পর আমরা সাধারণত রাস্তার বেহাল দশা, গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা উল্টো দিক থেকে আসা বেপরোয়া গাড়িকে দোষারোপ করে থাকি। কিন্তু চালকের মনোযোগ নষ্ট হওয়ার এই নতুন ও আধুনিক কারণটি বেশিরভাগ সময়ই আড়ালে থেকে যায়। যখন একজন চালক নিজের খেয়ালে ভিডিও বানাতে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটান, তখন তার দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। এটি নিছক কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়, এটি স্পষ্ট অবহেলা এবং এক ধরনের অপরাধ। এই চরম অবহেলার কারণে ঝরে যাওয়া প্রতিটি প্রাণের এবং পঙ্গুত্বের নৈতিক ও আইনি দায়ভার ওই চালককেই নিতে হবে। এই ভয়াবহ সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সবার আগে প্রয়োজন কঠোর নিয়মকানুন তৈরি এবং সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা। বাস ও ট্রেন চালকদের ডিউটি চলাকালীন মোবাইল ফোন বা যে কোনো ধরনের রেকর্ডিং ডিভাইস ব্যবহারের ওপর আইনিভাবে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এখন সময়ের দাবি। পরিবহন মালিক সমিতি এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। শুধু নিয়ম করলেই হবে না, এর সঠিক বাস্তবায়নে প্রযুক্তির সাহায্যে নজরদারিও বাড়াতে হবে। চালকের কেবিনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কেউ নিয়ম অমান্য করলে তার লাইসেন্স বাতিলসহ তাৎক্ষণিক শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, যাতে অন্যরা এমন কাজ করতে ভয় পায়। তবে কেবল শাস্তি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না, তাই সচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত জরুরি। চালকদের বোঝাতে হবে তাদের এবং যাত্রীদের জীবনের মূল্য ইন্টারনেটের কয়েক হাজার ভিউ বা লাইকের চেয়ে অনেক বেশি। পরিবহন সমিতি এবং ট্রাফিক পুলিশের যৌথ উদ্যোগে চালকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। বাসে বা ট্রেনে উঠে যদি দেখা যায় চালক ভিডিও বানাতে ব্যস্ত, তবে নীরব দর্শক না থেকে সাথে সাথে প্রতিবাদ করতে হবে। নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবায় ফোন করে অভিযোগ জানানোর চর্চা আমাদেরই শুরু করতে হবে। কন্টেন্ট বানানো বা নিজের শখ পূরণ করা মোটেও দোষের কিছু নয়। ডিউটি শেষে অবসর সময়ে যে কেউ তার সৃজনশীলতা প্রকাশ করতেই পারেন। কিন্তু কাজের সময়, বিশেষ করে যখন সেই কাজ অন্যদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তখন পেশাদারিত্বই সবার আগে আসা উচিত। স্টিয়ারিং হুইল বা ট্রেনের কন্ট্রোল প্যানেল কোনো কন্টেন্ট বানানোর স্টুডিও নয়। এই সহজ সত্যটা চালকদের যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি হবে, সবার জন্য ততই মঙ্গল। রাস্তা বা রেললাইন যেন বিনোদনের মঞ্চ হতে গিয়ে মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত না হয়, সেদিকে আমাদের সবার সজাগ দৃষ্টি রাখার সময় এখনই। এসইউ

Share this post: