স্বাধীনতার আলোয় তারুণ্যের নতুন শপথ ও দায়বদ্ধতা
2026-03-26 - 04:31
২৫ মার্চের সেই ভয়াল কালরাতের নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ কিংবা ছাব্বিশে মার্চের নতুন ভূখণ্ডের জন্মচিৎকার, এর কোনোটিই আমি নিজের চোখে দেখিনি। তবে জন্মের পর থেকেই একটি স্বাধীন দেশের আলো বাতাসে বেড়ে উঠেছি। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল এই লাল সবুজের পতাকা। সেই স্বাধীনতার গল্প আমার কাছে কিংবা আমার প্রজন্মের কাছে শুধু অতীতের গৌরবগাঁথা নয়। এটি আমাদের পথচলার অনন্ত প্রেরণা। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমি যখন পেছনের দিকে তাকাই, তখন উপলব্ধি করি, স্বাধীনতা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকা একটি তারিখের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি ছাব্বিশে মার্চ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার মানে কেবল পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি নয়। এটি মূলত আত্মমর্যাদা, উন্নয়ন ও এগিয়ে যাওয়ার এক অবিরাম শপথ। স্বাধীনতা দিবস আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখায়, সাহস জোগায় আর বুকের ভেতর এক তীব্র দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। আমার কাছে স্বাধীনতা মানে কেবল একটি নির্দিষ্ট সীমানার স্বাধীন ভূখণ্ড নয়। স্বাধীনতা হলো স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তা করার অধিকার, একটি উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন এবং যেকোনো অন্যায়ের বিপক্ষে নির্ভীকভাবে দাঁড়ানোর শক্তি। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই বিজয়ের দীর্ঘ সময়ে আমাদের অর্জনের খাতায় যুক্ত হয়েছে অনেক প্রাপ্তির গল্প। কিন্তু স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই হবে, যখন আমাদের মতো তরুণ প্রজন্ম নিজেদের অবস্থান থেকে দেশ গড়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে। স্বাধীন বাংলাদেশের বয়সের অর্ধেকেরও কম সময় আমি এই পৃথিবীতে পার করেছি। আমাদের কাঁধেই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। শিক্ষা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই এবং তথ্যপ্রযুক্তির আলোয় বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে নতুন এক বাংলাদেশ গড়ে তোলা এখন আমাদের প্রধান শপথ হওয়া উচিত। আরও পড়ুন: তারুণ্যের চোখে স্বাধীনতা দিবস যে ভোরে জেগেছিল বাংলাদেশ আমাদের পথচলায় স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করার মাধ্যমেই একদিন সুখী ও সমৃদ্ধশালী কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা গড়ে উঠবে। তবে আমাদের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, বৈষম্য আর বেকারত্বের অভিশাপ থেকে যদি আমরা আমাদের সমাজকে মুক্তি দিতে না পারি, তবে বিজয়ের এই আনন্দ নতুন প্রজন্মের কাছে অনেকটাই ফিকে হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে হবে। সেই সাথে যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। বিখ্যাত লেখক নেপোলিয়ন হিল একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি লড়াই বন্ধ করতে অস্বীকার করে তার পক্ষে সর্বদা বিজয় সম্ভব হয়।’ ১৯৭১ সালে আমরা একটি বড় বিজয় অর্জন করেছি ঠিকই, তবে আমাদের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। প্রত্যাশিত বিজয়ের লক্ষ্যে আমাদের এই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে অপ্রত্যাশিত সবকিছুর বিরুদ্ধে। আমরা এখন তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর এক যুগে বাস করছি। এই সময়ে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যের মাধ্যমে বৈশ্বিকভাবে যখন দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়, ঠিক তখন আমাদের তরুণ প্রজন্মকেই এগিয়ে আসতে হবে। সত্য তথ্য প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে এই অপতৎপরতা রুখে দিতে হবে। আমাদের সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা পারে সমাজের সব ধরনের নেতিবাচকতা দূর করতে। আমাদের বিজয়ের এই গল্পগুলো দেশের সব প্রান্তে, সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে তরুণদের একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই। যে বিজয় লাখো শহীদের তাজা রক্ত আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে, সেটা সযত্নে ধরে রাখার কর্তব্য আমাদের সবার। আমাদের প্রত্যেকের উচিত দেশের এই ঐতিহ্য ও গৌরবময় স্বাধীনতার ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অবিকৃত অবস্থায় পৌঁছে দেওয়া। স্বাধীনতা আসলে একটি চলমান অনুভব এবং একটি দায়বদ্ধতা, যার উত্তর প্রতিটি প্রজন্মকে তাদের নিজেদের কাজের মাধ্যমে দিয়ে যেতে হয়। এই মহান স্বাধীনতা দিবসে আমার প্রজন্মের সবার মনে একটি নতুন শপথ জাগুক। আমরা একসাথে বলব, আমরা গড়ব আগামীর বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং নির্ভীক মনোবলে। জেএস/