ঈদের ভ্রমণে শৈশবের পুনর্মিলন
2026-03-23 - 05:41
তৌফিক সুলতান হৃদয়ের টানে পুরোনো সম্পর্কগুলোকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার এক অনন্য উপলক্ষ। সময়ের ব্যবধানে ছড়িয়ে পড়া শৈশবের বন্ধুরা যখন আবার একত্রিত হয়, তখন তা নিছক একটি সাক্ষাৎ নয়, এ যেন স্মৃতির পাতা উল্টে ফিরে দেখা জীবনের সোনালি অধ্যায়। এবারের ঈদে তেমনই এক আবেগঘন পুনর্মিলনের সাক্ষী হলাম আমরা, আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠ চরদুর্লভ খান আবদুল হাই সরকার উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে চরদুলভ খা আঃ হাই সরকার স্কুল এন্ড কলেজ)-এর চিরচেনা মাঠ প্রাঙ্গনে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একসঙ্গে পড়াশোনার সেই দিনগুলো আজও আমাদের মনে জীবন্ত। তখন প্রতিদিন দেখা হতো, প্রতিদিন কথা হতো-বন্ধুত্ব ছিল সহজ, নির্মল ও স্বতঃস্ফূর্ত। আর এখন জীবনের ব্যস্ততা ও দায়িত্বের চাপে সেই দেখা মেলে খুব কম-মূলত ঈদের মতো বিশেষ মুহূর্তেই। তাই ঈদের নামাজ শেষে যখন আমরা একে একে জড়ো হলাম, তখন সময় যেন থমকে দাঁড়ালো; মনে হলো, আমরা আবার ফিরে গেছি সেই শৈশবের দিনগুলোতে। প্রাথমিক আড্ডা ও স্মৃতিচারণার পর শুরু হয় আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত ভ্রমণ। গ্রামবাংলার সরল অথচ মোহময় পথে যাত্রা-বারিষাব, বেলতলী বাজার, গিয়াসপুর, নরোত্তমপুর, গাওরা ও মেওরা অতিক্রম করে আমরা পৌঁছে যাই সবুজে ঘেরা গহীন গজারি বনে। পথের দুই পাশে বিস্তৃত শস্যক্ষেত, মাটির রাস্তা, আর দূরে দিগন্তজোড়া সবুজ-সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন আমাদের স্বাগত জানায় তার নিজস্ব ভাষায়। গজারি বনের ভেতরের নিরবতা, দীর্ঘ সরু পথ আর ছায়াঘেরা পরিবেশ আমাদের ভ্রমণকে এক ভিন্ন মাত্রা দেয়-যেখানে শব্দের চেয়ে অনুভূতির গভীরতা বেশি প্রবল। আকাশ ছিল মেঘলা, বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল প্রবল; তবুও প্রকৃতি যেন আমাদের আনন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে চায়নি। মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রোদ আর শীতল বাতাস আমাদের পুরো ভ্রমণকে আরও প্রশান্তিময় করে তোলে। বন্ধুত্বের হাসি, গল্প আর খুনসুটি মিলে সেই পরিবেশ হয়ে ওঠে জীবনের এক অমূল্য স্মৃতি। এই ভ্রমণকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে আমাদের প্রত্যেকের জীবনের বর্তমান অবস্থান ও পেশাগত যাত্রা। কামরুল হাসান সৌরভ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি-এর অনকোলজি বিভাগে কি অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে তিনি ক্যানসার চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। মহিদুল হাসান খান অন্তু, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি) থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে বর্তমানে ব্রেন স্টেশন-এ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রযুক্তি খাতে অবদান রাখছেন। রাজিব, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে বর্তমানে বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন-দেশসেবার লক্ষ্যে নিজেকে গড়ে তুলছেন। আমি, তৌফিক সুলতান-ঢাকা মেডিকেল ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষা গ্রহণের পর বর্তমানে বি. জে. এস. এম মডেল কলেজে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। পাশাপাশি জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত মতামত, কলাম, ফিচার ও চিঠি লেখার মাধ্যমে সমাজ, শিক্ষা ও মানবিক বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। সম্প্রতি প্রকাশিত আমার গ্রন্থ `ওয়ার্ল্ড অব নলেজ' -`জ্ঞানের জগৎ' নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানচর্চা, চিন্তাশক্তির বিকাশ এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগমুখী শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার একটি প্রচেষ্টা। আমাদের বন্ধু রোমেল মাহমুদ রোমান, তিতুমীর কলেজ থেকে গণিতে অনার্স সম্পন্ন করে বর্তমানে কাপাসিয়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। জহিরুল ইসলাম সুমন, পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে বিসিএস প্রস্তুতিতে নিয়োজিত। দিদারুল ইসলাম ব্যবসার মাধ্যমে স্বনির্ভরতার উদাহরণ তৈরি করছেন, আর মোফাজ্জল, গাজীপুর ন্যাশনাল কলেজ থেকে প্রাণীবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে বুরো বাংলাদেশ-এ কর্মরত থেকে উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে যুক্ত আছেন। দিনের শেষভাগে সোহাগ, জাহিদুলসহ আরও অনেক বন্ধু আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলে মিলনমেলা যেন পূর্ণতা পায়। সময়ের স্বল্পতা সত্ত্বেও হৃদয়ের গভীরতায় জমা হয় অগণিত আনন্দ, স্মৃতি ও অনুপ্রেরণা। যখন আমরা নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাই, তখন উপলব্ধি করি-সময় বদলায়, জীবন বদলায়, কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব কখনো বদলায় না। ঈদের এই ভ্রমণ শুধু একটি দিন কাটানো নয়; এটি ছিল আমাদের শিকড়ের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন, বন্ধুত্বের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করা, এবং জীবনের প্রতি নতুন করে কৃতজ্ঞতা অনুভব করার এক অনন্য উপলক্ষ। এই বন্ধন অটুট থাকুক, আর এমন আনন্দময় পুনর্মিলন ফিরে আসুক বারবার-এটাই প্রত্যাশা। লেখক: প্রভাষক, ব্রেভ জুবিলেন্ট স্কলার্স অব মনোহরদী মডেল কলেজ, নরসিংদী। আরও পড়ুন: ঈদ সালামি, ঐতিহ্যের বিবর্তন ও বেড়ে ওঠার গল্প পরিবার ছাড়া যেমন কাটছে প্রবাসীদের ঈদ এসএকেওয়াই