বিহারিদের বোমাবাজি, দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা-সংঘর্ষ
2026-03-23 - 18:50
রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। মিরপুরে বিহারিদের (অবাঙালি) বোমাবাজি, বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলি এবং শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জনমনে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মিরপুর এলাকায় অবাঙালিদের সঙ্গে বাঙালিদের উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে। অভিযোগ রয়েছে, অবাঙালিরা বাঙালিদের বাড়িতে উত্তোলিত বাংলাদেশের পতাকা ও কালো পতাকা জোরপূর্বক নামিয়ে দেয়। রাতে বিহারিরা এলাকায় ব্যাপক বোমাবাজি চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এ ঘটনার পরদিন দৈনিক ইত্তেফাক ‘এ তবে কিসের আলামত?’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এদিকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধানমন্ডিতে নিজ বাসভবনে সমবেত মিছিলকারীদের উদ্দেশে বিরামহীন ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, বাংলার জনগণের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দেন, আর আলোচনা নয়, এবার ঘোষণা চাই। আগামীকালের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে বাঙালিরা নিজেদের পথ নিজেরাই বেছে নেবে। আমরা সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। কোনো ষড়যন্ত্রই আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। সংগ্রামী জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি কঠোরতর সংগ্রামের নির্দেশ দেওয়ার জন্য বেঁচে থাকব কি না জানি না। তবে দাবি আদায়ের জন্য আপনারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন। এদিন সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবনে আওয়ামী লীগ ও সরকারের উপদেষ্টা পর্যায়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক হয়। আওয়ামী লীগের পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ এবং ড. কামাল হোসেন বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তাজউদ্দীন আহমদ জানান, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আলোচনায় বক্তব্য দেওয়া শেষ হয়েছে এবং এখন প্রেসিডেন্টের ঘোষণা দেওয়ার পালা। তিনি বলেন, আলোচনা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। আওয়ামী লীগ আর আলোচনাকে দীর্ঘায়িত করতে রাজি নয়। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও সংঘর্ষের খবর আসতে থাকে। ২৩ মার্চ রাত থেকে ২৪ মার্চ সকাল পর্যন্ত সৈয়দপুর সেনানিবাসের পার্শ্ববর্তী বোতলগাড়ি, গোলাহাট ও কুন্দুল গ্রামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অবাঙালিদের সহযোগিতায় হত্যাযজ্ঞ চালায়। এতে অন্তত একশ মানুষ নিহত এবং এক হাজারের বেশি আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। রংপুরে হাসপাতালের সামনে জনতা ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের জেরে সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর সেনারা গুলি চালালে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন। চট্টগ্রাম নৌবন্দরের ১৭ নম্বর জেটিতে সোয়াত জাহাজ থেকে সমরাস্ত্র খালাস করতে গেলে স্থানীয় বাঙালিরা বাধা দেয়। পরে সেনাবাহিনী অস্ত্র বোঝাই ১২টি ট্রাক নিয়ে যাওয়ার সময় জনতা ব্যারিকেড দিলে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে শতাধিক শ্রমিক শহীদ হন। ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্রে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সৈন্যদের সঙ্গে টিভিকর্মীদের দুর্ব্যবহারের ঘটনায় সন্ধ্যা থেকে টেলিভিশনের সব ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ রাখেন কর্মীরা। সম্ভাব্য সামরিক আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সশস্ত্র গণবিপ্লব জোরদারের আহ্বান জানায়। যশোরে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস সদরদপ্তরে বাঙালি অফিসাররা স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করেন। ভোলা ও বগুড়াতেও রাইফেলস সদস্যরা নিজ নিজ ছাউনিতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের বাঙালি ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার এম. আর. মজুমদারকে ঢাকায় বদলি করে সেখানে ব্রিগেডিয়ার আনসারীকে নতুন কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই দিন মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী কুমিল্লা ও যশোর সেনানিবাস পরিদর্শন করে ব্রিগেড কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনেও তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। ঢাকায় অবস্থানরত কাউন্সিল মুসলিম লীগ ও কাইয়ুম মুসলিম লীগসহ পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাত নেতা আকস্মিকভাবে করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ভবনে ভুট্টো ও ইয়াহিয়ার মধ্যে বৈঠক অব্যাহত রয়েছে। বৈঠক শেষে হোটেলে ফিরে জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, বাংলার জনগণের প্রতি তার সহমর্মিতা থাকলেও তিনি একটি অখণ্ড পাকিস্তানের জন্যই কাজ করে যাচ্ছেন। তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর ‘৭১ এর দশমাস’, শহীদ জননী জাহানা ইমাম এর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংবাদপত্র এমএএস/এমআইএইচএস