TheBangladeshTime

থেমে গেলো হরিরামপুরের ‘খবরওয়ালার’ সাইকেলের ঘণ্টা

2026-03-08 - 02:54

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার মানুষের ভোরবেলার এক পরিচিত শব্দ ছিল একটি সাইকেলের ঘণ্টা। সেই ঘণ্টার শব্দে যেন অনেকের নতুন দিনের শুরু হতো। সেই পরিচিত শব্দের মানুষটি সবার প্রিয় ‘খবরওয়ালা’ সুভাষ সাহা এবার চিরতরে নীরব হয়ে গেলেন। শনিবার (৭ মার্চ) দুপুর ২টার দিকে নিজ বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগছিলেন সুভাষ সাহা। মৃত্যুকালে তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি হরিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পত্রিকা সরবরাহ করতেন। প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগেই কাঁধে পত্রিকার বোঝা আর পুরোনো জংধরা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন তিনি। কুয়াশা ঢাকা শীতের সকাল, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রচণ্ড গরম কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। মানুষের দোরগোড়ায় দিনের প্রথম খবর পৌঁছে দেওয়াই ছিল তার নিত্যদিনের দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন অগাধ নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ, বাজারের মোড়, চায়ের দোকান কিংবা বাড়ির বারান্দা— সবখানেই ছিল তার পরিচিত উপস্থিতি। এলাকাবাসীর কাছে তিনি শুধু একজন পত্রিকার হকারই ছিলেন না, ছিলেন সবার আপনজন, প্রতিদিনের পরিচিত এক মুখ। নিয়মিত ও আন্তরিকতার কারণে তিনি এলাকাবাসীর কাছে হয়ে ওঠেন ‘খবরওয়ালা’। অনেকেই বলেন, ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে তার সাইকেলের ঘণ্টার টুংটাং শব্দ শুনলেই বোঝা যেত নতুন দিন শুরু হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ পাওয়ার মাধ্যম বদলেছে। মানুষের হাতে এসেছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট। তবুও পুরোনো সাইকেল আর কাঁধভরা পত্রিকা নিয়েই নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন সুভাষ সাহা। কারণ তার কাছে এই কাজ ছিল শুধু পেশা নয়; ছিল মানুষের সঙ্গে এক গভীর সম্পর্কের বন্ধন। তার মৃত্যুর খবরে হরিরামপুর জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ফেসবুকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আবেগঘন পোস্ট দিয়ে স্মরণ করছেন তাকে। মুনশী সোহাগ নামের একটি আইডি থেকে লেখা হয়েছে, ‘আহা সুভাষ দা, আপনার সঙ্গে যেন আমাদের এক আত্মার সম্পর্ক ছিল। আপনাকে মনে থাকবে সবসময়। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।’ খালেক রাসেল নামের একটি আইডি থেকে লেখা হয়েছে, ‘ছোটবেলায় তিনি নিয়মিত আমাদের বাড়িতে পত্রিকা দিয়ে যেতেন। আমার ইংরেজি শেখার জন্য আব্বু তাকে বলে দিতেন, যেন বাংলার সঙ্গে একটি করে ইংরেজি পত্রিকাও দিয়ে যায়। চাহিদা কম থাকায় নিয়মিত আনতে পারতেন না, মাঝে মাঝে ইংরেজি পত্রিকা নিয়ে আসতেন। আব্বু চলে যাওয়ার পর আর বাড়িতে পত্রিকা রাখা হয়নি। এরপর রাস্তাঘাটে হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা হতো। ছোটবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার সঙ্গে—তার সাইকেল থেকে নামা, সাইকেল স্ট্যান্ড করা, ক্যারিয়ার থেকে পেপার বের করে হাতে দিয়ে আবার চলে যাওয়া। দৃশ্যগুলো এখনো মনে পড়ছে। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। অবিরাম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তার প্রতি।’ স্থানীয় সাংবাদিক শুভংকর পোদ্দার জানান, কয়েক মাস ধরে তিনি বেশ অসুস্থ ছিলেন। তিন-চার মাস ধরে পত্রিকা দিতে পারেননি। কয়েক মাস আগে শেষবার রিকশায় করে পত্রিকা বিতরণ করেছিলেন। বর্তমানে তার দায়িত্ব আরেকজনের কাছে দিয়ে গেছেন। মো. সজল আলী/এফএ/জেআইএম

Share this post: