TheBangladeshTime

কমছে পোশাক রপ্তানি, ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান

2026-03-23 - 06:40

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি সাত মাস ধরে নেতিবাচক ধারায়। এ শিল্পের মালিকরা বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখা নিয়ে উদ্বিগ্ন। দুই বছর ধরে বিনিয়োগ অনেকটা স্থবির থাকায় নতুন কর্মসংস্থানও প্রায় বন্ধ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রপ্তানি আয় সামগ্রিক কমেছে ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ। এজন্য মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক চাহিদা কমাকে দায়ী করছেন রপ্তানিকারকরা। বর্তমানে রপ্তানি আয় ৩১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে একই সময়ে ছিল ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয়ের প্রাণশক্তি তৈরি পোশাক খাতের আয় ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞ ও রপ্তানিকারকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, যদি রপ্তানি আয়ের পতন অব্যাহত থাকে এবং এ অর্থবছর নেতিবাচক ধারায় শেষ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন কারখানার শ্রমিকেরা। কেমন ছিল সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের গতিপথ চলতি অর্থবছরের শুরুতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি থাকলেও ধীরে ধীরে তা দুর্বল হয়ে ফেব্রুয়ারিতে নেতিবাচক ধারায় নেমে আসে। জুলাইয়ে রপ্তানি আয় ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়ে ইতিবাচক সূচনা হয়। কিন্তু আগস্ট থেকেই পতন শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ডিসেম্বরে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ সংকোচন দেখা যায়। জানুয়ারিতে সামান্য স্থিতিশীলতা এলেও ফেব্রুয়ারিতে আবার ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ কমে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকে। তৈরি পোশাক রপ্তানি চিত্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার দিয়ে শুরু হয়, যা ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ৩ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। তবে আগস্ট মাসে রপ্তানি আয় কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম। সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আয় আরও কমে ২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ কম। অক্টোবর মাসে রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার হয়, যা ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি আয় যথাক্রমে ৩ দশমিক ১৪ এবং ৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে আসে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ এবং ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ কম। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানের ওপর। যখন পোশাক খাতে কার্যাদেশ (অর্ডার) কমে যায় এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়, তখন কারখানাগুলো নতুন শ্রমিক নিয়োগ থেকে বিরত থাকে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান শ্রমিকদের ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শ্রমিক ছাঁটাই, কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া কিংবা কাজের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।-সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে ৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির তুলনায় ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ কম। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি আয় আরও কমে ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যা ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করছে। আরও পড়ুন রপ্তানি আয় কমছে কেন? যে সব কারণে রপ্তানি আয়ে ধারাবাহিক পতন রপ্তানি আয়ের ক্রমাগত পতন থামছে না কেন? সব মিলিয়ে দেখা যায়, অর্থবছরের শুরুতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তী মাসগুলোতে রপ্তানি খাত ধারাবাহিক চাপের মুখে পড়েছে। ফলে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে খাতটির সামগ্রিক গতি মন্থর হয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেন পোশাক শিল্প গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরএমজি খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেশের সবচেয়ে বড় আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের খাত। বর্তমানে এই খাতে ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেন, যার মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী এবং তাদের অধিকাংশই গ্রামীণ এলাকার। যা বলছেন বিশ্লেষকরা বিশ্লেষকরা বলছেন, যদিও জুলাইয়ের শক্তিশালী সূচনার পরও এ খাতকে প্রাথমিক ধাক্কা দেয় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও জ্বালানি সংকট। বাজারে অস্থিরতা পরবর্তী মাসগুলোর রপ্তানিকে প্রভাবিত করেছে। খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে নিয়মিত সমন্বয়, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ ও নতুন বাজার অন্বেষণ অপরিহার্য। সফটেক্স কটন (প্রা.) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রেজওয়ান সেলিম বলেন, ‘বর্তমান সময়টি উৎপাদকদের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক সংকটের কারণে কাজের অর্ডার কমে গেছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও বর্তমানে নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কারখানা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং নিয়োগদাতাদের কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে যেতে হতে পারে।’ কর্মসংস্থানে আমরা তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখিনি। তবে, যদি অর্ডারের অভাবে কোনো কারখানা সংকটে পড়ে এবং বন্ধ করতে বাধ্য হয়, তাহলে অবশ্যই কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়বে।-এফবিসিসিআই সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু তিনি বলেন, ‘তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে এবং সরকার পর্যাপ্ত সহায়তা দিলে আমরা আশা করি টিকে থাকতে পারবো। বর্তমানে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চলমান সংঘাতের কারণে শিল্পের জন্য পরিস্থিতি অনুকূলে নয়। ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে।’ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানের ওপর। তার মতে, যখন পোশাক খাতে কার্যাদেশ (অর্ডার) কমে যায় এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়, তখন কারখানাগুলো নতুন শ্রমিক নিয়োগ থেকে বিরত থাকে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান শ্রমিকদের ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শ্রমিক ছাঁটাই, কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া কিংবা কাজের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘যদি এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে অনেক কারখানা আর্থিক চাপে পড়ে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও পাওনা পরিশোধ করতেও হিমশিম খায়। এতে শ্রমিক অসন্তোষ ও শিল্পে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দেয় বা বন্ধও হয়ে যেতে পারে, যা সরাসরি বেকারত্ব বাড়িয়ে দেয়।’ বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জাগো নিউজকে বলেন, ‘কর্মসংস্থানে আমরা তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখিনি। তবে, যদি অর্ডারের অভাবে কোনো কারখানা সংকটে পড়ে এবং বন্ধ করতে বাধ্য হয়, তাহলে অবশ্যই কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়বে।’ তিনি বলেন, ‘যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় এবং বছর শেষে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা দেয়, তাহলে চাকরি কমার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তবে আশাও আছে। কারণ, নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করেছে। চলমান সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা শিল্পকে পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।’ উত্তরণে করণীয় খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এই পরিস্থিতির সঙ্গে কারখানাগুলোর জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ও জড়িত থাকে। যেমন, শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং পরিচালনাগত খরচ বৃদ্ধি। ফলে শিল্পের ওপর সামগ্রিক চাপ আরও বেড়ে যায়।’ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই সময়ে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই। বরং অভ্যন্তরীণভাবে যেসব জায়গায় উৎপাদন খরচ কমানো যায়, দক্ষতা বাড়ানো যায় ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদার করা যায়, সেসব দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সার্বিকভাবে তার মতে, পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি শুধু রপ্তানি আয়কেই প্রভাবিত করে না, বরং লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থানকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। এ খাত টেকসই রাখতে সময়োপযোগী নীতি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘তৈরি পোশাক বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমাদের শিল্প সহনশীলতা দেখিয়েছে, যদিও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। তবে রপ্তানিতে বর্তমানে ধীরগতি একটি উদ্বেগজনক বিষয়।’ এই ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, ‘প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে নীতিমূলক সমর্থন, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ ও উচ্চ মূল্যবান পণ্যে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে খাতটি পুনরায় গতি অর্জন করতে পারবে। দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদানও রাখতে পারবে।’ আইএইচও/এএসএ/এমএফএ

Share this post: