জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম যেভাবে মোকাবিলা করছে বিভিন্ন দেশ
2026-03-29 - 04:30
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ইরানযুদ্ধের প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্বে। তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানো এই জ্বালানি সংকটে সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে অনেকেই অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন এবং তাপজনিত ক্লান্তিতে মৃত্যু হয়েছে এমন তিনটি ঘটনারও খবর পাওয়া গেছে। তপ্ত রোদে জ্বালানির জন্য অপেক্ষমাণ মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে মিয়ানমারজুড়ে। শুধু মিয়ানমারই নয়-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ প্রায় এক মাস ধরে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যাহত করছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পেট্রোল স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। করছাড়, জ্বালানির কোটায় শিথিলতা এবং খরচ কমানোর পদক্ষেপসহ উচ্চ জ্বালানি মূল্যের প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকার নানা ধরনের নীতি হাতে নিয়েছে। পূর্ব আফ্রিকায় পচনশীল পণ্য রপ্তানিতে অগ্রাধিকার কেনিয়ায় বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়ায় সরকার পচনশীল পণ্যের রপ্তানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দ্য নেশন নামে একটি স্থানীয় পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, কেনিয়া পোর্টস অথরিটি ফুল, অ্যাভোকাডো ও সবজির মতো তাজা পণ্য দ্রুত খালাস ও রপ্তানি নিশ্চিত করতে বন্দর কার্যক্রমে পরিবর্তন এনেছে। একই সময়ে দেশের ফুল শিল্প কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। দেশটির চাষি ও রপ্তানিকারকদের বেসরকারি সংগঠন কেনিয়া ফ্লাওয়ার কাউন্সিল জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের কারণে তিন সপ্তাহে ক্ষতির পরিমাণ ৪২ লাখ ডলারের বেশি। কেনিয়ার কিছু চা চাষি ও রপ্তানিকারক বিবিসিকে বলেছেন, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে থাকায় তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত। পাশের দেশ ইথিওপিয়ায় প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ জ্বালানি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান, সার্ভিস স্টেশন এবং ভোক্তাদের জ্বালানি সাশ্রয় করতে এবং জরুরি সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। নাইজেরিয়ায় যানবাহন রূপান্তর ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নাইজেরিয়ায় পেট্রোলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। নাইজেরিয়া বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ হলেও তাদের কোনো সরকার–মালিকানাধীন রিফাইনারিই চালু নেই। ডাঙ্গোতে রিফাইনারি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গত বছর চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশটি বছরের পর বছর আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানির ওপর নির্ভর করতো। নতুন রিফাইনারি পাম্পে পেট্রোলের দাম কিছুটা কমাতে সাহায্য করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে। পরিবহন খরচ কমাতে প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ টিনুবু সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (সিএনজি) চালিত যানবাহনে রূপান্তর কিট এবং বৈদ্যুতিক যান (ইভি) সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন। এতে বড় ও ছোটো রিফুয়েলিং স্টেশন, সমন্বিত রিফুয়েলিং ইউনিট, সিএনজিচালিত যানবাহন এবং রূপান্তর কর্মসূচিসহ সিএনজি অবকাঠামো স্থাপন যুক্ত থাকবে। প্রেসিডেন্ট আরও বলেছেন, এই উদ্যোগ দেশব্যাপী বিদ্যুৎচালিত যানবাহন বা ইভি উন্নয়ন, চার্জিং অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ সম্প্রসারণেও নেতৃত্ব দেবে। টিনুবু সারা নাইজেরিয়ায় দ্রুত গাড়ি রূপান্তর কিট বিতরণের ওপর জোর দিচ্ছেন, যাতে এগুলো সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য থাকে।তিনি বলেছেন, এটি অর্জনে এই উদ্যোগ ক্রেডিটকর্প নাইজেরিয়া, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করবে, যাতে নতুন, সাশ্রয়ী অর্থায়ন মডেল তৈরি করা যায়-যা সাধারণ মানুষের কাছে এসব রূপান্তর সহজলভ্য করে তুলবে। টিনুবু মোবাইল রিফুয়েলিং ইউনিট (এমআরইউ) দ্রুত চালুর নির্দেশও দিয়েছেন, যেন সিএনজির সহজলভ্যতা বাড়ে। তিনি বলেন, এই উদ্যোগের আওতায় গ্যাসচালিত যানবাহন ও বিদ্যুৎচালিত যানবাহন দুটোই থাকবে। ভিয়েতনামে কর প্রত্যাহার ভিয়েতনাম সরকার ২৭ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানির ওপর পরিবেশ কর প্রত্যাহারের জরুরি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ২৬ মার্চ এক সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে। এই নতুন পদক্ষেপকে ইরানে যুদ্ধের ধাক্কা থেকে তেলের বাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়ার উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে বৈশ্বিক তেলের দাম কমা এবং কর হ্রাস-এই দুইয়ের প্রভাবে ভিয়েতনামে জ্বালানির দাম বাস্তবে নিচে নেমেছে, যদিও সরকারকে রাজস্বের বড় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভিয়েতনাম আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ব্যাপক নির্ভরশীল। দুটি রিফাইনারি (নিঘি সন ও বিন সন) থাকলেও দেশটি মার্চের শুরু থেকেই জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করে। জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে ভিয়েতনাম নাগরিক ও সরকারি কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে উৎসাহিত করেছে। সম্প্রতি দেশটির সরকার কাতার, কুয়েত, আলজেরিয়া ও জাপানসহ কয়েকটি দেশের কাছে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তা চেয়েছে। গত ২৩ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিন রাশিয়া সফরকালে দুই দেশের মধ্যে তেল ও গ্যাস উৎপাদন বিষয়ে একটি চুক্তি সই করা হয়েছে। শুধু ভিয়েতনাম নয়-বাড়ি থেকে কাজ করতে উৎসাহিত করা মিয়ানমারের নীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মিয়ানমারে জ্বালানি রেশনিং মিয়ানমারের সামরিক সরকার বলছে, ২৭ মার্চ থেকে ইঞ্জিনের আকার অনুযায়ী জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থা চালু হবে। তারা জানিয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ আপাতত পর্যাপ্ত থাকলেও ভবিষ্যতে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে এ ধরনের সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সামরিক কাউন্সিলের অধীনস্থ জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঘাটতি রোধে তারা জ্বালানি ব্যবহারের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ চালাচ্ছে। সামরিক সরকার আরও ঘোষণা করেছে যে, জ্বালানি সংকট প্রতিরোধ ও ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যে ২৫ মার্চ ২০২৬ থেকে সরকারি দপ্তরগুলোতে প্রতি সপ্তাহে বুধবার ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ (ডব্লিউএফএইচ) ব্যবস্থা চালু করা হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্ভব হলে বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহিত করা হয়েছে। রেশনিং ব্যবস্থার আওতায় প্রতি সপ্তাহে একবার জ্বালানি কেনা যাবে, অথবা সর্বোচ্চ দুই কিস্তিতে কেনা যাবে এবং বরাদ্দ ট্র্যাক করা হবে বারকোড ও কিউআর কোডের মাধ্যমে। শুধু উইন্ডশিল্ডে সরকারি হোলোগ্রামযুক্ত স্টিকার থাকা যানবাহন জ্বালানি কিনতে পারবে এবং বিক্রির আগে স্টেশনকর্মীদের কোড স্ক্যান করতে হবে। মোটরসাইকেল প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ আট লিটার জ্বালানি দুই কিস্তিতে কিনতে পারবে। তিন চাকার যানবাহন সর্বোচ্চ ২৫ লিটার তিন কিস্তিতে। ব্যক্তিগত ও সরকারি গাড়ি ইঞ্জিনের আকার অনুযায়ী (২,০০০ সিসি থেকে ৩,০০০ সিসির ওপরে) প্রতি সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪৫ লিটার পর্যন্ত কিনতে পারবে-দুই কিস্তিতে। জরুরি ও জনসেবা প্রদানকারী গাড়িগুলোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট সীমা থাকবে না। মিয়ানমার যেখানে এখনো জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা মোকাবিলার পরিকল্পনা করছে, থাইল্যান্ডের কিছু অংশে তা এরই মধ্যে বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। থাইল্যান্ডে ডিজেল ফুরিয়ে যাওয়া গত দুই সপ্তাহ ধরে থাইল্যান্ডজুড়ে বিশেষ করে ব্যাংককের বাইরে পেট্রোল স্টেশনগুলোয় ডিজেল সরবরাহ শেষ হয়ে গেছে এবং প্রথমেই ডিজেল ফুরিয়েছে। এই সংকট বিভিন্ন খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দৈনন্দিন যানবাহনের চালক থেকে শুরু করে কৃষি ও মৎস্য শিল্প বিশেষ করে যাদের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি সচল রাখতে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা রয়েছে তারা বেশ বিপাকে পড়েছেন। কর্তৃপক্ষ বড় সংরক্ষণাগার ও স্বতন্ত্র ট্যাংক পরিদর্শন শুরু করেছে। নতুন বিধিমালায় জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে রিজার্ভ মজুত থেকে সরবরাহ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টা পরিবহন চালুর অনুমতিও দেওয়া হয়েছে যেন বিতরণে বাধা কমে। মার্চের শুরু থেকে ঘোষিত অন্যান্য নীতির মধ্যে রয়েছে বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থা, সরকারি ভবনগুলোতে জ্বালানি ব্যবহার কমানো-যার মধ্যে রয়েছে এয়ার কন্ডিশন ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না রাখা এবং সরকারি কর্মীদের আনুষ্ঠানিক পোশাকের পরিবর্তে হালকা পোশাক (হাফহাতা) পরার অনুমতি। সরকার সব সরকারি বিভাগের বিদেশ সফরও অবিলম্বে স্থগিত করেছে। টিটিএন