TheBangladeshTime

প্রিয়তম অসুখ সে: নিকষ কালো অন্ধকার

2026-03-28 - 09:20

উম্মে হাবিবা কনা বিকেলের দিকে হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামল। হৃদি তখন খোলা মাঠে একটা শুকনো খড়ের গাদার ওপর বসে ছিল। যতদূর চোখ যায়, কোথাও কেউ নেই। কেবল ধু ধু ফসলের মাঠ। মাঠের পাশে নদী। নদীর বুকে শব্দ। সেই শব্দে নূপুরের ছন্দ তুলে নেমে এলো বৃষ্টি। হৃদি তটস্থ গলায় বলল, ‘এখন? এখন কী হবে?’ জ্বি, এমনই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনের উপন্যাস ‘প্রিয়তম অসুখ সে’ পড়া শেষ করলে। বইটিতে ঘোরের মধ্যে পরে কিভাবে মানুষ ভুল পথে হেঁটে বিভ্রান্ত হয়ে সুখটাকে অসুখে পরিণত করে, জীবনটাকে নিকষ কালো অন্ধকারে আনে; সেটারই প্রকাশ ঘটেছে। গভীর ভালোবাসাও যে মানুষ পায়ে ঠেলে অবহেলার সাগরে নিমজ্জিত হতে পারে, বইটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। হৃদি মেয়েটা ভুল করেছে, চরম ভুল, জীবন দিয়ে সে তার ভুলের মাশুল দেয় অবশেষে। তবে বিবেকের দংশন আমি নেহালের মাঝে দেখতে পাইনি, একবারও না। প্রথম থেকেই সে চেষ্টা করেছে খোলসে আবৃত থেকে নিজের হিংস্র রূপ লুকাতে। সুদর্শন ও বিদেশে সেটেল হিসেবে হাই প্রোফাইল তৈরি করতে, পেরেছেও। মানুষ এমনও নিকৃষ্ট হয়! আর অনিক, একটা ফুলের নাম। নরম স্নিগ্ধ ফুল। যাকে জগৎ সংসারে একের পর এক ধাক্কা সহ্য করে সামনে আগাতে দেখলাম। বাবার মৃত্যু, রহস্য উদঘাটন করতে আগাতে পারে না সে। দরিদ্রতার কারণে অসহায় হয় বার বার। তবুও কারো প্রতি তার কোনো অভিযোগ নেই, ঘৃণা নেই। সে তার প্রিয়তমার কাছেও প্রাপ্যটা পেলো না! লালচান বোডিং সেন্টারে কিশোর রাশুর আগমন, তাদের সাথে ভয়ংকর খেলায় যোগ দেওয়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলকে ব্যবহার করে বেআইনি অসৎ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পড়ে থ্রিলারপ্রিয় পাঠকরা চমকে উঠতে বাধ্য। গ্রাম থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা অবন্তী, তার গ্রাম, মঈনের সাথে সম্পর্ক, হৃদিদের বাসায় হামলার শিকার—এসব প্রত্যেকটিই একেকটা চমক হিসেবে আসতে থাকে বইটিতে। আরও পড়ুন গডেস অভ অ্যামনেশিয়া: প্রেম-উপাখ্যান উপন্যাসের চরিত্রায়ন অসাধারণ। হৃদি অস্থির, চঞ্চল, আবেগী। যখন যা মন চায় করা টাইপ। কিন্তু এতটা ইমম্যাচিউর কীভাবে হতে পারে একটা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ে, আমার মাথায় আসে না। অনিক কীভাবে এমন ধৈর্য নিয়ে কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতি পারি দিতে পারে—তাও একাই; সবটা মুখ বুজে সহ্য করতে পারে, আমার জানা নেই। নেহাল প্রথম দর্শনে দুধভাত টাইপ ছেলে। বাড়ি-গাড়ি-টাকা-পয়সা থাকার পরেও কীভাবে নম্রতা-ভদ্রতাটাকে মুখোশ বানানো যায়—এর থেকেই শেখা উচিত। তিথি যেন অন্য জগত থেকে এসেছে। মা-বোনের থেকে সম্পূর্ণ আলদা একটা মানুষ। যে জাগতিক দুঃখ-কষ্ট দেখে বুড়ি ঠাকুমার মত জ্ঞান-গরিমা লব্ধ হয়েছে। অবন্তী সহজ-সরল নির্ভেজাল মেয়ে। ভেতরে পাহাড়সম কষ্ট লুকিয়ে শক্ত থাকার চেষ্টা করে সর্বদা। রোখসানা বেগম ও রাহিমা বানু হৃদি ও অনিকের মা। দুজন দুই রকমের হলেও মায়েরা মমতাময়ী হয় আর সন্তানের ভালো চায়, সেটাই কমন। মাহতাব স্ত্রী সুমিকে ভালোবাসার পরেও কেন জানি তার আলাদা জগত ছিল। ভেবেছিলাম কেউ তাকে টানছে, নষ্ট করতে চাইছে। অথচ সে-ই অন্যদের পথভ্রষ্ট করতো। অন্যান্য চরিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মঈন, রিয়া, রাশু, শাখাওয়াত হোসেন, জামশেদ, লাল চান মিয়া প্রত্যেকেই অনন্য। একেক জনের পরিচয় দিতে গেলে লেখা বড় হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রকে নিজেকে কল্পনা করে আমিও হৃদির মাঝে হারিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু মেয়েটা যখন মোহে আটকালো, আমি অবাক হয়েছি। তারপর তার ভুল পথে পা বাড়ানো দেখে এত কষ্ট লেগেছে, এতটা অসহ্য যন্ত্রণা হয়েছে, হাত-পা ছুড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করেছে। তারপর যখন আরও আগালাম, নিজেকে শক্ত করে পড়তে লাগলাম। এমনকি পুরো বইটা শেষ করলাম; তখন পাঠক হিসেবে আমি সন্তুষ্ট। লেখক হিসেবে সাদাত হোসাইনও সার্থক। যেন অন্যরকম অভিজ্ঞতা। উন্মুখ হয়ে পড়ছিলাম প্রতিটা পাতা। যারা পড়বেন, মেয়েরা যে ছোট ছোট ভুল করে কত বড় বিপদে পড়ে যায়, ধ্বংস হয়ে যায়—সেটা উপলব্ধি করতে পারবেন। আরও পড়ুন এখানে কয়েকটি জীবন: যে গল্প হৃদয়ে গাঁথা ওপরের চাকচিক্য দেখে সুখ হবে, এমনটা কখনো ভাববেন না। বাস্তবতা আলাদা, আজ যার হাত ছেড়ে দেবেন পরম সুখের কথা চিন্তা করে। তার পরিস্থিতি খারাপ থেকে ভালো হবে একদিন। কিন্তু আপনার ভালো কোনোদিনও হবে না। রঙিন চশমা পরলে ততটুকু সময়ই সুন্দর দেখায়, সারাদিন পরে থেকে দেখবেন কতটা বিরক্তি আর বেমানান সেটা। বইয়ের নাম: প্রিয়তম অসুখ সে লেখক: সাদাত হোসাইন প্রচ্ছদ: মো. সাদিতউজজামান প্রকাশক: অন্যপ্রকাশ প্রকাশকাল: বইমেলা ২০২২ মূল্য: ৭০০ টাকা। এসইউ

Share this post: