মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম না পেয়ে মাথায় হাত চাষিদের
2026-03-07 - 06:44
মানিকগঞ্জে মুড়িকাটা পেঁয়াজের ভালো ফলন হলেও দাম নিয়ে হতাশায় ভুগছেন পেঁয়াজ চাষিরা। এ বছর পেঁয়াজের দাম আশানুরূপ না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। বর্তমানে বাজারে প্রতিমণ ১ হাজার থেকে ১১০০ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে চাষিদের। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর মানিকগঞ্জ জেলার সাতটি উপজেলায় মোট ৮ হাজার ৯৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষ করা হয়েছে। জেলার মধ্যে হরিরামপুর, ঘিওর ও শিবালয় উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। শুক্রবার ও শনিবার হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা এবং শিবালয় উপজেলার টেপরা পেঁয়াজের বাজার ঘুরে দেখা যায়, আকারভেদে প্রতি মণ পেঁয়াজ ১ হাজার থেকে ১১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজ চাষিরা জানান, উৎপাদন খরচ, শ্রমিক মজুরি, সার ও কীটনাশকের দাম বিবেচনায় এই মূল্য খুবই কম। নগদ অর্থের প্রয়োজনের কারণে অনেক কৃষক মাঠ থেকে পেঁয়াজ তুলে সরাসরি বাজারে বিক্রি করছেন। এতে ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কম দামে পেঁয়াজ কিনে নিচ্ছেন। কৃষকদের দাবি, বাজারে পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে তারা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতেন এবং আগামী মৌসুমে পেঁয়াজ চাষে আরও উৎসাহিত হতেন। ছয়ানি গালার পেঁয়াজ চাষি রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, গত বছর আমি ৩ বিঘা জমিতে সাগা (মুড়ি কাটা) পেঁয়াজের চাষ করেছিলাম। ফলনও ভালো হয়েছিল এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় বেশ লাভ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এ বছর ঋণ নিয়ে ৭ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছি। কিন্তু এখন বাজারে যে দাম দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে ঋণের টাকা পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার যদি অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ না করে, তাহলে আমাদের মতো চাষিদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। বাল্লা গ্রামের পেঁয়াজ চাষি ইমান আলী জাগো নিউজকে বলেন, আমি প্রায় ২০ বছর ধরে নিয়মিত পেঁয়াজ চাষ করে আসছি। গত বছর পেঁয়াজ চাষ করে প্রায় চার লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। ভেবেছিলাম, এ বছর ভালো ফলন ও ভালো দাম পেলে সেই লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নিয়ে সামান্য লাভ করতে পারবো। কিন্তু বর্তমানে বাজারে যে দর দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে এ বছরও আমাকে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হবে। এভাবে যদি বারবার লোকসান হতে থাকে, তাহলে আমাদের মতো কৃষকদের জন্য কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। তখন বাধ্য হয়ে হয়ত কৃষি কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে হবে। রাজর কর্তা গ্রামের বাসিন্দা আরমান হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে হলে বীজ কেনা, চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলা ভাড়া, জমি চাষ, সেচ, সার, গোবর, নিড়ানি, শ্রমিক ও উত্তোলন খরচ মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এর পাশাপাশি আমরা যারা অন্যের জমি লিজ নিয়ে আবাদ করি, আমাদের বিঘাপ্রতি বার্ষিক ১০ হাজার টাকা লিজমানি দিতে হয়। ফলে আমাদের খরচ বিঘাপ্রতি ৪০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। এছাড়া অনেকেই আছেন চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করেছেন, দাম কম হওয়ায় এখন আমরা সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে। ঝিটকা বাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ফবেদ মোল্লা বলেন, গত এক সপ্তাহ দাম আরও কম ছিল। আজ ১ হাজার থেকে ১১০০ করে আমরা পেঁয়াজ নিচ্ছি। হয়ত এই দামটাও কৃষকের জন্য কম। সরকার যদি বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করে তাহলে হয়ত দাম আরও একটু উঠতে পারে। মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহজাহান সিরাজ জাগো নিউজকে বলেন, এখন পেঁয়াজের ভরা মৌসুম চলছে। বাজারে আমদানি অনেক বেশি। আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কৃষকদের অনুরোধ করছি একটু সময় নিয়ে পেঁয়াজ বিক্রি করার জন্য। আমার এয়ার ফ্লো মেশিন দিচ্ছি। প্রতিটি মেশিনে ২০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবে। একটু সময় নিয়ে পেঁয়াজ বাজারজাত করলে কৃষক লাভবান হবেন। মো. সজল আলী/এফএ/এএসএম