দেশজুড়ে তেল কেনার হিড়িক, ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড়
2026-03-06 - 14:04
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে দেশজুড়ে তেল মজুতের হিড়িক পড়েছে। দেশে তেলের দাম বাড়তে পারে—এমন আতঙ্কে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় করছেন গ্রাহকরা। তবে চাহিদামতো তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর— লালমনিরহাট সরেজমিনে লালমনিরহাট সদর ও আদিতমারী উপজেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই মোটরসাইকেল ও ট্রাক্টরের দীর্ঘ সারি। অনেকে ড্রাম ভরে তেল সংগ্রহ করছেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুতদার তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দাম হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ ক্রেতারা। শহরের বিনিময় ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা ক্রেতা মো. লিয়ন বলেন, ‘ইরান, আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার কারণে বিভিন্ন তেল শোধনাগারে হামলা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের খবর শুনেছি। এর ফলে তেলের দাম বাড়তে পারে জেনেই পাম্পে এসে তেল মজুত করছি। কয়েকদিনতো ভালোভাবে চালানো যাবে। পরিস্থিতি ঠিক হলে পরে আবার নেওয়া যাবে। এখন না নিলে দাম বাড়লে আমাদেরই লোকসান হবে।’ পাবনা পাবনা শহরের মেরিল বাইপাস এলাকার ইয়াকুব ফিলিং স্টেশন, অনন্ত বাজার এলাকার মেসার্স হাইওয়ে ফিলিং স্টেশন, রাধানগরের এসএম ফরিদ ফিলিং স্টেশন ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকাসহ বেশিরভাগ পাম্পে গ্রাহকদের ভিড় দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাতে এসব পাম্পে দীর্ঘ সারি পড়ে যায়। পরে আজকের মজুত অনুযায়ী ২০০-৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া বন্ধ করে দেন পাম্প মালিকরা। কয়েক ঘণ্টায় তেল ফুরিয়ে গেছে দাবি করে দু-একটি বড় পাম্প ছাড়া বেশিরভাগই বন্ধ করে দেয়। রাধানগরের এসএম ফরিদ ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলে তেল নিতে আসা সাইমন ও রনি জানান, হঠাৎ শুনেছেন কাল থেকে তেল নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই তাড়াহুড়ো করে বাইক নিয়ে এসেছেন। এমনি সময়ে সাধারণত ট্যাংক ফুল লোড না দিলেও পরে পাওয়া যাবে না আশঙ্কায় আজ ফুল লোড দিতে চেয়েছেন তারা। কিন্তু ২০০-৫০০ টাকার বেশি দিচ্ছে না। সাতক্ষীরা খুলনা ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না হওয়ায় সাতক্ষীরার পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকাল থেকে জেলার বেশিরভাগ পাম্পে মোটরসাইকেলপ্রতি সর্বোচ্চ ৩০০ টাকার তেল দেওয়ার কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাতক্ষীরা শহরের একটি পাম্পে তেল নিতে আসা কয়েকজন মোটরসাইকেল চালক জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মাত্র ৩০০ টাকার তেল পাওয়া যাচ্ছে। এতে দূরপাল্লায় যাতায়াত করা তাদের জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে সাতক্ষীরার এবি খান পেট্রোল পাম্পের মালিক তাছিন কবীর খান বলেন, চাহিদার তুলনায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ অনেক কম। তাই যাতে সবাই কিছুটা হলেও তেল পায়, সে কারণে আপাতত মোটরসাইকেলপ্রতি ৩০০ টাকার কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এ ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হবে। রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ সারি। তবে বেশিরভাগ পাম্পেই একজন গ্রাহককে ৩০০ টাকার বেশি জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে অনেক গ্রাহকের মধ্যেই ক্ষোভ দেখা গেছে। নগরীর লতা ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল কিনতে আসা মোটরসাইকেলচালক রবিউল ইসলাম খোকন বলেন, আমি মোটরসাইকেল নিয়ে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে যাতায়াত করবো। কিন্তু আমাকে তেল দিল মাত্র ৩০০ টাকার। তেলের সংকট নেই, কিন্তু যুদ্ধের আতঙ্কে সবাই হুড়োহুড়ি করে তেল কিনছে। কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা আরেক মোটরসাইকেলচালক সোহেল রানা বলেন, সকালে এসে প্রায় আধা ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। তবুও ৩০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না। এতে দূরের পথে যাতায়াত করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ছে। ভৈরব (কিশোরগঞ্জ) কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহন চালকরা চাহিদা অনুযায়ী পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেন সরবরাহ পাচ্ছেন না। পাম্প মালিকদের দাবি, পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় চাহিদা মতো তেল দেওয়া যাচ্ছে না। শুক্রবার সকাল থেকে শহরের ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘুরে গেলে দেখা যায়, বাস, পিকআপ ও মোটরসাইকেল চালকরা জ্বালানি তেল নিতে স্টেশনে ভিড় করছেন। কিন্তু তাদের অভিযোগ তারা চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না। আরও পড়ুন: জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়াতে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি: বিপিসি মোটরসাইকেলে ২, প্রাইভেটকারে ১০ লিটারের বেশি তেল নেওয়া যাবে না উত্তরা থেকে যাত্রী নিয়ে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে যাচ্ছিলেন প্রাইভেটকারচালক মো. রাজু। তিনি বলেন, ‘পাম্পে জ্বালানির জন্য এসেছি। আমার গাড়ির জন্য প্রয়োজন ২০ লিটার কিন্তু পাম্প থেকে আমাকে দিচ্ছে ৪ লিটার। এখন বাকি পথ কীভাবে যাবো সেই চিন্তায় আছি।’ চুয়াডাঙ্গা চুয়াডাঙ্গায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে মজুত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকে ক্রেতারা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করছেন। অনেকেই বেশি পরিমাণ তেল নিতে এলেও কম তেল নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন। অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্প মালিকরা। চুয়াডাঙ্গা শহরের একাডেমি মোড়ের মোজাম্মেল হক পেট্রোল পাম্পের সহকারী ম্যানেজার আশাবুল হক বলেন, ‘আমরা খুলনার নোয়াপাড়া ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ করি। বর্তমানে জ্বালানি তেল বিক্রিতে কোটা সিস্টেম চালু হয়েছে। আগে দৈনিক তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার লিটার তেল বিক্রি হতো। এখন চাহিদা বেড়ে ১০-১২ হাজার লিটার বিক্রি হচ্ছে।’ রাজবাড়ী রাজবাড়ীতে হঠাৎ করেই জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়ে গেছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৈরি হচ্ছে গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি। দীর্ঘ সময় সিরিয়ালে থেকে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। একজন মোটরসাইকেলচালককে ২০০ এবং প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাসকে ৫০০ টাকার বেশি জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে না। শুক্রবার দুপুরে রাজবাড়ীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। পেট্রোল পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় হয়তো গ্রাহকরা তেল মজুত করতে পাম্পে ভিড় করছেন। তবে ডিপো থেকে তেল না পাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহকদের জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে পারছেন না পাম্প মালিকরা। ফলে মোটরসাইকেল চালকদের ১০০ থেকে ২০০ এবং প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস চালকদের ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। গাইবান্ধা গাইবান্ধায় হঠাৎ জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে যাতায়াতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জেলার কিছু ফিলিং স্টেশনে এরইমধ্যে তেল শেষ হয়ে গেছে। আর কিছু ফিলিং স্টেশনে শেষ পর্যায়ের দিকে। ফিলিং স্টেশনে কর্মচারীদের দাবি, তেল না আসায় ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ । বিকেলে গাইবান্ধা শহরে বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, মোটরসাইকেলচালকদের দীর্ঘ সারি। তেল পাওয়ার আশায় অনেকেই এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরছেন। যেসব ফিলিং স্টেশনে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোতে উপচেপড়া ভিড়। গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনালে মেমার্স রহমান ফিলিং স্টেশনে তেল না থাকায় সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করে নোটিশ টানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলা থেকে সাখাওয়াত হোসেন নামের বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা মোটরসাইকেলের তেল নিতে এসেছেন। দুটি স্টেশনে ঘুরে তিনি তেল পাননি। তিনি বলেন, ‘তেল না পেলে যে সমস্যায় পড়বো, তার কোনো সমাধান নেই। যদি তেল না পাই, তাহলে কীভাবে বাড়িতে যাবো, সেটাইতো বুঝতে পারছি না।’ ময়মনসিংহ ময়মনসিংহের পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। কোনো পাম্পে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন, আবার কোনো পাম্পের সামনে রশি টানিয়ে জানান দেওয়া হচ্ছে জ্বালানি নেই। এ অবস্থায় বিড়ম্বনায় পড়েছেন জ্বালানি নিতে আসা লোকজন। বিকেলে মহানগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পেও একই অবস্থা। নগরীর চায়নামোড় এলাকায় অবস্থিত মেসার্স হাইওয়ে ফিলিং স্টেশন। এই পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পের সামনে রশি টানিয়ে রাখা হয়েছে। রশি দেখে যানবাহন নিয়ে চালকরা ফিরে যাচ্ছেন। দিঘারকান্দা ও বাইপাস এলাকায় অবস্থিত পাম্পেও তেল নেই। ফলে অন্য পাম্পে তেলের সন্ধানে যাচ্ছেন চালকরা। অনেকে সড়কের পাশে বিভিন্ন দোকান থেকে খোলা তেল কিনছেন। খায়রুল ইসলাম নামের একজন মোটরসাইকেলচালক জাগো নিউজকে বলেন, ‘কয়েকটি পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে অবশেষে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সড়কের একটি দোকান থেকে তেল নিয়েছি। এখানে লিটার প্রতি ১০ টাকা বেশি নিয়েছে দোকানি। তবে কিছুদিনের মধ্যে তেলের দাম বাড়ার এবং সংকট বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আমার বন্ধু ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের একটি পাম্প থেকে তেলের ট্যাঙ্কি ফুল করেছে।’ এসআর/এএসএম