চাঁদরাতের শেষ সেলাই
2026-03-22 - 04:20
ঈদের আগের দিন সন্ধ্যা। চাঁদটা তখনো পুরো পুরো হেসে ওঠেনি, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে ঈদের আমেজ। এশার নামাজের পর মসজিদ থেকে ভেসে আসছে মানুষের কোলাহল, হাঁটার শব্দ। মার্কেটের দোকানপাটগুলো শেষ মুহূর্তের ঈদ কেনাকাটার ভিড়। রাস্তায় রঙিন বাতি জ্বলছে, আতশবাজি ফুটছে। চাঁদপুর শহরের এক কোণায় ছোট্ট একটা টিনের ঘর। দরজার সামনে একটা পুরোনো সেলাই মেশিন। সেই মেশিনের সামনে বসে আছে মানুষটা, নাম তার হাশেম দর্জি। লোকটা বয়সে পঞ্চাশ পেরিয়েছে। চোখে কালো ফ্রেমের মোটা চশমা। মাথার চুলে সাদা রং ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু হাত দুটো এখনো দ্রুত চলে। কারণ আজ রাতটা তার জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত একটি রাত। ঈদের আগে গ্রামের, শহরের কত মানুষ তার কাছে জামা বানাতে দেয়। হাশেম দর্জি কখনো কাউকে ফিরিয়ে দেয় না। কিন্তু আজ তার মুখে একটু ক্লান্তি আছে। কারণ সকাল থেকে এখন পর্যন্ত সে একটানা জামা কাপড় সেলাই করছে। ঘরের ভেতর থেকে ছোট্ট একটা কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘আব্বা, তুমি এখনো কাজ করছো?’ হাশেম মাথা তুলে তাকাল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তার দশ বছরের ছেলে রাফিকে দেখে বলল, ‘হ্যাঁ বাবা। আর দুইটা জামা বাকি।’ রাফি একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তার চোখে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন। ‘আব্বা, আমার ঈদের নতুন জামাটা কবে বানাবে?’ হাশেমের হাত থেমে গেল। মুহূর্তের জন্য তার চোখের ভেতর একটা অদ্ভুত কষ্ট নড়ে উঠল। সে হাসার চেষ্টা করল। বলল, ‘আগে মানুষের জামাগুলো দেই বাবা। তারপর তোমারটা বানাবো।’ রাফি মাথা নেড়ে ভেতরে চলে গেল। কিন্তু তার ছোট্ট মুখটা কেমন যেন মলিন হয়ে গেল। হাশেম আবার মেশিন চালাতে লাগল। সেলাই মেশিনের শব্দে রাতটা কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল গত বছরের ঈদের কথা। সেদিনও এমনই এক রাত ছিল। রাফি তখনো একই প্রশ্ন করেছিল, ‘আব্বা, আমার নতুন জামা হবে তো?’ হাশেম তখন বলেছিল, ‘হবে বাবা। অবশ্যই হবে।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়নি। কারণ তখন হাশেমের স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। হাসপাতালে অনেক টাকা খরচ হয়েছিল। ঈদের দিন সকালে রাফি পুরোনো একটা পাঞ্জাবি পরে নামাজে গিয়েছিল। সহপাঠী কারো সামনে সে কিছু বলেনি। শুধু রাতে এসে বলেছিল, ‘আব্বা, পুরোনো জামাতেও ঈদ করা যায়, তাই না?’ ছোট্ট ছেলের এমন কথায় সেদিন হাশেমের বুকটা ভেঙে গিয়েছিল। আজ আবার বছর ঘুরে ঈদ এসেছে। হাশেম মনে মনে ভাবলো, এইবার ছেলের জন্য একটা জামা না বানালে আমি মানুষ না। কিন্তু সমস্যা হলো তার কাছে এখন এক টাকাও নেই। সব কাপড়ই গ্রাহকদের। ঠিক তখনই দরজার সামনে একটা মানুষ এসে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হাশেম ভাই, কাজ শেষ?’ লোকটা পাশের এলাকার ব্যবসায়ী মাহবুব সাহেব। ‘জি, এইটা আপনার ছেলের পাঞ্জাবি।’ মাহবুব সাহেব জামাটা হাতে নিয়ে দেখলেন। ‘ওহ! খুব সুন্দর হয়েছে।’ তিনি পকেট থেকে টাকা বের করলেন। ‘এই নেন আপনার মজুরি।’ হাশেম টাকা হাতে নিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে ভাবল, এই টাকা দিয়ে রাফির জন্য একটা কাপড় কিনবো। ঠিক তখনই আরেকটা ছোট্ট ছেলে এসে দাঁড়াল। ময়লা কাপড় পরা। পায়ে স্যান্ডেল নেই। চোখে অদ্ভুত ভয়ের ছাপ। ছেলেটা আস্তে বলল, ‘চাচা, একটা কথা বলবো?’ হাশেম মাথা উঁচু করে তাকাল। ‘বলো বাবা।’ ছেলেটা একটু ইতস্তত করল। ‘চাচা আমার একটা জামা বানিয়ে দিবেন?’ হাশেম অবাক। ‘তোমার কাপড় কোথায়?’ ছেলেটা মাথা নিচু করল। ‘কাপড় নাই।’ ‘তাহলে?’ ছেলেটা কাঁপা গলায় বলল, ‘কাল ঈদ, আমার কোনো নতুন জামা নাই।’ ঘরটা হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। হাশেমের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে আস্তে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বাবা নেই?’ ছেলেটা বলল, ‘বাবা নাই, দুই বছর আগে মারা গেছে।’ ‘মা?’ ‘মা অন্যের বাসায় কাজ করে।’ হাশেম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল নিজের ছেলে রাফির মুখ। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার কাছে একটা ছোট্ট কাপড় ছিল। মনে মনে রাফির জন্য ভেবে রাখা কাপড়। সে কাপড়টা হাতে নিলো। তারপর ছেলেটার দিকে তাকাল। ‘তোমার নাম কি?’ ‘সোহেল।’ হাশেম হালকা হাসল। ‘সোহেল, বসো। তোমার মাপ নেই।’ ছেলেটার চোখ হঠাৎ আনন্দে চকচক করে উঠল। ‘সত্যি চাচা?’ ‘হ্যাঁ বাবা। আজ রাতেই বানিয়ে দেব।’ রাত আরও গভীর হলো। মেশিন আবার চলতে লাগল। হাশেম সেলাই করছে। কিন্তু এবার তার চোখে এক অদ্ভুত শান্তি। ভেতর থেকে রাফি বের হয়ে এলো। সে দেখল একজন অচেনা ছেলে বসে আছে। ‘আব্বা, ও কে?’ হাশেম বলল, ‘ওর নাম সোহেল।’ রাফি তাকিয়ে থাকল। তারপর দেখল, আব্বা একটা ছোট্ট জামা বানাচ্ছে। রাফি আস্তে জিজ্ঞেস করল, ‘এইটা কার জন্য?’ হাশেম একটু থমকে গেল। তারপর নরম কণ্ঠে বলল, ‘ওর জন্য।’ রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তার চোখে কিছুটা কষ্ট লুকিয়ে ছিল। কিন্তু সেই কষ্টের ভেতরেও একটা কোমল আলো রয়েছে। সে আস্তে বলল, ‘ওর তো জামা নাই, তাই না?’ হাশেম মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, বাবা।’ রাফি একটু হাসল। ‘তাহলে আগে ওরটাই বানাও।’ হাশেম ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতর এক দীর্ঘশ্বাস বয়ে গেলো। রাত প্রায় শেষ। চারদিক থেকে ফজরের আজান ভেসে এলো। সোহেলের নতুন জামা তৈরি। সাদা পাঞ্জাবি। সোহেল সেটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ‘চাচা, আমি কি এটা সত্যি নিয়ে যাব?’ হাশেম হাসল। ‘হ্যাঁ বাবা। এটা এখন তোমার।’ সোহেল হঠাৎ হাশেমকে জড়িয়ে ধরল। ‘চাচা, আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুক।’ ছেলেটা চলে গেল। তার মুখে এমন হাসি, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহার পেয়েছে আজ। পরদিন সকালে ঈদের নামাজে যাওয়ার সময় রাফি পুরোনো পাঞ্জাবিটা পরে দাঁড়িয়ে আছে। হাশেম তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে জল। ‘বাবা, আমি পারলাম না।’ রাফি কিছুটা হাসল। ‘কেন পারলেন না?’ ‘তোমার জন্য জামা বানাতে পারলাম না।’ রাফি বলল, ‘কিন্তু আব্বা আপনি তো একটা ঈদ বানিয়েছেন।’ ছেলের এমন কথায় হাশেম অবাক। ‘মানে?’ রাফি বলল, ‘ওই ছেলেটা আজ নতুন জামা পরে ঈদ করবে। তাই না?’ হাশেম চুপ করে রইলো। রাফি আবার বলল, ‘তাহলে এইটাই তো আসল ঈদ আব্বা।’ হাশেম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরল। ঠিক তখন দরজার বাইরে থেকে একজনের কণ্ঠে একটা আওয়াজ ভেসে এলো, ‘হাশেম ভাই!’ হাশেম বের হয়ে দেখল মাহবুব সাহেব দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা প্যাকেট। ‘গতকাল ভুলে গেছিলাম। এটা আপনার ছেলে রাফির জন্য।’ মাহাবুব সাহেবের এমন উপহার পেয়ে হাশেম অবাক। ‘কি এটা?’ মাহবুব সাহেব হাসলেন। ‘আমার ছেলের জন্য দুটো পাঞ্জাবি বানিয়েছিলেন। একটা বেশি হয়ে গেছে। ভেবেছি রাফিকে দেই, তাই নিয়ে এলাম।’ প্যাকেট খুলতেই দেখা গেল একটা সুন্দর নতুন পাঞ্জাবি। সেটি দেখে রাফির চোখ আনন্দে বড় হয়ে গেল। হাশেম আকাশের দিকে তাকাল। তার মুখে একটাই কথা, ‘আল্লাহ, তুমি কত সুন্দর করে ঈদ বানাও।’ এসইউ