TheBangladeshTime

ঈদের একাল সেকাল

2026-03-20 - 06:01

এক সময় ঈদ মানেই ছিল উৎসবের এক দীর্ঘ প্রস্তুতি। রোজা শেষ হওয়ার দশ দিন আগে থেকে গ্রামবাংলার বাজারগুলো জমে উঠতো নানান আয়োজন আর রঙিন সামগ্রীতে। ছোট ছোট দোকানের সামনে ঝুলত রঙিন ঈদকার্ড, জরির পোস্টার, কাগজের ব্যানার। সবখানে লেখা থাকত ‘ঈদ মোবারক’। সেসব দৃশ্য আজ প্রায় স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। মাত্র এক দশক আগেও যে দৃশ্যগুলো ছিল গ্রামীণ ঈদ সংস্কৃতির অঙ্গ, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ঈদকার্ড এক দশক আগেও ঈদ এলেই বাজারে দেখা যেত বাহারি ঈদকার্ড। ছোট থেকে বড়, সব বয়সী মানুষই প্রিয়জনদের জন্য কার্ড কিনতেন। কেউ পাঠাতেন ডাকযোগে, কেউ বা হাতে হাতে পৌঁছে দিতেন। রঙিন ফুল, চাঁদ-তারা, মসজিদের নকশা, কখনো আবার কবিতার পংক্তি দেখা যেত ওসব কার্ডে। খুললে ভেতরে হাতে লেখা থাকত আন্তরিক শুভেচ্ছাবার্তা। একটি ছোট্ট কাগজের কার্ড যেন হয়ে উঠতো আবেগের বাহক। অনেকেই সেই কার্ড বছরের পর বছর যত্ন করে রেখে দিতেন স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে। সময় বদলেছে। এখন ঈদের শুভেচ্ছা পৌঁছে যায় কয়েক সেকেন্ডে। মোবাইল ফোনের এসএমএস, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট — সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে শুভেচ্ছা জানিয়ে দেয় এক বা একাধিক মানুষকে। যোগাযোগ সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই হাতে লেখা শুভেচ্ছার উষ্ণতা। ঘর সাজানোর উৎসব আগের ঈদে ঘর সাজানোও ছিল উৎসবের বড় অংশ। গ্রামের বাজারে বিক্রি হতো ‘ঈদ মোবারক’ লেখা জরির পোস্টার, কাগজের ব্যানার কিংবা রঙিন ফেস্টুন। বাড়ির দরজা, দেয়াল বা বসার ঘরে সেগুলো টাঙিয়ে রাখা হতো ঈদকে ও অতিথিকে স্বাগত জানাতে। শিশু-কিশোররা নিজেরাও রঙিন কাগজে লিখে বানাত ‘ঈদ মোবারক’ সাইনবোর্ড। দোকানপাটেও দেখা যেত বিশেষ সাজসজ্জা। ককসিট বা দোকানের সামনে টানানো থাকত বড় বড় সাইনবোর্ড — ‘ঈদ মোবারক’। অনেক দোকানে আবার রঙিন বাতি বা কাগজের ফুল দিয়ে সাজানো হতো। এখন সেই দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না। আধুনিক ব্যানার, ডিজিটাল প্রিন্ট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোর প্রবণতা বাড়ায় ঐতিহ্যবাহী এসব সাজসজ্জা প্রায় বিলুপ্ত। গ্রামীণ ঈদের সামাজিকতা এক সময় ঈদের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল মানুষের মিলনমেলা। গ্রামের মানুষ ঈদের দিন সকালে নতুন পোশাক পরে একসঙ্গে ঈদগাহে যেতেন। নামাজ শেষে শুরু হতো কোলাকুলি আর শুভেচ্ছা বিনিময়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সালাম করা, বড়দের কাছ থেকে “ঈদি” পাওয়া, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে দাওয়াত—এসব ছিল ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজও এসবের কিছু কিছু আছে, তবে আগের মতো প্রাণবন্ত নয়। অনেকেই ঈদের দিনে ব্যস্ত থাকেন স্মার্টফোনে। ছবি তোলা, পোস্ট করা কিংবা অনলাইনে সময় কাটিয়ে দেন অনেকে। প্রযুক্তির যুগে বদলে গেছে শুভেচ্ছা-বিনিময় প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন প্রবাসে থাকা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ভিডিও কলে মুহূর্তেই ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। একটি বার্তা বা একটি পোস্টের মাধ্যমে একসঙ্গে শত শত মানুষকে শুভেচ্ছা জানানো সম্ভব। ফলে সময় বাঁচে, যোগাযোগও দ্রুত হয়। কিন্তু এর মাঝেই হারিয়ে গেছে কিছু আবেগঘন মুহূর্ত। হাতে লেখা কার্ডের অনুভূতি, ডাকপিয়নের অপেক্ষা, কিংবা প্রিয়জনের কাছ থেকে পাওয়া ছোট্ট শুভেচ্ছাবার্তার আনন্দ এখন অনেকটাই অতীত। উৎসবের বাণিজ্যিক রূপ আগে ঈদের কেনাকাটা সীমাবদ্ধ ছিল প্রয়োজনের মধ্যেই। নতুন পোশাক, সেমাই, কিছু মিষ্টি আর ঘর সাজানোর সামান্য আয়োজনেই উৎসব পূর্ণতা পেত। এখন ঈদকে ঘিরে বিশাল বাণিজ্যিক আয়োজন তৈরি হয়েছে। বড় বড় শপিং মল, অনলাইন শপ, ফ্যাশন ব্র্যান্ড — সবকিছুই ঈদকে কেন্দ্র করে বিশেষ প্রচারণা চালায়। গ্রামেও এখন শহরের মতোই আধুনিক বাজারের প্রভাব পড়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী অনেক উপকরণই হারিয়ে গেছে আধুনিক পণ্যের ভিড়ে। গ্রামীণ ঈদেও শহুরে সংস্কৃতির ছোঁয়া এখনকার গ্রামীণ ঈদেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে শহুরে সংস্কৃতির ছোঁয়া। এক সময় ঈদের বিকেল মানেই ছিল গ্রামে ছোট ছোট আয়োজন — উঠানে বা মাঠে সাজানো হতো অস্থায়ী মঞ্চ, সেখানে স্থানীয় তরুণরা গান গাইত, কেউ কবিতা আবৃত্তি করত, আবার কোথাও চলত হাসি-আড্ডায় ভরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গ্রামের খোলা মাঠে বা উঠানে বসত আড্ডা। কেউ গল্প করতেন, কেউ খেলতেন লুডু বা ক্যারাম। অনেক জায়গায় শিশু-কিশোরদের জন্য আয়োজন হতো গ্রামীণ খেলাধুলার। এখন ঈদের দিনে গ্রামের অনেক মানুষই ঘরের ভেতর টেলিভিশনের সামনে বসে সময় কাটান। বিভিন্ন চ্যানেলের ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান, নাটক বা সিনেমা দেখতেই কেটে যায় দিনের বড় একটি অংশ। ফলে আগের মতো উঠান-আড্ডা, গ্রামীণ মঞ্চে গান গাওয়া কিংবা সবাই মিলে আয়োজন করার যে সামাজিক আনন্দ ছিল, তা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ ঈদের সেই সহজ-সরল, সম্মিলিত আনন্দের জায়গা দখল করে নিচ্ছে শহুরে বিনোদনের প্রভাব। স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকা ঈদ তবু ঈদের মূল সৌন্দর্য এখনো একই জায়গায় — মানুষের ভালোবাসা আর মিলনের আনন্দে। প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, ঈদের দিন সকালে নতুন পোশাক পরে নামাজে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করা কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করার আনন্দ কখনই মুছে যায় না। এক দশক আগের ঈদ ছিল একটু ধীর, একটু সরল; এখনকার ঈদ দ্রুত আর প্রযুক্তিনির্ভর। তবু উৎসবের মূল সুর একই — খুশি ভাগ করে নেওয়া। হয়তো আগামী দিনের ঈদ আরও বদলাবে। কিন্তু স্মৃতির অ্যালবামে রয়ে যাবে সেই রঙিন ঈদ কার্ড, জরির পোস্টার আর হাতে লেখা ‘ঈদ মোবারক’ শুভেচ্ছা, যেগুলো একসময় গ্রামবাংলার ঈদকে করে তুলেছিল আরও আপন, আরও উষ্ণ। আরএমডি

Share this post: