সর্বাত্মক হরতালে অচল দেশ, বেতার-টিভি বয়কটের ঘোষণা শিল্পীদের
2026-03-03 - 18:14
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ও গণহত্যার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ১৯৭১ সালের ৪ মার্চ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ঢাকাসহ সারা বাংলায় চলা এ হরতালে প্রদেশের বেসামরিক শাসনব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে এবং জনজীবন স্থবির হয়ে যায়। হরতাল চলাকালে খুলনায় সেনাবাহিনীর গুলিতে ছয়জন শহীদ হন। চট্টগ্রামে দুদিনে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ১২১ জনে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তোলে। বেতার-টিভি বয়কটের ঘোষণা দেশে চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বেতার-টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের একদল শিল্পী এক বিবৃতিতে ঘোষণা করে- যতদিন পর্যন্ত দেশের জনগণ ও ছাত্রসমাজ সংগ্রামে লিপ্ত থাকবেন, ততদিন তারা বেতার ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন না। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন লায়লা আর্জুমান্দ বেগম, আফসারী খানম, আতীকুল ইসলাম, ফেরদৌসী রহমান, মুস্তফা জামান আব্বাসী, গোলাম মোস্তফা, হাসান ইমাম, জাহেদুর রহিম, আলতাফ মাহমুদ, ওয়াহিদুল হক, এ এম হামিদসহ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পী। সাংবাদিক ইউনিয়নের কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এক জরুরি সভায় বাংলার জনগণের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে সামরিক শাসন প্রত্যাহারের দাবি জানায়। একই সভায় ৬ মার্চ সাংবাদিকদের মিছিল এবং বায়তুল মোকাররম এলাকায় সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদের নেত্রী কবি সুফিয়া কামাল ও মালেকা বেগম যৌথ বিবৃতিতে ৬ মার্চ বায়তুল মোকাররম এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান। মার্চে চলমান অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে যশোরে বিক্ষোভ মিছিল/ছবি: সংগৃহীত শেখ মুজিবের বিবৃতি ও কর্মসূচি এক বিবৃতিতে শেখ মুজিব বলেন, ‘চরম ত্যাগ স্বীকার ছাড়া কোনোদিন কোনো জাতির মুক্তি আসেনি।’ ঔপনিবেশবাদী শোষণ ও শাসন অব্যাহত রাখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বানে সাড়া দেওয়ায় তিনি বীর জাতিকে অভিনন্দন জানান। তিনি ৫ ও ৬ মার্চ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেসব সরকারি ও বেসরকারি অফিসে কর্মচারীরা এখনো বেতন পাননি, শুধু বেতন দেওয়ার জন্য সেসব অফিস আড়াইটা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া করাচি প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান দেশকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে রক্ষার লক্ষ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। এদিকে পিডিপি প্রধান নূরুল আমীন ১০ মার্চ রাজনৈতিক নেতাদের সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে অবিলম্বে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঢাকায় আহ্বানের জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি দাবি জানান। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ক্ষোভ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫ জন শিক্ষক পৃথক বিবৃতিতে ঢাকার ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার গণবিরোধী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সব মিলিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও গভীরতর হয়ে ওঠে। জনমনে উত্তেজনা ও উদ্বেগ বিরাজ করছিল। সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছিলেন। তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংবাদপত্র এমএএস/একিউএফ