TheBangladeshTime

বাংলাদেশের সড়ক ও রেলপথে কাঠামোগত সহিংসতার সমাজতত্ত্ব

2026-03-29 - 04:50

বাংলাদেশে প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি যান্ত্রিক ট্র্যাজেডি নয়—এটি একটি সুগভীর কাঠামোগত অভিযোগের তথ্যবিন্দু। প্রশ্নটি আর এই নয় যে মানুষ কেন রাস্তায় মরে; বরং সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির নিরিখে প্রশ্ন হলো, কারা এই মৃত্যুর ধারাবাহিকতা থেকে সুবিধা পায় এবং কেন এই প্রাণহানি একটি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ছন্দে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতর পরবর্তী দিনগুলোতে আমরা যখন লাশের মিছিল দেখি, তখন তা কোনো দৈব ঘটনা থাকে না, বরং এটি একটি ব্যবস্থার সুপরিকল্পিত ব্যর্থতা হিসেবে ধরা দেয়। ২৮ মার্চ, ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের ঈদের ছুটিতেও সড়ক ও রেলপথে যে রক্তপাত ঘটেছে, তা আমাদের পরিবহন শাসনের কদর্য রূপটিকেই উন্মোচিত করে। বাংলাদেশের যাতায়াত ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করতে হলে প্রথমে ইউহান গালটুং-এর 'কাঠামোগত সহিংসতা' তত্ত্ব (Johan Galtung’s Structural Violence Theory) আলোচনা করা আবশ্যক। গালটুং সরাসরি সহিংসতা এবং কাঠামোগত সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন। যখন কোনো ব্যবস্থা বা প্রতিষ্ঠানের বিন্যাসের কারণে মানুষের জীবন বিকাশের সম্ভাবনা রুদ্ধ হয় বা অকাল মৃত্যু ঘটে, তখন তাকে কাঠামোগত সহিংসতা বলা হয়। বাংলাদেশে যখন বিআরটিএ ফিটনেসবিহীন যানবাহনকে রাস্তায় নামার অনুমতি দেয়, কিংবা যখন হাইওয়ে পুলিশের জনবল সংকটের কারণে আইন প্রয়োগ সম্ভব হয় না, তখন কোনো একক ব্যক্তি খুনি হিসেবে চিহ্নিত না হলেও ব্যবস্থাটি খুনি হিসেবে কাজ করে। ২০২৬ সালের ২৫ মার্চ দৌলতদিয়ায় যে বাসটি পদ্মা নদীতে তলিয়ে গেল, যেখানে ১১ জন নারী ও ৭টি শিশুসহ ২৬ জন মানুষ মারা গেলেন, সেটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দশকের পর দশক ধরে ফেরি পারাপার আধুনিক না করার এবং চালকদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ না করার কাঠামোগত সিদ্ধান্তের সঞ্চিত ফলাফল। এই মৃত্যুগুলো একটি অদৃশ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে বিতরিত, যা ঠিক এভাবেই তৈরি করা হয়েছে যাতে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়ভার না বর্তায়। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে ৭,৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় যে বিপুল প্রাণহানি ঘটেছে এবং তার ফলে প্রায় ২৫,৫৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা একটি উন্নয়নকামী অর্থনীতির জন্য অসহনীয়। কিন্তু এই ক্ষতি কেবল টাকার অঙ্কে পরিমাপযোগ্য নয়। গাই স্ট্যান্ডিংয়ের 'প্রিকারিয়েট' বা প্রান্তিক শ্রমজীবী শ্রেণি তত্ত্ব (Guy Standing’s The Precariat Theory) এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। স্ট্যান্ডিং এই শ্রেণিকে কেবল দারিদ্র্য দিয়ে নয়, বরং তাদের জীবন ও কাজের নিরাপত্তাহীনতা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করেছেন। বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্যে দেখা যায়, নিহতদের প্রায় ৭৮ শতাংশই ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ, যারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস। তাদের মৃত্যু কোনো দৈবচক্র নয়; এটি তাদের ওপরই কেন্দ্রীভূত থাকে যাদের যাতায়াতের নিরাপদ কোনো বিকল্প নেই। মোটরসাইকেল, যা বর্তমানে মোট সড়ক মৃত্যুর ৩৬ শতাংশের জন্য দায়ী, তা মূলত এই প্রিকারিয়েট বা প্রান্তিক শ্রেণির প্রধান বাহন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অধিকাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী তরুণরা, যারা মূলত ডেলিভারি রাইডার বা ছোট ব্যবসায়ী। রাস্তা এখানে এলোমেলোভাবে কাউকে মারে না; এটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে শিকার করে, যাদের রাষ্ট্রের সুরক্ষিত কাঠামোয় প্রবেশের সামর্থ্য নেই। বাংলাদেশের সড়ক ও রেল শাসনের এই নৈরাজ্যকে বুঝতে হলে জর্জিও আগামবেনের 'ব্যতিক্রমের রাষ্ট্র' (Giorgio Agamben’s State of Exception) ধারণাটি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আগামবেন দেখিয়েছেন কীভাবে জরুরি অবস্থা বা ব্যতিক্রমী অবস্থাই একসময় স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়। বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তার জন্য আইনের অভাব নেই; 'সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮' একটি অত্যন্ত আধুনিক আইনি কাঠামো ছিল। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ যখন রাজনৈতিক প্রভাব বা সিন্ডিকেটের চাপে স্থগিত রাখা হয়, তখন সেই 'ব্যতিক্রমী' অবস্থাই স্থায়ী রূপ নেয়। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, কিন্তু সেই প্রতিবেদনগুলো বাস্তবায়িত হয় না। ২০২৬ সালের ঈদে কুমিল্লার লেভেল ক্রসিংয়ে মেইল ট্রেন যখন একটি বাসে ধাক্কা দেয় এবং ১২টি লাশ পড়ে থাকে, তখন বেরিয়ে আসে সেখানে কোনো গেটম্যানই ছিল না। এটি কোনো তদারকির ভুল নয়, বরং এটিই আমাদের রেল শাসনের স্বাভাবিক ছন্দ। ব্যতিক্রমই যখন নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, তখন জবাবদিহিতার জায়গাটি শূন্য হয়ে পড়ে। এই অব্যবস্থাপনার মূলে রয়েছে পিয়ের বুর্দিয়ের 'ক্ষেত্র তত্ত্ব' (Pierre Bourdieu’s Field Theory)। বুর্দিয়ের মতে, সামাজিক জীবন বিভিন্ন ক্ষমতার ক্ষেত্রের লড়াইয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। বাংলাদেশের পরিবহন খাত কেবল একটি বাজার নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ক্ষেত্র। এখানে পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন এবং মালিক সমিতিগুলো ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের গভীর প্রভাব রয়েছে। তাদের এই 'রাজনৈতিক পুঁজি'র সামনে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর 'প্রতীকী পুঁজি' অত্যন্ত নগণ্য। নিরাপদ সড়ক চাই বা যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতো সংগঠনগুলো আইওটি প্রযুক্তি বা আধুনিক নজরদারির সুপারিশ দিলেও সেগুলো রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। বছরে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হলো সেই চড়া মূল্য, যা এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটগুলোর প্রভাব বলয় বজায় রাখার বিনিময়ে সমাজকে দিতে হচ্ছে। সড়ক ও রেলপথে ২০২৬-এর এই ঈদ পরবর্তী হত্যাযজ্ঞ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কেবল সচেতনতা দিয়ে এই মহামারি রোখা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক-পরিবহন সংযোগের এই অশুভ আঁতাত না ভাঙলে, প্রতিটি ঈদ বা উৎসব হবে প্রিয়জন হারানোর এক একটি ট্র্যাজেডি। রাষ্ট্রকে আজ বেছে নিতে হবে—সে কি অস্বীকারের স্বস্তিতে থাকবে, নাকি নাগরিকের নিরাপদ জীবনের গ্যারান্টি দেবে। সমাজ কেন এই বৃহৎ মাত্রার ক্ষতি মেনে নিচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করে স্ট্যানলি কোহেনের 'অস্বীকারের রাষ্ট্র' (Stanley Cohen’s States of Denial) বিশ্লেষণ। কোহেন দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র বৃহৎ ট্র্যাজেডি বা মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে তথ্য থাকা সত্ত্বেও সম্মিলিতভাবে তা অস্বীকার করে বা এড়িয়ে যায়। বাংলাদেশ তার সড়ক ও রেল দুর্ঘটনার সংকট সম্পর্কে অজ্ঞাত নয়। সংবাদপত্র ও নাগরিক সমাজ প্রতিমুহূর্তে ডেটা বা উপাত্ত দিচ্ছে। তবুও নির্বাচনের পর নির্বাচন বা বাজেটের পর বাজেটে এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান আসে না। বিশেষ করে উৎসবের সময় যেমন ২০২৬ সালের ঈদ পরবর্তী ১০ দিনে যে ২৭৪ জন মানুষ মারা গেছেন, তা গত বছরের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেশি হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে কোনো কার্যকর অস্থিরতা দেখা যায় না। এই 'সম্মিলিত অস্বীকার' বা ডিনায়াল ঢাকবার জন্য তদন্ত কমিটির নাটক সাজানো হয়, যা মূলত মানুষের স্মৃতিকে মুছে দেওয়ার একটি উপায় হিসেবে কাজ করে। এই কাঠামোগত সহিংসতার শিকারে নারী ও শিশুদের অবস্থান বুঝতে কিম্বার্লে ক্রেনশর 'ইন্টারসেকশনালিটি' (Kimberlé Crenshaw’s Intersectionality Theory) অত্যন্ত জরুরি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ডেটা অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু এবং ১২ শতাংশ নারী। এই পরিসংখ্যানগুলোকে কেবল সংখ্যা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। শিশুরা মারা যাচ্ছে স্কুল যাতায়াতের পথে বা গ্রামীণ মহাসড়ক পার হতে গিয়ে, যেখানে কোনো নিরাপদ পথচারী অবকাঠামো নেই। অন্যদিকে নারীরা মারা যাচ্ছেন তাদের যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা ও অনিরাপদ যানের গাদাগাদিতে বসার কারণে। জুডিথ বাটলারের 'ভঙ্গুর জীবন' বা 'প্রিকারিয়াস লাইফ' (Judith Butler’s Precarious Life) ধারণা অনুযায়ী, কিছু মানুষের জীবন অন্যদের তুলনায় বেশি 'শোকযোগ্য' হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন ভিআইপি বা প্রভাবশালী ব্যক্তির মৃত্যু যে রাজনৈতিক চাঞ্চল্য তৈরি করে, ফরিদপুর বা কুমিল্লার মহাসড়কে পিষ্ট হওয়া একজন প্রান্তিক কৃষকের মৃত্যু তা করে না। এই প্রান্তিক জীবনগুলোকে 'গণনাযোগ্য' করে তোলাই এখন সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। পরিবহন খাতের এই শাসন-ব্যর্থতাকে কলিন ক্রাউচের 'পোস্ট-ডেমোক্রেসি' বা উত্তর-গণতন্ত্র (Colin Crouch’s Post-Democracy) তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এখানে গণতান্ত্রিক শাসনের বাহ্যিক রূপ—যেমন আইন, সংসদীয় কমিটি বা সরকারি কাউন্সিল—অব্যাহত থাকলেও প্রকৃত জবাবদিহিতা থাকে না। আন্তোনিও গ্রামশির 'আধিপত্য' বা 'হেজেমনি' (Antonio Gramsci’s Hegemony) আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শাসক শ্রেণি কেবল জবরদস্তি নয়, বরং সম্মতির মাধ্যমেই শাসন করে। সড়ক নিরাপত্তার নামে মাঝে মাঝে 'ট্রাফিক সপ্তাহ' পালন বা প্রচারপত্র বিলি করা আসলে জনগণের ক্ষোভকে শান্ত রাখার এক ধরণের কৌশল। এটি রূপান্তরের চেয়ে প্রদর্শনীতে বেশি বিশ্বাসী। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ ছিল এই আধিপত্য রক্ষার একটি হাতিয়ার, যা বড় আন্দোলনের মুখে পাস হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট কেবল কারিগরি কোনো সমস্যা নয়; এটি একটি শাসন-সমস্যা (Governance problem)। এটি এমন এক অর্থনীতির বহিঃপ্রকাশ যেখানে মুনাফা এবং রাজনৈতিক প্রভাব মানুষের জীবনের চেয়ে দামি। ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, রাস্তা এখানে একটি সমাজতাত্ত্বিক আয়না। এই আয়নায় আমরা আমাদের শ্রেণি বিভাজন, প্রান্তিক মানুষের প্রতি অবজ্ঞা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিহীন চেহারাটি দেখতে পাই। এই আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সংস্কারের দাবি না তুললে মৃত্যুর এই উৎসব চলতেই থাকবে। তদন্ত কমিটির অপ্রকাশিত প্রতিবেদন আর কবরে থাকা হাজার হাজার কর্মক্ষম মানুষের দীর্ঘশ্বাসই হবে আমাদের প্রবৃদ্ধির আসল দলিল। পরিশেষে, সড়ক ও রেলপথে ২০২৬-এর এই ঈদ পরবর্তী হত্যাযজ্ঞ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কেবল সচেতনতা দিয়ে এই মহামারি রোখা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক-পরিবহন সংযোগের এই অশুভ আঁতাত না ভাঙলে, প্রতিটি ঈদ বা উৎসব হবে প্রিয়জন হারানোর এক একটি ট্র্যাজেডি। রাষ্ট্রকে আজ বেছে নিতে হবে—সে কি অস্বীকারের স্বস্তিতে থাকবে, নাকি নাগরিকের নিরাপদ জীবনের গ্যারান্টি দেবে। লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী। এইচআর/জেআইএম

Share this post: