TheBangladeshTime

মারদেকা মাঠে ৫ হাজার মানুষের মিলনমেলা, সঙ্গী হলেন বাংলাদেশিরাও

2026-03-01 - 10:03

প্রায় ৬১.৩ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত মালয়েশিয়া ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিগত বৈচিত্র্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ। বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির এই দেশে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। আর পবিত্র রমজান এলে সেই বন্ধন যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। মালয় ভাষায় ‘পুয়াসা’ মানে রোজা। রমজানের আগমনি বার্তা পৌঁছে দিতে পালিত হয় ‘শাহরুন মোবারাকুন’। সাইরেনের শব্দ আর ‌‘‘শাহরুন মোবারাকুন’’ অভিবাদনে মুখর হয়ে ওঠে চারদিক। উপহার বিনিময়, সৌজন্য সাক্ষাৎ আর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে বিশেষ ছাড়—সব মিলিয়ে রমজানকে ঘিরে শুরু হয় এক উৎসবমুখর প্রস্তুতি। শপিংমলগুলো আকর্ষণীয় অফার ঘোষণা করে, রোজার দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই জমে ওঠে কেনাকাটার ধুম। ভোজনরসিক মালয়েশিয়ানদের রমজানে চাই বাহারি ইফতার। তাই নগরবাসীর মন ছুটে যায় মারদেকায়। মাসজুড়ে বসে রমাদান মেলা। বিশেষ করে কুয়ালালামপুরের প্রাণকেন্দ্র মারদেকা মাঠে ইফতার আয়োজন যেন এক মিলনমেলায় রূপ নেয়। প্রতি বছর সিয়াম সাধনার মাসকে ঘিরে এখানে থাকে বিশেষ আয়োজন। শুধু মারদেকাই নয়, রাজধানী থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ফ্রি ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। ধনী-গরিব, স্থানীয়-বিদেশি—সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করেন। রমজান এলেই প্রতি শনি ও রোববার হাজারো মানুষ এক কাতারে বসে ইফতার করেন—এ যেন আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার এক অপূর্ব দৃশ্য। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রমজান ইফতার উপলক্ষে মারদেকা স্কোয়ারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পাঁচ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের নাগরিকের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ১৪তমের মতো আয়োজিত এ ইফতার মাহফিল সম্প্রীতি, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। জাতীয় সংস্কৃতি ও শিল্প বিভাগ (জেকেকেএন) আয়োজিত এই অনুষ্ঠান শুধু ইফতারেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং পারস্পরিক উখুয়াহ জোরদারের এক সুন্দর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। লামবুক পোরিজ বিতরণ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও তাদারুস, রমজান বিষয়ক তাজকিরা এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশনা দর্শনার্থীদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কর্মব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও মানুষ ভাগাভাগি করে নেন রমজানের পবিত্র আবহ। শনিবার প্রবাসী বাংলাদেশি জাকির হোসেন, আলম, রাসেল, মিলন, সাগর, মকবুল ও সুলেমানসহ কয়েকজন বন্ধু সিদ্ধান্ত নেন—ইফতার করবেন মারদেকা মাঠে। স্থানীয়দের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইফতার করতে বসেন তারা। ইফতারের অনুভূতি জানতে চাইলে প্রবাসীরা একবাক্যে বলেন, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে মিলিত হয়েছি। তবে সামনে ইফতার সাজানো থাকলেও মনে পড়ে যায় দেশের পরিবার। বাবা-মা, ভাই-বোন—সবার কথা ভেসে ওঠে চোখে। প্রবাসী জাকির বলেন, প্রবাসে হাজার কিছু দিয়ে ইফতার করলেও মন পড়ে থাকে দেশে। দেশে থাকতে ঠিক এ সময় আব্বা বাইরে থেকে কত কিছু নিয়ে আসতেন, মা যত্ন করে ইফতার বানাতেন। এখন প্রবাসে বসে তাদের খুব মিস করি। স্থানীয়দের ইফতার তালিকায় থাকে হাতে বানানো পিঠা, হালুয়া, সাদা ভাত, বিরিয়ানি, ফলমূলসহ নানা মালয়েশিয়ান খাবার। আম, তরমুজ, বাঙ্গি, কলা, পেঁপে, আপেল, আঙুর, কমলাসহ বিভিন্ন ফল দিয়ে সাজানো হয় ইফতার। এ মাসে মালয়েশিয়ানদের অতিথিপরায়ণতা আরও বেড়ে যায়। মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা রমজান পালন করেন দেশীয় আমেজে। মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হওয়ায় শ্রমিকদের নামাজ ও রোজার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। মসজিদগুলোতে বিনামূল্যে ইফতার এবং তারাবির নামাজের আয়োজন থাকে। বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টগুলোতেও থাকে দেশীয় ইফতারির সমারোহ—খেজুর, জিলাপি, শরবত, হালিম, ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ, লাচ্ছিসহ নানা আয়োজন। যেখানে বাংলাদেশিরা থাকেন, সেখানেই দলবেঁধে ইফতার করেন। তাদের বিশাল আয়োজন দেখে অনেক সময় অভিভূত হন স্থানীয়রাও। রমজানজুড়ে মারদেকাসহ বিভিন্ন স্থানে বসে বাজার রমাদান। তবে মালয়েশিয়ান খাবারের সমারোহ থাকলেও প্রবাসী বাঙালিদের টানে দেশীয় স্বাদই। বাসায় তৈরি কিংবা বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট থেকে আনা খাবারেই জমে ওঠে তাদের ইফতার। সুদূর প্রবাসে থেকেও তাই ইফতার মানেই—দেশ, পরিবার আর শেকড়ের টান। মারদেকার মাঠে বসে হাজারো মানুষের সঙ্গে ইফতার করলেও হৃদয়ের এক কোণে ঠিকই বাজতে থাকে দেশের আজানের সুর। এমআরএম/এমএস

Share this post: