TheBangladeshTime

কড়ি থেকে কাগুজে নোটের সমাহার ‘টাকা জাদুঘর’

2026-03-22 - 11:21

আপনার হাতে থাকা একটি টাকার নোটে কত ইতিহাস লুকিয়ে আছে কখনো ভেবেছেন, কিংবা কেমন ছিল আপনার পূর্বপুরুষদের বিনিময় মুদ্রা? অজানা সে ইতিহাসের গল্পেই সাজানো রয়েছে দেশের একমাত্র টাকা জাদুঘরে। রাজধানী ঢাকার মিরপুর-২ নম্বরে অবস্থিত ভিন্নধর্মী এ সংগ্রহশালা। প্রাচীন আমলের কড়ি থেকে শুরু করে আধুনিক কাগুজে নোট- শতাব্দীজুড়ে ব্যবহৃত মুদ্রার বিরল সংগ্রহ এখানে তুলে ধরেছে বাংলার অর্থনৈতিক বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস। জাদুঘরে ঢুকলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাংলার অর্থনৈতিক বিবর্তনের দীর্ঘ পথচলা। রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় রয়েছে চারটি সংগ্রহশালা। দেশের পাশাপাশি বিদেশের অনেক মুদ্রার ইতিহাসও এখানে পাবেন। প্রাচীন আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এ অঞ্চলে প্রচলিত প্রায় সব ধরনের মুদ্রা সংরক্ষিত আছে। বিশ্বের প্রায় ১২০টি দেশের প্রায় তিন হাজার পুরোনো মুদ্রার সংগ্রহ রয়েছে এ জাদুঘরে। সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া এখনো চলমান। ধাতব মুদ্রা ও কাগুজে নোটের পাশাপাশি এখানে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে মুদ্রা রাখার থলে, বিনিময় হওয়া প্রাচীন স্বর্ণালংকার, মুদ্রা নির্মিত অলংকার, প্রাচীন কাঠের বাক্স, লোহার তৈরি ব্যাংক, লোহার সিন্দুকসহ অর্থ সংরক্ষণের নানা ঐতিহ্যবাহী উপকরণ। যা দেখবেন জাদুঘরে প্রবেশের পর প্রথমেই চোখে পড়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাতব মুদ্রা। যার মধ্যে রয়েছে প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা (পাঞ্চ মার্কড), কৃষাণ যুগের মুদ্রা, হরিকেল মুদ্রা, দিল্লি ও বাংলার সুলতানদের জারি করা মুদ্রা, মোগল আমলের মুদ্রা এবং ব্রিটিশ শাসনামলের মুদ্রা। একই সঙ্গে আধুনিক সময়ের মুদ্রাও এখানে প্রদর্শিত হয়েছে। স্মরণাতীতকাল থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত বাংলার ছোট লেনদেনে ব্যবহৃত কড়িরও কিছু নমুনা দেখা যায় এখানে। আছে টাকা রাখার কাপড়ের থলে। প্রাচীন যুগে স্বর্ণের বিনিময়ে সম্পদ বিনিময় হতো। এমন কিছু স্বর্ণেরও দেখা মেলে। গুপ্ত সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত দ্বিতীয়ের স্বর্ণমুদ্রাসহ বিভিন্ন সময়ের রৌপ্যমুদ্রা, মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের জারি করা মুদ্রাও দেখা যায়। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৪শ ও ১৫শ শতকে বাংলার বিভিন্ন টাকশাল থেকে সুলতানরা মুদ্রা জারি করতেন। আরও পড়ুন ঢাকার কোন জাদুঘর কখন খোলা থাকে বছর পেরিয়ে টাকা জাদুঘর বাংলাদেশ-জাপান কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছরে স্মারক রৌপ্য মুদ্রা সম্রাট আদিল সুরি, সুলতান গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহ, সুলতান দাউদ খান কররানী, গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর বিন ফিরোজ, সম্রাট শাহ আলম, মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর, মোগল সম্রাট আহমেদ শাহ বাহাদুর শাহ, আব্বাসীয় খলিফাদের স্বর্ণ দিনার, দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি, গিয়াসউদ্দিন তুঘলক, মুহাম্মদ বিন তুঘলক, মোগল সম্রাট শাহজাহান, আওরঙ্গজেব, ফররুখশিয়ার ও ব্রিটিশ রানি ভিক্টোরিয়ার আমলের কিছু স্বর্ণমুদ্রাও চোখে পড়ে। জাদুঘরে কাজ করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোজায় স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় জাদুঘরে কিছুটা কম দর্শনার্থী থাকে। স্বাভাবিক সময়ে ২০০-২৫০ দর্শনার্থী আসেন জাদুঘরটি দেখতে। জাদুঘর দেখতে বাবা হায়দার আলীর সঙ্গে এসেছেন মনিপুর বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী মনিষা। মেয়েকে বিভিন্ন মুদ্রা দেখাচ্ছেন বাবা। উচ্চারণ করে বিভিন্ন মুদ্রার বিবরণ পড়তেও দেখা যায় মনিষাকে। হায়দার আলী বলেন, আমার বাসা কাছেই। অনেক দিন ধরে আসবো বলে ভাবছিলাম। ছুটি পেয়ে মেয়েকে নিয়ে আসলাম। জায়গাটা নিরিবিলি, এখানে শেখারও অনেক কিছু আছে। জাদুঘরের আরেকটি বড় আকর্ষণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাগুজে নোটের সংগ্রহ। এখানে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, সাবেক চেকোস্লোভাকিয়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব জাপানি ডলার, ইতালি, বিভক্ত জার্মানি, আফগানিস্তান, চীন, ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, ভিয়েতনাম ও কমিউনিস্ট আমলের পোল্যান্ডের নোট সংরক্ষিত রয়েছে। এমনকি এখন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কিছু দেশের মুদ্রাও এখানে আছে। যেমন সাবেক যুগোস্লাভিয়ার ধাতব মুদ্রা ও কাগুজে নোট, যার মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া একটি দেশের স্মৃতি টিকে আছে। একজন কর্মকর্তা জানান, বহু মানুষ দুষ্প্রাপ্য মুদ্রা জাদুঘরে দান করেছেন। কিছু মুদ্রা সংগ্রহ করা হয়েছে কেনার মাধ্যমে। টাকা জাদুঘরের উপ-কিপার মোহাম্মদ আসাদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যে কেউ চাইলে তাদের সংগ্রহ করা মুদ্রা জাদুঘরে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে আমাদের আমাদের কিছু ক্রাইটেরিয়া আছে, সেগুলো দেখে আমরা মুদ্রা বা টাকা নেই। ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র টাকা জাদুঘরের উদ্বোধন হয়। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, দিবস এবং কালজয়ী বক্তিদের স্মরণে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক স্মারক মুদ্রা ও স্মারক নোট প্রকাশ করেছে। সেগুলোও রয়েছে টাকা জাদুঘরে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২০ বছর-১৯৯১, গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমস-১৯৯২, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী-১৯৯৬, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৫ বছর পূর্তি-১৯৯৬, বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধন-১৯৯৮, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০০০, বাংলাদেশ আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ-২০১১, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী-২০১১, বাংলাদেশের বিজয়ের ৪০ বছর পূর্তি-২০১১, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার ৯০ বছর-২০১১ এবং জাতীয় জাদুঘরের ১০০ বছর পূর্তি-২০১৩ উপলক্ষে মুদ্রিত স্মারক মুদ্রা রয়েছে জাদুঘরে। শুধু মুদ্রা বা নোট নয়, ধাতব ও কাগজের মুদ্রার অনুমোদিত নকশা, টাকশাল থেকে মুদ্রা প্যাকেজিং, পরিবহন ও সংরক্ষণ পদ্ধতি, মুদ্রা নির্মিত বাংলার ঐতিহ্যবাহী অলংকার, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি স্থান পেয়েছে টাকা জাদুঘরের প্রদর্শনীতে। দর্শনার্থীদের জানা প্রয়োজন বৃহস্পতি ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিনই জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। প্রবেশে কোনো ফি নেওয়া হয় না, তবে প্রবেশের সময় অভ্যর্থনা কক্ষে নাম-ঠিকানা নিবন্ধন করতে হয়। জমা রাখতে হয়ে সঙ্গে থাকা ব্যাগ। টাকা জাদুঘরে ছবি তোলা নিষেধ। শনি থেকে বুধবার সকাল ১১টা থেকে ৫টা আর শুক্রবার বিকেল চারটা পর্যন্ত খোলা থাকে। এসএম/এএসএ

Share this post: