সকাল ৯টায় অফিসে উপস্থিতিই কি সমাধান?
2026-03-09 - 04:14
শনিবার (৭ মার্চ) সকাল সাড়ে ৮টায় নরসিংদীর পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কমপাউন্ডে অপেক্ষা করছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। সকাল ৯টায় ভেতরে প্রবেশ করে অর্ধেক চিকিৎসককে না পেয়ে দুঃখপ্রকাশ করেন তিনি। এ সময় সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের মন্ত্রী জানান, পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১ জন ডাক্তার থাকার কথা। ছুটিসহ নানা কারণে ১৬ জনের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু উপস্থিত আছেন মাত্র ৮ জন। মন্ত্রী বলেন, মানবসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ডাক্তারদেরকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। এর আগে গত ৪ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শনে যান ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি দীর্ঘক্ষণ ভূমি অফিসের বারান্দায় বসেছিলেন। এ সময় অফিসের কাউকে উপস্থিত পাননি তিনি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। যারা দায়িত্বে অবহেলা করবেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে তিন কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়। এতে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সব ধরনের নাগরিক সেবা বন্ধ হয়ে যায়। একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইনে প্রকাশিত এই খবরের নিচে পাঠকরা নানারকম মন্তব্য করেছেন। যেমন, ভূমি অফিস মানেই ভোগান্তি। আরেকজন লিখেছেন, আমার জমির খাজনাজনিত সমস্যা আছে, এ বিষয়ে সমাধান জানতে এসেছিলাম। কাউকে না পেয়ে ফিরে এসেছি। একজন লিখেছেন, দেশের সবগুলো ভূমি অফিসে শুদ্ধি অভিযান চালানো উচিত। এগুলো দুর্নীতির আখড়া। সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাসময়ে অফিসে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়গুলো। আদেশে বলা হয়, সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে কর্মদিবসে সকাল ৯টার মধ্যে নিজ নিজ দপ্তরে উপস্থিত থাকতে হবে। অফিস সময়ে শেষ হওয়ার পূর্বে কেউ নিজ দপ্তর ত্যাগ করবে না। অফিস চলাকালীন দাপ্তরিক বা জরুরি প্রয়োজনে কর্মকর্তা-কর্মচারীগণকে নিজ অনুবিভাগের প্রধানের অনুমতি গ্রহণকরত সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯-এর তফশিল অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তরে রক্ষিত ‘অফিস ত্যাগের রেজিস্টার’-এ এন্ট্রি : এবং ডিজিটাল হাজিরা প্রদানকরত অফিস ত্যাগ করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত, অফিস ত্যাগ, বিলম্বে অফিসে উপস্থিত হলে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ ও সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-২০১৮ অনুযায়ী শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর শুরু থেকেই সকাল ৯টায় অফিসে যাচ্ছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুধু নিজেই এমন নিয়ম মানছেন, তা নয়। মন্ত্রিসভার সদস্য ও সচিবরাও সময়মতো অফিসে আসছেন কি না, তাও তদারকি করছেন। বস্তুত প্রধানমন্ত্রীর এত সকালে অফিসে আসার ঘটনা মন্ত্রী, সচিবসহ অন্যদের জন্য কিছুটা বিড়ম্বনারও কারণ হচ্ছে। বিশেষ করে যারা দেরিতে অফিসে এসে অভ্যস্ত। কিন্তু যখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই অফিসে ঢুকে যাচ্ছেন সকাল ৯টায় এবং সরকারি ছুটির দিনেও অফিস করছেন, তখন মন্ত্রী ও সচিবদের না এসে উপায় কী! প্রশ্ন হলো, সকাল ৯টায় নির্ধারিত সময়ে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসে ঢুকলেই কি সরকারি অফিসগুলো ঠিক হয়ে যাবে? সেবার মান বেড়ে যাবে এবং হয়রানি ও ঘুস ছাড়াই সেবা মিলবে? অর্থাৎ অফিসের লোকেরা সঠিক সময়ে অফিসে গেলেই অফিসগুলো বদলে যাবে কি না বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোজগতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না—সেই প্রশ্নটি জনমনে আছে। ভূমি অফিস, বিশেষ করে অনেক জেলা ও উপজেলা রেজিস্ট্রার সম্পর্কে শোনা যায় তারা সপ্তাহে অফিস করেন এক থেকে দু-দিন। বাকি দিনগুলো তারা আসেন না। আর যে এক দু-দিন অফিস করেন, ওই দুদিনেই সপ্তাহের সব কাজ একসাথে করেন এবং দুহাত ভরে টাকা কামিয়ে চলে যান। যে-সব এলাকায় বিমানের সুযোগ আছে, সেসব জায়গায় বা তার কাছাকাছি জেলা উপজেলার কর্মকর্তারাও বিমানে যাওয়া-আসা করেন। তাদের পরিবার-পরিজন থাকে ঢাকায়। অফিসে যান শুধু টাকার বস্তা নিয়ে আসার জন্য। এগুলো খুব গল্প তা নয়। অনেক জায়গায় সরেজমিনে পরিদর্শন করলেই এর সত্যতা মিলবে। সরকারি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকাল ৯টার মধ্যে উপস্থিতি এবং কর্মঘণ্টার পুরোটা সময় অফিসে থাকা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি সরকারের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে যে, সে আসলে কী চায়? শুধু কর্মীদের সঠিক সময়ে অফিসে আসাটাকেই সরকার সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করবে নাকি এর মধ্য দিয়ে সেবার মান বাড়বে এবং সেবা পেতে গিয়ে নাগরিকদের হয়রানি ও দুর্নীতি কমানোই মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করবে? সুতরাং এখন যদি ওইসব কর্মকর্তা সরকারের চাপে সকাল ৯টায় অফিসে যেতে বাধ্যও হন, তারপর তাদের কতজন এই নিয়ম মানবেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কেননা মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীদের পক্ষে সারা দেশের সব অফিসে আকস্মিক পরিদর্শন সম্ভব নয়। সেজন্য যে-সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বেশি অভিযোগ, যেমন : ভূমি অফিস, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভিযান ও পরিদর্শনগুলো নিয়মিত হওয়া উচিত। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নানা উসিলায় এমনিতেই বছরের একটি বড় সময় ছুটির আমেজে থাকে। কিন্তু তারপরও শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস করান কি না, তা নিয়ে প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে। যাদেরকে জাতি গঠনের কারিগর বলা হয়, তারাই যদি নিজের ক্লাস বাদ দিয়ে প্রাইভেট টিউশনি আর কোচিংয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সেই শিক্ষকদের কাছ থেকে কোনো নীতি-নৈতিকতা তার শিক্ষার্থীরা শিখবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যে কেবল সার্টিফিকেট অর্জনের প্লাটফর্ম নয়, বরং এখান থেকে যে একজন মানুষ সত্যিকারের মানুষ হওয়ার দীক্ষা পাবেন—সেই ধারণাটিই ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। যার পেছনে আছে মূলত শিক্ষকদের অনৈতিকতা। শিক্ষকদের বেতন কম, অন্য পেশার তুলনায় তাদের পদোন্নতি কম ও ধীরে হয়—এমন অসংখ্য সমস্যা আছে। এসব সমস্যা সমাধানেও সরকারের উদ্যোগী হতে হবে। শুধু সকাল ৯টায় অফিসে আসার বাধ্যবাধকতা দিয়ে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ নয়, বরং মানুষ গঠনের কারিগরদের সম্মানজনক বেতন এবং পেশার লোকদের সঙ্গে তাদের পদোন্নতির বৈষম্যও দূর করতে হবে। সরকারি অফিসগুলোকে যদি ঘুস, দুর্নীতি, অনিয়ম আর নাগরিক হয়রানিমুক্ত করা না যায়, তাহলে শুধু সকাল ৯টায় কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে লাভ নেই। তাতে ফাঁকিবাজি করে অভ্যস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়তো সাময়িক অসুবিধা হবে; ঘুমে ব্যাঘাত ঘটবে—কিন্তু বেতনের বাইরেও তাদের অবৈধ উপার্জন বন্ধ হবে না। সুতরাং সকাল ৯টায় উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেয়েও বরং বেশি প্রয়োজন নাগরিকরা যাতে সেবাটা বিনা হয়রানি ও বিনা ঘুসে পায়, সেটি নিশ্চিত করা। একজন কর্মকর্তা যদি এক ঘণ্টা দেরিতে এসেও কোনো ধরনের হয়রানি আর ঘুস ছাড়াই হাসিমুখে মানুষকে সেবা দেন, সেটিও কম কথা নয়। বরং সেটিই জরুরি। কিন্তু সরকারের চাপে তারা সবাই নিয়ম মেনে সকাল ৯টায় এলেন, আবার ‘নিয়ম’ মেনেই ঘুস ও হয়রানির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখলেন, তাতে মানুষের কোনো লাভ নেই। বরং সরকারি অফিসগুলো যে তিমিরে ছিল, সেখানেই থাকবে। সরকারি অফিসগুলো দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে সকল সেবা ডিজিটালাইজড করা। মানুষকে যাতে অফিসে যেতে না হয়, বরং মানুষ যাতে ঘরে বসেই সেবা পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যখনই কোনো অফিসারের কাছে যেতে হয়, তিনিই ফাইলটা আটকে রেখে, নানারকম ফন্দিফিকির করে, নানারকম অজুহাত তুলে ঘুস নেন। ঘুস না দিলে হয়রানি করেন। এগুলো বন্ধ করার জন্য প্রয়োজন সরকারি অফিসের শত ভাগ ডিজিটালাইজেশন এবং সুশাসন। সুশাসন একদিনে নিশ্চিত হয় না। কিন্তু এটা শুরু করা জরুরি। সুশাসন নিশ্চিতের প্রধান উপায় হলো জবাবদিহি। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঘুষের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণাই হতে পারে এর একমাত্র সমাধান। কিন্তু এটি এক সপ্তাহ বা এক মাসে হবে না। এর জন্য সময় দিতে হবে। সেই সময়টা অনন্তকালও নয়। সরকার যদি প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথম বছর শুধু ভূমি অফিসকেই শত ভাগ না হোক, অন্তত ৮০ শতাংশ দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্যোগ নেয় এবং সরকার যদি সত্যিই এই কাজে আন্তরিক হয়, তাহলে বছর শেষে একটা ভালো ফলাফল দেখা যাবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলোয় হাত দিতে হবে। বড় বড় দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে পারলে ছোটোখাটো দুর্নীতিগুলো এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া ছোটোখাটো দুর্নীতি সামগ্রিকভাবে জনগণকে খুব বেশি ভোগান্তিতে ফেলে না। তবে সেটুকুও কাম্য নয়। সরকারি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকাল ৯টার মধ্যে উপস্থিতি এবং কর্মঘণ্টার পুরোটা সময় অফিসে থাকা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি সরকারের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে যে, সে আসলে কী চায়? শুধু কর্মীদের সঠিক সময়ে অফিসে আসাটাকেই সরকার সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করবে নাকি এর মধ্য দিয়ে সেবার মান বাড়বে এবং সেবা পেতে গিয়ে নাগরিকদের হয়রানি ও দুর্নীতি কমানোই মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করবে? লেখক : সাংবাদিক ও লেখক। এইচআর/জেআইএম