TheBangladeshTime

সমতার অসমাপ্ত মহাকাব্যে আমরা এখন কোথায়?

2026-03-08 - 08:24

১৯০৮ সালের সেই হাড়কাঁপানো শীতের সকালে নিউইয়র্কের রাজপথে যখন ১৫ হাজার নারী শ্রমিকের সম্মিলিত পদধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, তখন হয়তো সেই লড়াকু নারীরা কল্পনাও করতে পারেননি যে তাদের ‘রুটি ও গোলাপের’ লড়াই এক শতাব্দী পরেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে সমতার মশাল হয়ে জ্বলবে। ২০২৬ সালে আমরা যখন আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ১১৫তম বার্ষিকী উদযাপন করছি, তখন এটি কেবল একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মানব সভ্যতার অগ্রগতির এক বিশাল ও জটিল খতিয়ান। ১১৫ বছরের এই সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমা আমাদের দেখায় যে সমাজ সংস্কারের এই লড়াইটি ছিল রক্তক্ষয়ী, দীর্ঘমেয়াদী এবং অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ১৯১১ সালে যখন প্রথমবার অস্ট্রিয়া, জার্মানি বা সুইজারল্যান্ডে নারী দিবস পালন করা হয়, তখন দাবি ছিল স্রেফ ভোটাধিকার আর কর্মক্ষেত্রে অমানবিক পরিবেশ থেকে মুক্তি। আজ ২০২৬ সালে সেই দাবির প্রেক্ষাপট বদলেছে, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আন্দোলনের ভাষা পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু লিঙ্গ বৈষম্যের সেই আদিম শেকলগুলো আজও পুরোপুরি ভেঙে ফেলা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা কতটা পথ পেরোলাম আর কতটা পথ বাকি রয়ে গেল, তার নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ আজ সময়ের দাবি। এ বছরের মূল প্রতিপাদ্য ‘গিভ টু গেইন’ বা সমতার জন্য বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব আমাদের এক নতুন দার্শনিক উপলব্ধির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই দর্শনের মূলে রয়েছে বিনিময় এবং সমৃদ্ধির এক অপূর্ব রসায়ন। যখন একটি সমাজ নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ প্রদান করে, তখন সেই সমাজ আসলে বিনিময়ে বহুগুণ সমৃদ্ধি ফিরে পায়। এটি কোনো একতরফা করুণা বা দাক্ষিণ্য নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ পৃথিবী গড়ার সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত এবং লাভজনক বিনিয়োগ। ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতা ওল্টালে আমরা দেখি ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনের আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে ক্লারা জেটকিনের সেই যুগান্তকারী প্রস্তাবনার কথা। তিনি চেয়েছিলেন প্রতি বছর এমন একটি দিন থাকুক যখন পৃথিবীর প্রতিটি কোণার নারীরা একযোগে তাদের অধিকারের দাবি তুলবেন। এরপর ১৯১১ সালের সেই ভয়াবহ ট্রায়াঙ্গেল ফায়ার ট্র্যাজেডি, যেখানে ১৪০ জনের বেশি নারী শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম আইন বদলে দিতে বাধ্য করেছিল। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে রাশিয়ার নারীদের সেই ঐতিহাসিক ধর্মঘট যা জার শাসনের পতন ত্বরান্বিত করেছিল এবং চারদিন পর তারা ভোটাধিকার অর্জন করেছিল, সেটিই ছিল গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৮ মার্চ। এই ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে অধিকার কখনও এমনি এমনি আসে না, তা অর্জন করে নিতে হয় নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। শত বছর আগের সেই লড়াইয়ের তেজ আজও আমাদের প্রেরণা জোগায়, বিশেষ করে যখন আমরা দেখি ডিজিটাল যুগেও নারীর অধিকার হরণের নতুন নতুন কৌশল তৈরি হচ্ছে। সমাজ বিকাশের প্রতিটি স্তরে নারীর এই আত্মত্যাগ আজ বিশ্বসভ্যতার ভিত্তিমূল হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ যখন আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়, তখন থেকেই এটি বিশ্বশান্তি এবং উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। ২০০০ সালের দিকে যখন মনে হচ্ছিল নারীবাদ তার চিরাচরিত জৌলুস হারাচ্ছে, ঠিক তখনই ২০০১ সালে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই আন্দোলনকে আবার পুনরুজ্জীবিত করা হয়। বর্তমানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইনগুলো যেভাবে মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, তা ১৯১১ সালের সেই রাজপথের আন্দোলনেরই এক আধুনিক সংস্করণ। আজকের দিনে নারী দিবস মানে কেবল ফুল দেওয়া বা শুভেচ্ছা বিনিময় নয়, বরং এটি হলো নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে আমূল পরিবর্তন আনা এবং সমাজকাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ করা। ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমরা দেখতে পাই যে, সমতার আন্দোলন আর কেবল নারীর একার লড়াই নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক রূপান্তরের ডাক। গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে লিঙ্গ সমতা অর্জনের গতি এখনও বেশ মন্থর। বর্তমান গতিতে চললে পূর্ণ সমতা অর্জনে আরও ১৩৪ বছর লেগে যেতে পারে। এই পরিসংখ্যানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এগোচ্ছি ঠিকই, কিন্তু গন্তব্য এখনও অনেক দূরে। অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সুযোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করাটাই এখন বিশ্বের দেশগুলোর জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর এই যুগে নারীদের নতুন দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকা চলবে না। প্রযুক্তির এই বিপ্লব যেন নারীর জন্য নতুন কোনো বৈষম্যের দেয়াল তৈরি না করে, ২০২৬ সালের এই দিনে সেটিই হওয়া উচিত আমাদের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। বিশ্বজুড়ে নারীরা আজ বিজ্ঞানের গবেষণাগার থেকে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা পর্যন্ত বিচরণ করছেন, কিন্তু একই সঙ্গে তারা গৃহস্থালির অবৈতনিক কাজের এক বিশাল বোঝা ঘাড়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন। এই কাঠামোগত অসঙ্গতি দূর করাই সমতার মহাকাব্যের পরবর্তী অধ্যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে এক রোমাঞ্চকর এবং জটিল উপাখ্যান বেরিয়ে আসে। গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় লিঙ্গ সমতায় শীর্ষস্থানে রয়েছে এবং বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে অভাবনীয় উন্নতি করে ২৪তম অবস্থানে উঠে এসেছে। এই সাফল্যের প্রধান কারিগর হলো বাংলাদেশের নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দীর্ঘ সময় নারীর নেতৃত্ব এবং স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে, যা অনেক উন্নত দেশের জন্যও ঈর্ষণীয়। তবে এই উজ্জ্বল সাফল্যের মুদ্রার উল্টো পিঠটিও আমাদের অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পরিসংখ্যানের এই ঝকঝকে সংখ্যাগুলো কি সাধারণ গ্রামীণ নারীর জীবনের প্রতিদিনের বাস্তবতাকে প্রতিফলন করে? রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কি প্রকৃত অর্থে নারীর সামাজিক মর্যাদাকে প্রশ্নাতীত করতে পেরেছে? আসুন আমরা সকলে মিলে নারীর অর্জনকে উদযাপন করি এবং তাদের সমঅধিকার নিশ্চিতে একযোগে কাজ করি। ২০২৬ সালের এই বিশেষ দিনে আমাদের বার্তাটি খুব স্পষ্ট—বিনিয়োগ করুন নারীর শিক্ষায়, বিনিয়োগ করুন নারীর স্বাস্থ্যে এবং বিনিয়োগ করুন নারীর মর্যাদায়। কারণ এই বিনিয়োগের বিনিময়ে আমরা যে সমৃদ্ধ পৃথিবী পাব, তা হবে আগামী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার। মনে রাখতে হবে, সমতা কোনো দান নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। আর এই অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে আমাদের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার মানসিক শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। আজকের এই নারী দিবস হোক সেই নতুন যাত্রার শুভ সূচনা। জয় হোক নারীর, জয় হোক মানবতার। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শ্রমবাজারে নারীর উপস্থিতি পুরুষের তুলনায় অনেক কম এবং যারা কর্মরত আছেন তাদের মধ্যেও মজুরি বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। একই কাজের জন্য একজন নারী শ্রমিক আজও পুরুষের তুলনায় কম পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প এবং গ্রামীণ কৃষি খাতে এই বৈষম্য সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। এর পাশাপাশি বাল্যবিবাহ বাংলাদেশের লিঙ্গ সমতার পথে আজও এক বিশাল কাঁটা হিসেবে রয়ে গেছে। যদিও সরকারিভাবে ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তবুও গ্রামীণ এবং দুর্গম এলাকাগুলোতে আজও কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বাল্যবিবাহ কেবল একটি মেয়ের শিক্ষা জীবন ধ্বংস করে না, বরং তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথকেও চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়। এই ব্যাধি দূর করতে কেবল আইনের কড়াকড়ি নয়, বরং সামাজিক সচেতনতার এক বিশাল জোয়ার প্রয়োজন। সাফল্যের পাশাপাশি বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার বাড়লেও উচ্চশিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ এখনও সন্তোষজনক নয়। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত বা স্টেম শিক্ষায় মেয়েদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আরও বড় ধরণের বিনিয়োগ প্রয়োজন। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা দেখি যে বাংলাদেশের নারীরা এভারেস্ট জয় করেছেন, হিমালয় জয় করেছেন, এমনকি তারা এখন ড্রোন চালাচ্ছেন বা মহাকাশ গবেষণায় যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ নারীদের জীবন আজও সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং নিরাপত্তার অভাবের কারণে সংকুচিত। গণপরিবহন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাইবার অপরাধের এই যুগে নারীরা ইন্টারনেটেও নানা ধরণের হেনস্থার শিকার হচ্ছেন, যা তাদের সৃজনশীলতা এবং মুক্ত চিন্তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই ডিজিটাল ডিভাইড বা প্রযুক্তিতে নারীর প্রবেশাধিকারের বৈষম্য যদি আমরা এখনই দূর করতে না পারি, তবে আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়বার স্বপ্নটি অধরাই থেকে যাবে। অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলতে গেলে আমাদের নারীর অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশের জিডিপিতে নারীর এই অদৃশ্য শ্রমের কোনো মূল্যায়ন নেই। অথচ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একজন নারী পরিবারের জন্য যে পরিশ্রম করেন, তার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করলে জাতীয় আয় বহুগুণ বেড়ে যেত। ২০২৬ সালের সমতা কর্মসূচির একটি বড় অংশ হওয়া উচিত নারীর এই শ্রমের স্বীকৃতি প্রদান এবং পারিবারিক কাজে পুরুষের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা। সমতা মানে এই নয় যে পুরুষকে ছোট করা, বরং সমতা মানে হলো সুযোগের সুষম বণ্টন যেখানে লিঙ্গ কোনো প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করবে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং শৈশবের লালন-পালনে লিঙ্গ সংবেদনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একটি ছেলে শিশু যেন ছোটবেলা থেকেই শেখে যে ঘরের কাজ করা বা নারীকে শ্রদ্ধা করা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি এক উন্নত চরিত্রের লক্ষণ। এ বছরের ‘গিভ টু গেইন’ ক্যাম্পেইন আমাদের শেখায় যে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব। পুরুষদের এই আন্দোলনে সক্রিয় মিত্র হিসেবে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। ২০২৬ সালের নারী দিবসে আমাদের শপথ হওয়া উচিত প্রতিটি স্তরে নারীর মেধা ও শ্রমের স্বীকৃতি দেওয়া। সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইন থেকে শুরু করে পারিবারিক আইনের সংস্কার পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যখন আমরা নারীকে সম্পদে প্রবেশাধিকার দেব, তখন বিনিময়ে পুরো দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে। উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ থেকে বঞ্চিত হওয়া একজন নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সবসময়ই অন্যের মর্জির ওপর নির্ভরশীল থাকে। এই আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া নারীর প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। ২০২৬ সালের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের উচিত সেই বৈষম্যের দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলার জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ১১৫তম বার্ষিকীতে আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, তা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং নারী। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নারীরা সবচেয়ে বেশি বিপন্ন অবস্থায় থাকেন। তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক জীবন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পরিবেশ রক্ষায় এবং টেকসই উন্নয়নে নারীর সহজাত দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে। গ্রাম বাংলার নারী চিরকালই বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে কৃষি কাজে নিভৃতে অবদান রেখে আসছেন। তাদের এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সমন্বয় করে আমাদের সবুজ অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। সমতার এই লড়াইয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। বিজ্ঞাপনে বা নাটকে নারীকে আজও অনেক ক্ষেত্রে পণ্য হিসেবে বা দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই ধরনের নেতিবাচক চিত্রায়ন নারীর আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং সমাজে ভুল বার্তা পাঠায়। ২০২৬ সালের আধুনিক বাংলাদেশে আমাদের উচিত হবে শক্তিশালী, আত্মনির্ভরশীল এবং মেধাবী নারী চরিত্রগুলোকে বেশি করে তুলে ধরা। মিডিয়া যখন নারীর সাফল্যের গল্প প্রচার করবে, তখন তা লক্ষ লক্ষ কিশোরীর মনে বড় হওয়ার স্বপ্ন বুনবে। প্রতিটি নারীই একেকজন যোদ্ধা, তারা প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে চলেছেন। সেই সংগ্রামের স্বীকৃতি দেওয়াই হলো গণমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্ব। পত্রিকাগুলোতে যখন নিয়মিত কলাম বা নিবন্ধের মাধ্যমে সমতার কথা বলা হয়, তখন তা নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছায় এবং সমাজে পরিবর্তনের সূচনা করে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা এবং এনজিওগুলোর কার্যক্রম গ্রামীণ নারীর জীবনে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখছি সেই বিপ্লব আরও পরিপক্ক হয়েছে। এখন নারীরা কেবল ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহক নন, তারা বড় বড় ব্যবসার উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন। ই-কমার্সের জয়জয়কার বাংলাদেশের গৃহিণী ও তরুণীদের নতুন দিশা দিয়েছে। ফেসবুক বা অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে হাজার হাজার নারী আজ ঘরে বসেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ডিজিটাল কমার্স বা ডি-কমার্সে নারীর এই সাফল্য প্রমাণ করে যে সুযোগ পেলে বাংলাদেশের নারী বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সাথে পাল্লা দিতে পারে। এই ই-কমার্স খাতের সুরক্ষা এবং এর প্রসারে সরকারি প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। এতে করে দেশের বেকারত্ব সমস্যা কমবে এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া নারীর উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না। ২০২৬ সালের সমতা কর্মসূচির অন্যতম স্তম্ভ হওয়া উচিত কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি কার্যকর যৌন হয়রানি বিরোধী সেল থাকতে হবে যেখানে নারীরা নির্ভয়ে অভিযোগ করতে পারেন। এর পাশাপাশি অফিসগুলোতে দিবাযত্ন কেন্দ্র বা ডে-কেয়ার সেন্টারের সুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সন্তান লালন-পালনের ভয়ে অনেক প্রতিভাবান নারী তাদের কর্মজীবন মাঝপথেই ইতি টানতে বাধ্য হন। রাষ্ট্র এবং বেসরকারি খাত যদি সম্মিলিতভাবে ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলে, তবে নারীরা তাদের কর্মজীবনে নিরবচ্ছিন্নভাবে মনোযোগ দিতে পারবেন। এটি কেবল নারীর ওপর করুণা নয়, বরং কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। সমতার সুফল সমাজ তখনই ভোগ করবে যখন একজন নারী মা হওয়া এবং সফল ক্যারিয়ারের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হবেন না। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের অর্জনকে আরও সংহত করতে হবে। ঝরে পড়া ছাত্রীদের পুনরায় মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে বিশেষ প্রকল্প প্রয়োজন। ২০২৬ সালের বাংলাদেশে শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার প্রতি জোর দিতে হবে। নারী যখন কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় নয়, বরং হাতে-কলমে কাজে দক্ষ হবে, তখনই তার বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাবে। ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিংয়ের মতো ক্ষেত্রগুলোতে গ্রামীণ নারীদের সম্পৃক্ত করতে পারলে শহর ও গ্রামের বৈষম্য ঘুচে যাবে। ইন্টারনেটের উচ্চগতি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা তৃণমূল পর্যায়ে নিশ্চিত করা গেলে নারীরা ঘরে বসেই বিশ্ববাজারের সাথে যুক্ত হতে পারবে। এটিই হবে ‘গিভ টু গেইন’ প্রতিপাদ্যের সার্থক রূপায়ন। পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ১১৫ বছরের এই মহাকাব্য আমাদের সাহসের গল্প শোনায়। বাংলাদেশ আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তা কয়েক দশকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল। আমাদের গৌরব করার মতো অনেক অর্জন আছে—আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাজনীতিতে অভাবনীয় উন্নতি করেছি। তবে আমাদের আত্মতুষ্টিতে ভোগার অবকাশ নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত দেশের শেষ প্রান্তের মেয়েটিও নিজের ইচ্ছামতো পড়াশোনা করতে পারছে না বা কর্মক্ষেত্রে যেতে ভয় পাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই লড়াই চলবে। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমাদের অঙ্গীকার হোক একটি বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়ার, যেখানে নারী-পুরুষের পরিচয় ছাপিয়ে মানবিক পরিচয়টিই মুখ্য হবে। ১১৫ বছরের এই ঐতিহ্য আমাদের জন্য কেবল গৌরব নয়, এটি এক বিশাল দায়িত্বও বটে। আসুন আমরা সকলে মিলে নারীর অর্জনকে উদযাপন করি এবং তাদের সমঅধিকার নিশ্চিতে একযোগে কাজ করি। ২০২৬ সালের এই বিশেষ দিনে আমাদের বার্তাটি খুব স্পষ্ট—বিনিয়োগ করুন নারীর শিক্ষায়, বিনিয়োগ করুন নারীর স্বাস্থ্যে এবং বিনিয়োগ করুন নারীর মর্যাদায়। কারণ এই বিনিয়োগের বিনিময়ে আমরা যে সমৃদ্ধ পৃথিবী পাব, তা হবে আগামী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার। মনে রাখতে হবে, সমতা কোনো দান নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। আর এই অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে আমাদের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার মানসিক শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। আজকের এই নারী দিবস হোক সেই নতুন যাত্রার শুভ সূচনা। জয় হোক নারীর, জয় হোক মানবতার। লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী। এইচআর/জেআইএম

Share this post: