দেশে একক শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ
2026-03-16 - 13:53
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, দেশে একক কারিকুলাম (শিক্ষাক্রম) চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে মাদরাসার ইবতেদায়ি স্তরকে প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ভাতা, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সোমবার (১৬ মার্চ) ‘নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে আগামী দিনের শিক্ষা খাত: নতুন চিন্তা, নতুন কাঠামো ও নতুন পদক্ষেপ’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠান হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা কমিটিতে যুক্তদের যোগ্যতা নিয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন আলোচনা প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘এখনো কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। আমরা চাই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়ার আগে সেটি যেন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং সবার সঙ্গে আলোচনা করেই নেওয়া হয়।’ ‘দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় আইন বা নীতিমালা করতে হবে। কোনো আইভরি টাওয়ারে বসে ১৮ কোটি মানুষের দেশের জন্য আইন করা সম্ভব নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি ইউনিয়নে কী ধরনের মানুষ আছেন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কী, এসব বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হব,’ বলেন প্রতিমন্ত্রী। ব্যবস্থাপনা কমিটিতে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অনেক এলাকায় সমাজের প্রভাবশালী বা মুরুব্বিরা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত থাকেন। তাই সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত কাউকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বাস্তবতায় কঠিন হতে পারে। তবে এখনো কোনো নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেই তা নির্ধারণ করা হবে। তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা নীতিমালা প্রয়োজন হবে। কারণ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে আবার এমপিওভুক্ত ও অ-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মিড-ডে মিল প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের ১৪৯টি উপজেলায় মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালু রয়েছে। ভবিষ্যতে এটি সব উপজেলা ও পৌরসভায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। পরে দেশের প্রতিটি স্কুলে চালু করার লক্ষ্য আছে। মিড-ডে মিল কর্মসূচিতে দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে দুর্নীতি ও রাজনীতিকরণ অনেক জায়গায় রয়েছে। তবে এ সমস্যাগুলো মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে।’ শিক্ষায় নতুন আঙ্গিক ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষা খাতে নতুন আঙ্গিকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ভাষা, গণিত, যোগাযোগ দক্ষতা ও নাগরিক শিক্ষা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে ভালো ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা। তিনি জানান, দেশে একক কারিকুলাম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে মাদরাসা শিক্ষার ইবতেদায়ি স্তরকে প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ভাতা, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী- কারিকুলাম, ক্লাসরুম ও ধারাবাহিকতা। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে শিক্ষার অংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলায় ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের অধীনে কোচরা কাজ করবেন, যাতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অন্তত ছয় ধরনের খেলাধুলার প্রশিক্ষণ পাওয়া যায়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী দশ বছরে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যেন অলিম্পিকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারে, সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করা হচ্ছে। একইভাবে প্রতিটি স্কুলে নাচ, গান ও নাটকের মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমেছে ছেলেদের ভর্তি সংলাপে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তি নিশ্চিত হলেও শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তার উপস্থাপনায় বলা হয়, প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলেদের ভর্তি হার একসময় প্রায় ৯৮ শতাংশে পৌঁছালেও ২০২৪ সালে তা কমে প্রায় ৯১ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণের হারও সন্তোষজনক নয়। তিনি আরও জানান, দারিদ্র্য ও সামাজিক ঝুঁকির কারণে অনেক শিশু অল্প বয়সেই উপার্জনের কাজে যুক্ত হচ্ছে। দেশে শিশুশ্রমের হার ২০১৯ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ৯ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। লটারিব্যবস্থা যাচাইয়ের আহ্বান অনুষ্ঠানে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তিতে চালু থাকা লটারিব্যবস্থার বাস্তবতা যাচাইয়ের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গ্রামীণ এলাকায় সাধারণত লটারির প্রয়োজন হয় না, এটি মূলত শহরের নামী স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তিনি প্রস্তাব দেন, লটারি ও মেধার সমন্বয়ে একটি মিশ্র ভর্তিব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি। রাশেদা কে চৌধূরী আরও বলেন, সব অঞ্চলের জন্য একই ধরনের স্কুল ক্যালেন্ডার কার্যকর নাও হতে পারে। স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় আঞ্চলিকভাবে ছুটির ক্যালেন্ডার নির্ধারণের সুযোগ থাকা উচিত। তিনি শিক্ষা খাতকে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রাখার আহ্বান জানান এবং বলেন, শিক্ষা রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হতে পারে, তবে তা কোনো দলের এজেন্ডায় পরিণত হওয়া উচিত নয়। সংলাপটি সঞ্চালনা ও সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এতে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানসহ বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারক এতে অংশ নেন। এসএম/একিউএফ