লঞ্চযাত্রার আগে তড়িঘড়ি ইফতার
2026-03-18 - 10:32
রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাট। চারদিকে লঞ্চের ভেঁপু, কুলি-মজুরদের হাঁকডাক আর নদীপথে ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের স্রোত। এর মাঝেই পবিত্র রমজানের বিকেলে সদরঘাট অভিমুখী রাস্তাগুলো এক ভিন্ন সাজে সেজেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে সদরঘাটের দিকে এগোতেই রাস্তার দুই পাশে চোখে পড়ে নানা ইফতারি পণ্যের পসরা। ভাজা পোড়া আর ভারি খাবারের ছোট ছোট অস্থায়ী দোকান। সদরঘাটের প্রধান সড়কের পাশে ছোট এক টেবিলের ওপর সাজানো শসা, টমেটো, লেবু, ঝাল কাঁচা মরিচ, আদা আর পুদিনা পাতা। পাশেই রাখা বিশাল এক বস্তা মুড়ি আর এক ঢালা খাঁটি প্রাণের সরিষা তেল। বিক্রেতা সোলায়মান মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ইফতারের সময় হাতে খুব কম থাকে। বিশেষ করে যারা লঞ্চের যাত্রী, তারা দ্রুত কিছু একটা খুঁজে। আমি এই সব আইটেম এক জায়গায় রাখছি যেন মানুষ সহজেই ইফতারের জন্য স্বাস্থ্যকর সালাদ তৈরি করে নিতে পারে। এটা মূলত মৌসুমি ব্যবসা, কিন্তু মানুষের সাড়ায় আমি আনন্দিত। বুধবার (১৮ মার্চ) বিকেলে সদরঘাট যাওয়ার পথে দেখা যায় ইফতারের ভিন্ন রূপ। এখানে চপ, বেগুনি, আলুর চপ আর পেঁয়াজুর আধিক্য বেশি। বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি এবং মৌসুমি ফলের পসরা সাজিয়ে বসেছেন অনেক বিক্রেতারা। ফলের দোকানের ভিড় ঠেলে সাধারণ মানুষকে আপেল, আঙ্গুর, খেজুর, তরমুজ আর কলার স্তূপ থেকে সেরাটি বেছে নিতেও দেখা যায়। মৌসুমি ফল বিক্রেতা রহিম শেখ বলেন, ইফতারে ফল ছাড়া চলেই না। ঘাট এলাকার যাত্রী-ব্যবসায়ী আর সাধারণ পথচারীরাই আমার মূল কাস্টমার। ঢাকায় গরম বেশি হওয়ায় ফলের চাহিদা অন্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। সদরঘাটে আসা যাত্রীদের বড় অংশই দূরপাল্লার। কেউ ভোলা, কেউ বরিশাল কিংবা পটুয়াখালীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। লঞ্চ ছাড়ার আগ মুহূর্তে ইফতারি কেনা তাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। যাত্রী আমিনুল হক বলেন, বাড়ি যাচ্ছি, পথে ইফতার করতে হবে। হোটেলের ভারি খাবারের চেয়ে মুড়ি, সোলা আর সালাদ দিয়েই ইফতার করাটা স্বস্তির। সব উপকরণ এক জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে বলেই এখান থেকে কিনে নিলাম। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও এই ইফতার উপাদানগুলোর প্রধান ক্রেতা। দোকান ফেলে দূরে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে ফুটপাতের এই খাবার তাদের প্রথম পছন্দ। রাস্তার পাশের দোকান ছাড়িয়ে একটু বড় হোটেলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় শাহী ইফতারের সমারোহ। বড় ডেকচিতে করে বিক্রি হচ্ছে হালিম, আর শিক কাবাবের ধোঁয়া ওড়া সুঘ্রাণ ম ম করছে বাতাসে। চিকেন রোস্ট, কাচ্ছি বিরিয়ানি, খিচুড়ি আর গরুর চাপ কেনায় ব্যস্ত মানুষও। তামান্না হোটেল মালিক আসলাম হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের এখানে শাহী হালিম আর ফালুদা খুব চলে। ইফতারের ১ ঘণ্টা আগে থেকেই মানুষ এসে খোঁজে। বিশেষ করে পরিবারের জন্য মানুষ এখান থেকে বিরিয়ানি আর কাবাব পার্সেল করে নিয়ে যায়। এছাড়া তৃষ্ণা মেটাতে লাচ্ছি এবং বিভিন্ন ফলের তাজা জুস বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। ইফতারের এই কর্মযজ্ঞ নিয়ে বিক্রেতা ও ক্রেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। জগন্নাথ বরিশালগামী যাত্রী সায়েম ইকবাল বলেন, দাম কিছুটা বাড়লেও কম-বেশি সব আইটেম পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে একজন নারী ক্রেতা সুলতানা পারভীন বলেন, পরিবেশ কিছুটা ঘিঞ্জি হলেও সদরঘাটের ইফতারের মধ্যে একটা প্রাণ আছে। এখানে টাটকা সালাদ থেকে শুরু করে হালিম-বিরিয়ানি, সবই হাত বাড়ালে পাওয়া যায়। প্রতিবার রমজানে বাড়ি ফেরার পথে আমরা ঘাট থেকেই খাবার সংগ্রহ করি। বিক্রেতারাও এই সময়টাকে কাজে লাগিয়েছেন। অল্প পুঁজিতে এই ব্যবসা যেমন সেবামূলক, তেমনি লাভজনক। তবে রাস্তার ওপর দোকান হওয়ায় যানজটের ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। ট্রাফিক পুলিশদের হিমশিম খেতে হচ্ছে মানুষের ভিড় সামলাতে। স্থানীয় ব্যবসায়ী হাজী ইমরান আলী জাগো নিউজকে বলেন, লঞ্চের যাত্রী থেকে শুরু করে কুলি, ব্যবসায়ী এবং ছাত্র সবার গন্তব্য এখন একই। দিনশেষে আজান হওয়ার পর যখন সবাই মিলে রাস্তার ধারেই কিংবা লঞ্চের ডেকে ইফতার করতে বসেন, তখন ছোট হয়ে আসে সামাজিক ভেদাভেদ। সতেজ সালাদ, এক মুঠো মুড়ি আর এক গ্লাস শরবত দিয়েই যেন খুঁজে পাওয়া যায় অন্যরকম স্বাদ। এমডিএএ/এমআরএম