TheBangladeshTime

রোজায় নারীর শরীর ও মাতৃত্ব, যা বলছেন বিশেষজ্ঞ

2026-03-03 - 03:43

রমজানে রোজা পালন মুসলিম নারীদের জন্য যেমন আত্মিক প্রশান্তির সময়, তেমনি শারীরিকভাবে এটি একটি বিশেষ শারীরবৃত্তীয় চ্যালেঞ্জও বটে। কিশোরী থেকে শুরু করে গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা কিংবা ক্যানসার চিকিৎসাধীন রোগী প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক সিদ্ধান্ত। নারীস্বাস্থ্য নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের গাইনি স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ এবং গাইনি ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. রুখসানা পারভীন। জাগো নিউজ: রোজায় নারীদের শরীরে কী ধরনের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে? ডা. রুখসানা পারভীন: রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার ফলে শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা কিছুটা কমে যায় এবং শরীর শক্তির জন্য সঞ্চিত গ্লাইকোজেন ও পরে চর্বি ব্যবহার শুরু করে। এতে বিপাকক্রিয়ার ধরন বদলে যায়। ইনসুলিনের মাত্রা কমে এবং গ্লুকাগন ও গ্রোথ হরমোন কিছুটা বাড়ে। এই পরিবর্তন নারী-পুরুষ সবার ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। তবে নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনের স্বাভাবিক ওঠানামা, বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের ভারসাম্য, ঘুমের পরিবর্তন ও খাদ্যাভ্যাসের তারতম্যের কারণে সামান্য প্রভাবিত হতে পারে। জাগো নিউজ: রমজানে নারীদের পানিশূন্যতা রোধে কীভাবে পানি ও তরল গ্রহণ করা উচিত? ডা. রুখসানা পারভীন: ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত অন্তত ২.৫ থেকে ৩ লিটার পানি ধীরে ধীরে পান করা উচিত। একসঙ্গে অনেক পানি না খেয়ে ভাগ করে খাওয়া ভালো। শুধু পানি নয়; ডাবের পানি, লেবু পানি, পাতলা স্যুপ, ফলের রস (চিনি ছাড়া) উপকারী। চা-কফি বেশি খেলে প্রস্রাবের মাধ্যমে পানি বেরিয়ে যায়, তাই সীমিত রাখা উচিত। জাগো নিউজ: যাদের অ্যানিমিয়া আছে, তারা রোজা রাখলে কী সতর্কতা নেবেন? ডা. রুখসানা পারভীন: অ্যানিমিয়া থাকলে আগে হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করা জরুরি। মাত্রা খুব কম হলে রোজা না রাখাই ভালো। রোজা রাখলে সেহরি ও ইফতারে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার (কলিজা, লাল মাংস, পালং শাক, ডাল), ভিটামিন সি (লেবু, কমলা), চিকিৎসকের দেওয়া আয়রন ট্যাবলেট নিয়মিত খাওয়া। মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্ট হলে রোজা ভেঙে চিকিৎসা নিতে হবে। ছবি: কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের গাইনি স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ এবং গাইনি ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. রুখসানা পারভীন জাগো নিউজ: কিশোরীদের প্রথম দিকের মাসিক অনিয়ম থাকলে রোজা রাখা নিরাপদ কি না? ডা. রুখসানা পারভীন: প্রথম ২–৩ বছর মাসিক অনিয়ম স্বাভাবিক। তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, তীব্র পেটব্যথা বা রক্তশূন্যতা থাকলে রোজা রাখা কষ্টকর হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরিবার ও চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ। জাগো নিউজ: মাসিক চলাকালে খাদ্যতালিকায় কী ধরনের পুষ্টি যুক্ত করা জরুরি? ডা. রুখসানা পারভীন: মাসিকের সময় আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও প্রোটিন দরকার। যেমন- সবুজ শাকসবজি, ডিম, মাছ, বাদাম, দুধ খাওয়া উচিত। এ সময় অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড বা অতিরিক্ত লবণ এড়িয়ে চলা ভালো। জাগো নিউজ: পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) থাকা কিশোরীরা রমজানে কীভাবে খাদ্যনিয়ন্ত্রণ করবেন? ডা. রুখসানা পারভীন: পিসিওএসে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকে। তাই ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। কম গ্লাইসেমিক সূচকের খাবার (যেমন- পূর্ণ শস্য, প্রোটিন, পর্যাপ্ত শাকসবজি) খাওয়া উচিত। সেহরিতে সাদা ভাতের বদলে আটার রুটি বা ওটস উপকারী। জাগো নিউজ: গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা কতটা নিরাপদ? কোন পরিস্থিতিতে রোজা না রাখাই ভালো? ডা. রুখসানা পারভীন: গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন। যদি মা সুস্থ থাকেন, রক্তচাপ ও সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে, শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক হয় তাহলে অনেকেই নিরাপদে রোজা রাখতে পারেন। তবে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, রক্তস্বল্পতা, বাচ্চার বৃদ্ধি কমে যাওয়া এসব থাকলে রোজা না রাখাই ভালো। জাগো নিউজ: গর্ভের শিশুর ওপর দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার কোনো প্রভাব পড়ে কি? ডা. রুখসানা পারভীন: স্বল্পমেয়াদে সুস্থ মায়ের ক্ষেত্রে বড় ক্ষতির প্রমাণ নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি বা পানিশূন্যতা শিশুর ওজন ও অ্যামনিয়োটিক ফ্লুইডে প্রভাব ফেলতে পারে। জাগো নিউজ: গর্ভবতী নারীদের ইফতার ও সেহরিতে কী ধরনের খাবার রাখা উচিত? ডা. রুখসানা পারভীন: ইফতারে রাখেন খেজুর, ফল, স্যুপ, ডাল, মাছ/মুরগি। আর সেহরিতে খেতে পারেন জটিল শর্করা (আটার রুটি), প্রোটিন (ডিম), দুধ, ফল। অতিরিক্ত তেল-ঝাল এড়িয়ে চলা উচিত। জাগো নিউজ: রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্য জটিলতা থাকলে রোজা রাখা নিয়ে কী পরামর্শ দেবেন? ডা. রুখসানা পারভীন: প্রথমেই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। ওষুধের সময় পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। সুগার খুব ওঠানামা করলে রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। জাগো নিউজ: পানিশূন্যতা গর্ভাবস্থায় কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? লক্ষণগুলো কী? ডা. রুখসানা পারভীন: পানিশূন্যতা জরায়ু সংকোচন বাড়াতে পারে। লক্ষণ মুখ শুকিয়ে যাওয়া, প্রস্রাব কম হওয়া, মাথা ঘোরা, পেট শক্ত হয়ে যাওয়া- এমন হলে দ্রুত পানি ও চিকিৎসা নিতে হবে। জাগো নিউজ: সন্তান জন্মের কতদিন পর থেকে মা রোজা রাখতে পারেন? ডা. রুখসানা পারভীন: স্বাভাবিক প্রসবের পর অন্তত ৬ সপ্তাহ বিশ্রাম দরকার। শরীর পুরোপুরি সেরে উঠলে এবং মা সুস্থ থাকলে রোজা রাখা যেতে পারে। ছবি: কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের গাইনি স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ এবং গাইনি ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. রুখসানা পারভীন জাগো নিউজ: বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েরা রোজা রাখলে শিশুর ওপর কোনো প্রভাব পড়ে কি? ডা. রুখসানা পারভীন: সাধারণত দুধের গুণগত মান খুব একটা কমে না। তবে মা যদি যথেষ্ট পানি ও পুষ্টি না নেন, দুধের পরিমাণ কমতে পারে। জাগো নিউজ: রোজার সময় দুধের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে কি? ডা. রুখসানা পারভীন: হ্যাঁ, পর্যাপ্ত তরল ও ক্যালোরি না পেলে দুধ কমতে পারে। তাই ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত খাবার ও পানি জরুরি। জাগো নিউজ: সিজারিয়ান ডেলিভারির পর রোজা রাখার বিষয়ে কী সতর্কতা দরকার? ডা. রুখসানা পারভীন: অস্ত্রোপচারের পর ক্ষত শুকাতে ও শক্তি ফিরে পেতে সময় লাগে। অন্তত ৮ সপ্তাহ পর এবং চিকিৎসকের পরামর্শে রোজা রাখা উচিত। জাগো নিউজ: জরায়ু, ডিম্বাশয় বা স্তন ক্যান্সারের রোগীরা রমজানে কীভাবে নিজেদের যত্ন নেবেন? ডা. রুখসানা পারভীন: ক্যানসার রোগীদের শরীর দুর্বল থাকে। পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও নিয়মিত ওষুধ জরুরি। চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া রোজা রাখা উচিত নয়। জাগো নিউজ: কেমোথেরাপি বা অন্য চিকিৎসা চলাকালে রোজা রাখা কি নিরাপদ? ডা. রুখসানা পারভীন: কেমোথেরাপির সময় বমি, দুর্বলতা, পানিশূন্যতা বেশি হয়। এ সময় রোজা রাখা সাধারণত নিরুৎসাহিত করি। জাগো নিউজ: দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকলে ওষুধের নিয়মে কী পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে? ডা. রুখসানা পারভীন: অনেক ওষুধ দিনে দুই বা তিনবার খেতে হয়। রোজার সময় সময়সূচি বদলাতে হয়। এটি অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে করতে হবে। জাগো নিউজ: রমজানে ঘুমের সময়সূচি বদলে গেলে নারীদের হরমোনে কোনো প্রভাব পড়ে কি? ডা. রুখসানা পারভীন: ঘুম কম হলে কর্টিসল হরমোন বাড়ে, যা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। মাসিক চক্রেও সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। আরও পড়ুন: রোজায় গ্যাস্ট্রিক ও পেটের যত্নে মানুন চিকিৎসকের পরামর্শ জয়েন্টের ব্যথা কি স্বাভাবিক? যা বলছেন চিকিৎসক জীবনযাত্রার ভুলেই বাড়ছে ক্যানসারের ঝুঁকি জাগো নিউজ: মানসিক চাপ ও ক্লান্তি কমাতে নারীরা কী করতে পারেন? ডা. রুখসানা পারভীন: পর্যাপ্ত বিশ্রাম, হালকা ব্যায়াম, ইবাদতের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি, প্রয়োজনীয় পরিবারের সহযোগিতা নেওয়া। জাগো নিউজ: রমজানে নারীদের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যভুলগুলো কী? ডা. রুখসানা পারভীন: ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, পানি কম খাওয়া, ওষুধ বাদ দেওয়া, বিশ্রাম না নেওয়া। জাগো নিউজ: আপনার পক্ষ থেকে নারীস্বাস্থ্য নিয়ে একটি সচেতনতামূলক বার্তা কী থাকবে? ডা. রুখসানা পারভীন: রোজা আত্মশুদ্ধির মাস, আত্মনির্যাতনের নয়। ইসলাম অসুস্থ, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের ছাড় দিয়েছে। তাই নিজের ও সন্তানের সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন। জেএস/

Share this post: