TheBangladeshTime

দুর্গম পাহাড়ে পানির জন্য হাহাকার, কলস ভরতে ঘণ্টা পার

2026-03-22 - 06:11

স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক দুর্গম পাহাড়ি জনপদে আজও পৌঁছায়নি নিরাপদ পানি। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বিষ্ণু কার্বারী পাড়া তারই এক বাস্তব উদাহরণ। যেখানে প্রায় ছয় শতাধিক মানুষের প্রতিদিনের জীবন সংগ্রামের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পানির জন্য লড়াই। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই জনপদের বাসিন্দারা এখনো নির্ভর করে পাহাড়ের ঝিরি-ছড়ার ওপর, আর শুকনো মৌসুম এলেই সেই ভরসাটুকুও হয়ে ওঠে অনিশ্চিত। এই পাড়ায় ব্রিটিশ আমল থেকে বংশ পরম্পরায় বসবাস করছেন ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই পাড়ার ১০৬টি পরিবারের প্রায় ৬ শতাধিক মানুষের একমাত্র ভরসা পাহাড়ের ঝিরি ও ছড়ার পানি। তবে শুকনো মৌসুমে পাহাড়ের ঝিরি-ছড়া শুকিয়ে গেলে চরম পানি সংকটে পড়েন বাসিন্দারা। বিশেষ করে মার্চ থেকে এপ্রিল মাসে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। নিত্য ব্যবহারের পানির জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয় শুধুমাত্র পানি জন্য। বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে তাদের প্রধান সমস্যা পানি। প্রতিদিন দুই-তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয় পানি আনতে, ফলে পরিবারের জন্য আয়বর্ধক কাজে সময় দেওয়া যায় না। শুকনো মৌসুমে প্রায় ১০০ পরিবারের ভরসা একটি কুয়া। যেখানে অল্প অল্প পানি আসে এক কলস আনতেই আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা লাগে। পাড়ায় কোনো টিউবওয়েল না থাকায় ছড়ার পানি পান করতে গিয়ে মানুষ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্তও হচ্ছে। এই পাড়ায় টিউবওয়েল স্থাপনের দাবি জানিয়ে তারা বলেন, প্রতিবছর সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করেও এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান পাননি। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে উপজেলার বিষ্ণু কার্বারি, দিলশান, বাঙালি করুনা পাড়া, উল্টাছড়ি, পাকলা মহাজন পাড়া, নাড়াইছড়ি ও ছাদকছড়াতে টিউবওয়েল নেই। এসব এলাকার মানুষ পাহাড়ের ঝিরি-ছড়া ও প্রাকৃতিক পানির উৎসের প্রতি নির্ভরশীল। পাড়ার বাসিন্দা দজেন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, আমাদের পাড়ার মূল সমস্যা হচ্ছে পানি। দিনের বেশিরভাগ সময় পানি আনতে চলে যায়। পরিবারের কাজে সময় দিতে পারি না। পানির জন্য প্রতিদিন প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা মসয় লাগে। শুকনো মৌসুমে ১০০ পরিবারের ভরসা মাত্র কুয়া। পাহাড়ে পাথর চুঁইয়ে একটু একটু পানি আসে, এক কলস পানির জন্য আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা লেগে যায়। কংবাই ত্রিপুরা বলেন, আমাদের পাড়ায় কোনো টিউবওয়েল না থাকায় ছড়ার পানি খেতে হয়। এতে প্রায় সময় ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েডসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ছোট বাচ্চা ও বৃদ্ধরাও প্রায় সময় অসুস্থ থাকে। কবিতা ত্রিপুরা বলেন, পানি জন্য অনেক কষ্ট হয়, পানির জন্য সংসারের কাজকর্ম করতে পারি না। ছড়ার পানি পান করে বাচ্চারা বেশি অসুস্থ হয়। দেশ স্বাধীন হইছে কত বছর কিন্তু আমরা এখনো পানিটুকুও পাই না। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ভুবন মোহন ত্রিপুরা বলেন, দুর্গম এ পাড়ায় পানির সমস্যা খুবই প্রকট। জেলা পরিষদসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করে কোনো সুরাহা হয়নি। আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, আশা করি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পানির সংকট সমাধানের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের মেকানিক মো. আব্দুল্লাহ খাঁন বলেন, এসব পাড়াগুলো খুবই দুর্গম। বিদ্যুৎ নাই এবং পাহাড় গুলো পাথুরে হওয়ার কারণে টিউবওয়েল স্থাপন করা যাচ্ছে না। তবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে টিউবওয়েল বা রিংওয়েল স্থাপন করা সম্ভব হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিল পারভেজ বলেন, উপজেলার কয়েকটি পাড়ায় সুপেয় পানির সংকট আছে, বিভিন্ন পাড়া থেকে এরই মধ্যে আমার কাছে আবেদন এসেছে। তবে গত বছর কোনো বাজেট না থাকায় তা সমাধান করা সম্ভব হয়নি। এ বছর বাজেট এলে যেসব পাড়ায় পানির সংকট আছে বা টিউবওয়েল নেই সেসব পাড়ায় টিউবওয়েলের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রবীর সুমন/এফএ/জেআইএম

Share this post: