কাপ্তাইয়ে পিলারহীন ঐতিহ্যবাহী বড় মসজিদ
2026-03-08 - 06:14
পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে ৬ দশক ধরে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে পিলারহীন একটি মসজিদ। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানের দাউদ গ্রুপ কর্ণফুলী পেপার মিলসের দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্রমিকদের জন্য নির্মাণ করেন দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি। ১৯৬৭ সালে নির্মিত এ মসজিদ বর্তমানে স্থানীয়দের কাছে বড় মসজিদ নামে পরিচিত। সবুজ পাহাড়ের মনোরম পরিবেশে ১৩ হাজার বর্গফুটের মসজিদটি স্থানীয় মুসল্লিদের যেমন প্রিয়; তেমনই এর বিশেষত্ব নজর কেড়েছে দেশি-বিদেশি পর্যটকদেরও। বর্তমানে স্তম্ভ বা পিলারহীন ভবন নির্মাণের কথা কল্পনা করা যায় না। অথচ কাপ্তাইয়ে ৬ দশক আগে নির্মাণ করা হয়েছে সম্পূর্ণ পিলারহীন মসজিদটি। পাহাড়ি সবুজ প্রকৃতির মাঝে অবস্থিত অপরূপ সুন্দর এ ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। কাপ্তাই বেড়াতে আসা দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটক মসজিদটি দেখতে এখানে ছুটে আসেন। ১৯৬৭ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন দাউদ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আহমেদ দাউদ এইচ কে। ১৩ হাজার বর্গফুট আয়তনের মসজিদটিতে ২ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদটিতে দৃষ্টিনন্দন বাতি আছে প্রায় ৩৮টি। এ ছাড়া তিন পাশে আছে ২৩টি জানালা ও ৯টি দরজা। মসজিদের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব দিক দিয়ে প্রবেশপথ আছে। মসজিদটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, স্তম্ভ না থাকায় মুসল্লিরা যেখানেই দাঁড়ান না কেন, প্রত্যেকেই খতিব কিংবা ইমামকে দেখতে পান। আরও পড়ুন টিলার ওপরে মোগল আমলের বিবিচিনি শাহী মসজিদ মুসলিম ঐতিহ্যের নিদর্শন সুনিপুণ কারুকার্য খচিত মসজিদটি সবার নজর কাড়ে। প্রচণ্ড গরমেও চারদিকের সবুজ ছায়ায় মসজিদের ভেতরটা সব সময় শীতল থাকে। মসজিদের মুয়াজ্জিন মুহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘মসজিদটির একসময় খুব সমাদর ছিল। সময়ের সাথে সাথে কর্ণফুলি পেপার মিলের জৌলসের সাথে মসজিদের গুরুত্ব কমতে শুরু করেছে। তবে এখনো জুমার নামাজে দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মুসল্লি এখানে আসেন। আজ থেকে ১০ বছর আগেও মসজিদে খতিব, ইমাম, সহকারী ইমাম, মুয়াজ্জিন ও দুজন খাদেমসহ মোট ছয়জন জনবল ছিল। এখন তিনজনে এসে ঠেকেছে।’ মসজিদের ইমাম এটিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমি দীর্ঘ ৫০ বছর মসজিদের সাথে যুক্ত আছি। মসজিদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, বিশাল এ মসজিদে কোনো পিলার নেই। এ রকম মসজিদ দেশের অন্য কোথাও আছে কি না আমার জানা নেই। নির্মাণের পর থেকে কাপ্তাই কেপিএম কর্তৃপক্ষ মসজিদের দেখাশোনা করলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে এখন রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারছে না।’ স্থানীয়রা জানান, ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদ নির্মাণে ব্যবহৃত মার্বেল ও টাইলস পশ্চিম পাকিস্তানের করাচী থেকে আনা হয়েছিল। কর্ণফুলী পেপার মিলস একসময় খুবই জমজমাট ছিল। সে সময় শ্রমিকও অনেক ছিল। শ্রমিকদের প্রার্থনার বিষয়টি মাথায় রেখেই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে পেপার মিলের নানাবিধ সমস্যার কারণে শ্রমিকের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। মসজিদটিতে মুসল্লির সংখ্যাও অনেক কমে গেছে। আরও পড়ুন ৬০০ বছরের সাক্ষী মানিকগঞ্জের মাচাইন শাহী মসজিদ কর্ণফুলী পেপার মিলের কর্মকর্তা ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘কর্ণফুলী পেপার মিলস আবাসিক এলাকায় অবস্থিত মসজিদটি শুধু রাঙ্গামাটি নয়, দেশের ঐতিহ্যবাহী পুরোনো মসজিদ। সঠিক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে মসজিদের অবস্থা খুবই নাজুক। আর্থিক সংকটে মসজিদের ছাদ মেরামত, রঙের কাজ এবং ইলেকট্রিক অনেক সংস্কার করা প্রয়োজন। এসবের জন্য উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।’ গণপূর্ত উপ-বিভাগের রাঙ্গামাটি উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জয় বড়ুয়া বলেন, ‘রাঙ্গামাটির মসজিদটি অনেক পুরোনো। মসজিদের চারপাশে পিলার থাকলেও ভেতরের বিশাল অংশজুড়ে পিলার নেই। আপাতদৃষ্টিতে এটি অসম্ভব মনে হলেও এটাই সত্য। লোড বেয়ারিং ওয়াল ও ইনভার্টেড বিম দ্বারা নির্মাণ করায় ভবনটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এ পদ্ধতিতে খুব উন্নতমানের নির্মাণকৌশল ব্যবহার করে ভেতরের অংশে বিম পিলার ছাড়াও ভবন নির্মাণ করা যায়। মসজিদটি তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি সংস্কার করা হলে অনেক বছর টিকে থাকবে।’ এডিকেএ/এসইউ