TheBangladeshTime

রপ্তানি বাজারে স্থবিরতার কারণে দেশের অর্থনীতি বাড়তি চাপে

2026-03-09 - 06:44

উচ্চ সুদের হার, কমে আসা ট্যাক্স-জিডিপির অনুপাত এবং রপ্তানি বাজারে স্থবিরতার কারণে দেশের অর্থনীতি বাড়তি চাপে রয়েছে বলে মনে করছে ব্যবসায়ী মহল। তারা বলছেন, রপ্তানি বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি নীতিগত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। সোমবার (৯ মার্চ) রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে এসব উদ্বেগ তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ। ‘বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজন করা হয়। ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে নীতিমালা হালনাগাদ করা জরুরি বলে মনে করছে ব্যবসায়ী মহল। এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখা, বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। এজন্য বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখা, বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করা এবং রপ্তানিমুখী খাত বহুমুখীকরণে নীতিগত জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসএস) বাস্তবায়ন জরুরি। এর মধ্যে খাতভিত্তিক পরিকল্পনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা তাসকীন আহমেদ বলেন, ২০২৫ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যে ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা অর্জন সম্ভব হয়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ১ শতাংশ। যদিও প্রাথমিকভাবে ঘাটতি ধরা হয়েছিল ২ দশমিক ৫৬ ট্রিলিয়ন টাকা। তিনি আরও বলেন, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এটি রাজস্ব আহরণ সক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক। কর ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ অটোমেশন ও স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা না থাকায় কর আদায়ে বিলম্ব এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। তাই প্রত্যক্ষ করের ওপর গুরুত্ব বাড়িয়ে অনানুষ্ঠানিক ও আন্ডার-রিপোর্টেড খাতগুলোকে করের আওতায় এনে করভিত্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি ই-নিবন্ধন, ই-রিটার্ন, ই-পেমেন্ট, ই-অডিট ও ই-রিফান্ডসহ পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালুর পাশাপাশি ভ্যাট, আয়কর ও কাস্টমস সংযুক্ত একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। উচ্চ সুদে বিনিয়োগে স্থবিরতা বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে নীতিগত সুদহার ১০ শতাংশে স্থির রেখেছে উল্লেখ করে তাসকীন আহমেদ বলেন, এর ফলে সুদের হার বেড়ে ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি হওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রম মন্থর হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে নীতিসুদ ধীরে ধীরে কমানো দরকার। একই সঙ্গে দেশীয় ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। মূল্যস্ফীতির পেছনে কাঠামোগত সমস্যা ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে, যা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৭ দশমিক ১ শতাংশে এলেও খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি রয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। তাসকীন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি কোনো সাময়িক সংকট নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা ও নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলন। বাজারে অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সিন্ডিকেট এবং অতিরিক্ত সরকারি ঋণ গ্রহণ এর অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, বাজার নজরদারি জোরদার করতে হবে এবং মজুতবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। পাশাপাশি সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা জরুরি। বেসরকারি বিনিয়োগে ধস তাসকীন আহমেদ বলেন, একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণ হলো বিনিয়োগ। কিন্তু ২০২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে ঋণপত্র খোলা ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও কমে গেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মনোভাব কাজ করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেন ডিসিসিআই সভাপতি। রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের তাগিদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে উল্লেখ করেন তাসকীন আহমেদ। একই সময়ে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। তিনি বলেন, ঐতিহ্যগত বাজারের বাইরে নতুন বাজার সম্প্রসারণের জন্য কৌশলগত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায় পণ্য ও বাজারভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর আহ্বান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কৃষি খাতের জিডিপিতে অবদান কমে ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানান তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে মাত্র ৫০ শতাংশ কৃষক যান্ত্রিক চাষাবাদ ব্যবহার করছেন, যেখানে ভারতে এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, টার্গেটেড ভর্তুকি ও জামানতবিহীন স্বল্পসুদের ঋণের মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। পোশাক খাতে নতুন বাজারের প্রয়োজন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি ১৯ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার হলেও আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন, মারকোসুর এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে ম্যানমেড ফাইবারভিত্তিক পণ্যের বাজার বাড়াতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তাসকীন আহমেদ। ইএআর/এএমএ

Share this post: