TheBangladeshTime

ভোটে নারী প্রার্থী ৩.৯৩ শতাংশে নেমে আসা গণতন্ত্রের জন্য সতর্কবার্তা

2026-03-05 - 16:04

দেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি গণতান্ত্রিক অধিকার। অথচ সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে আসা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য এক সতর্কবার্তা। নির্বাচনি ব্যবস্থায় কাঠামোগত বাধা, ক্রমবর্ধমান লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও সাইবার বুলিং নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে রুদ্ধ করছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত বিশেষ সংলাপ ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এসময় নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে কেবল সুযোগ নয়; তাদের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনীতির মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর জোরালো দাবি জানানো হয় দেশের নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি। বক্তারা বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের সব স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এখন কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক অপরিহার্যতা। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও দৈনিক প্রথম আলোর যৌথ আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নারী প্রার্থীদের সম্মাননা জানানো হয়। নারী দিবসের এবারের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য ‘গিভ টু গেইন’ (পারস্পরিক সংহতি ও নেতৃত্বে বিনিয়োগ) এবং জাতীয় প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নাট্য সংগঠন ‘পালাকার’-এর পরিবেশনায় ইন্টারেক্টিভ ফোরাম থিয়েটার ‘চেনা পরবাস’। এতে অভিনয়ের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের প্রতিকূলতার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। নাটকটির প্রতিটি দৃশ্য শেষে উপস্থিত নারী অধিকার কর্মী, বিশেষজ্ঞ, নারী প্রার্থী ও নীতিনির্ধারকরা সরাসরি সংলাপে অংশ নেন, যা কেবল সমস্যার চিত্রায়ন নয় বরং সমাধানের পথনকশা তৈরিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ সংলাপে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘ভোটার হিসেবে নারী গুরুত্বপূর্ণ হলে নেতৃত্বে তাদের সমস্যা কোথায়? আমরা নারীকে এখনো যোগ্য মর্যাদার আসনে বসাতে পারিনি। দেশের জন্ম হয়েছিল সমতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে, কিন্তু নারী সেই অধিকার থেকে ছিটকে পড়ছে। আমরা চাই জনগণের প্রতিনিধি হয়ে নারী ও পুরুষ উভয়ই যেন নারীর অধিকারের কথা বলেন।’ দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান জানান, এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীদের পাশে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের আরও শক্তভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল। আগামী নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ ও সরব উপস্থিতি আরও ব্যাপকভাবে বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘সামনের দিনে আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে নারীর নেতৃত্ব শক্তিশালীকরণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবো।’ অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘নারী প্রার্থীরাই এদেশের সবচেয়ে সাহসী মানুষ। জয়ের সংখ্যার চেয়েও বড় বিষয় হলো এই নারীরা প্রতিকূল পরিবেশের মাঝেও একটি নতুন পথ তৈরি করেছেন। তবে আমরা শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি দেখতে চাই না, একটি প্রভাবশালী পরিবর্তন চাই। নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’ সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘যেখানে আমাদের অস্তিত্বের সংকট সেখানে কেবল ভালো মেয়ের ইমেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পরাজয়ের নামান্তর। রাষ্ট্র ও সমাজ বদলাবে, কিন্তু তার আগে পরিবারের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যাতে কোনো নারী নিজ ঘরে বৈষম্যের শিকার না হন। আমরা শক্তিশালী নারীকে কন্যা বা বোন হিসেবে দেখতে চাই, কিন্তু সহযোদ্ধা হিসেবে নয় - এই চিন্তাধারা বদলাতে হবে।’ স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অনুপস্থিতির কাঠামোগত কারণগুলো তুলে ধরে জানান, অনেক রাজনৈতিক দল নারীদের কেবল প্রতীকী হিসেবে ব্যবহার করে। তৃণমূল পর্যায়ে নারী কর্মীরা সক্রিয় থাকলেও মনোনয়নের সময় পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো আবার পুরুষদেরই বেছে নেয়। এছাড়া সংরক্ষিত আসনের নারীরা সরাসরি নির্বাচিত না হওয়ায় তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা খর্ব হয় এবং দায়বদ্ধতাও জনগণের চেয়ে দলের প্রতি বেশি থাকে। তিনি উল্লেখ করেন, অনলাইন হেনস্তা বা সাইবার বুলিং দেখে অনেক তরুণী রাজনীতিতে আসার সাহস হারাচ্ছেন। তাই একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। সংসদ সদস্য নায়াব ইউসুফ আহমেদ বলেন, ‘প্রান্তিক নারীরা যে মৌলিক ও ন্যায্য অধিকার পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, সেটা বোঝার অবস্থা তাদের নেই। তাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের ঘরকুনো করে রাখার চেষ্টা করা হয়। নারীদের সমস্যা নিরসনে আমাদেরই দাঁড়াতে হবে।’ জাতীয় পার্টির প্রার্থী (ঝিনাইদহ) মনিকা আলম বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকা বা না থাকা বড় কথা নয়, নারীর উন্নয়ন ও সহিংসতা রোধে রাজনৈতিক কর্মীদের সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে বাল্যবিবাহ ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’ বাসদ (মার্কসবাদী) নেত্রী সীমা দত্ত জানান, কৃষি থেকে গার্মেন্টস- সবখানে নারীদের তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা হয়। সমান মজুরি ও শ্রম আইনে অনানুষ্ঠানিক খাতের নারীদের স্বীকৃতির অভাব এবং সংস্কার প্রক্রিয়ায় নারীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। জেপিআই/একিউএফ

Share this post: