ভারতীয়-পাকিস্তানি পোশাকের দাপটে মিরপুরের বেনারসি পল্লিতে বিক্রি কম
2026-03-09 - 08:54
রাজধানীসহ সারাদেশের বিপণিবিতানে চলছে ঈদের কেনাকাটার ধুম। ক্রেতার ভিড়ে কোনো কোনো পোশাকের দোকানে তিল ধারণেরও উপায় নেই। তবে, উল্টো চিত্র রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর বড় মসজিদ সংলগ্ন শাড়ি পল্লি মার্কেটে যা আদি বেনারসি পল্লি মার্কেট হিসেবে পরিচিত। গত শুক্রবার (৬ মার্চ) বিকেলে ঘুরে দেখা যায়, দোকানগুলোতে অলস সময় পার করছেন বিক্রেতারা। কয়েকটি দোকানে দু-একজন ক্রেতা আসছেন, পণ্য দেখছেন, দরদামও করছেন। আশানুরূপ বিক্রি না হওয়ায় হতাশা দেখা গেলো বিক্রেতাদের চোখে-মুখে। বড় মসজিদ সংলগ্ন সড়কের দুই পাশে প্রায় এক যুগ আগে গড়ে উঠেছে অন্তত একশ দোকান। যেখানে মিরপুরের বেনারসি শাড়ি, লেহেঙ্গা, ভারতীয় কাতান, পার্টি শাড়ি, শিফন-জর্জেট শাড়ি, এমব্রয়ডারি শাড়ি খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করা হয়। ভারতীয়-পাকিস্তানি বললেই কিনে নেয় মানুষ হোমা বেনারসি কুঠির মালিক মোস্তাফিজুর রহমান সুমন। তিনি বলেন, ‘এখানে কারচুপি-স্টোনের কাজ, সুতার কাজের শাড়ি বিক্রি হয় বেশি। আমরা ফেব্রিক্স আনি, তারপর সেটায় বিভিন্ন ডিজাইন বসাই। এখান থেকেই বড় বড় শোরুমে শাড়ি যায়। কাজ ভেদে লেহেঙ্গা, শাড়ির পাইকারি দাম ১৩০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।’ তবে, এ ব্যবসায়ীর আক্ষেপ দেশীয় হওয়ায় হাতে তৈরি এসব পণ্যের কদর কম। তিনি বলেন, ‘খালি ভারতীয়-পাকিস্তানি বললেই মানুষ কিনে নেয়। আমাদের শাড়ির মান কোনো অংশেই খারাপ নয়, এটা মনস্তাত্বিক বিষয়। এজন্য আমাদের পোশাক কম চলে। আমরা বড় জায়গায় শোরুম নিতে পারি, প্রচুর লাইটিং করতে পারি। তাতে তো শাড়ির কস্টিং বেড়ে যাবে। বেশি দাম দিয়ে মানুষ দেশি শাড়ি কিনবে কি না, সেটা নিয়েও সন্দেহ আছে।’ জিমিচু কাপড়ের একটি পার্টি শাড়ি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের এখানে পাওয়া যায় ২২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকায়। আর এ ধরনের ভারতীয় শাড়ি মিলবে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায়।’ আয়েশা শাড়িঘরের বিক্রেতা আরমান আলী বলেন, ‘বেচাকেনা একটু কম। এ মার্কেট থেকে পাইকারি ও খুচরা উভয়ই বিক্রি হয়।’ ঈদের আগে বাজার ভালো হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। বাজার ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ দোকানেই ভারতীয় ও পাকিস্তানি পোশাকের আধিক্য। বিক্রেতা বা কারখানা মালিকরা পোশাক বা ফেব্রিক্স আনেন ভারত থেকে। এরপর সেই পোশাকের ওপর নকশা বসিয়ে কারচুপি, পুতি কিংবা স্টোন বসানোর কাজ করা হয়। আরও পড়ুন ঈদে আরামদায়ক পোশাকে থাকছে পরিমিত রঙের ছোঁয়া মৌচাক মার্কেটের অলি-গলিতেও পা ফেলার জায়গা নেই মার্কেটটিতে পাকিস্তানি পোশাকের একাধিক দোকান দেখা যায়। দোকান মালিকরা জানান, ভারতীয় পোশাকের মতোই চাহিদা বাড়ছে পাকিস্তানি পোশাকের। এজন্য পাকিস্তান থেকে আনা বিভিন্ন থ্রিপিস ও ইন্সপায়ারড (পাকিস্তানি ঢং এ তৈরি) পোশাক এখানে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি হচ্ছে। আক্ষেপ দেশীয় মালিক-শ্রমিকদের বিক্রেতা, হস্তশিল্পের শ্রমিক ও কারখানা মালিকরা জানান, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও ভারতীয়-পাকিস্তানি পণ্যের আগ্রাসনে তাদের পণ্যের চাহিদা কমছে। ইমাম হাসান নামের একজন কারখানা মালিক বলেন, মিরপুরে আগে প্রচুর তাঁত শ্রমিক ছিলেন। প্রচুর তাঁতি ছিলেন। এখন তাঁত পণ্যের দাম নেই। এজন্য পেশা বদল করে তাঁতীরা কেউ রিকশাচালক হয়েছেন। কেউ পথে পথে ঘুরছেন। কেউ কারচুপি বা অন্য কাজ করছেন। তাঁত বোর্ড এখানে কোনো সহায়তা করেনি। ভারতীয় পোশাক বন্ধ করলেই আবার তাঁতের পুনর্জাগরণ হবে। আক্ষেপ করে এই কারখানা মালিক বলেন, ‘এখন রেশম ১১ হাজার টাকা কেজি। সেটা পাকাতে আরও ৮-৯ হাজার টাকা খরচ হয়। অথচ শুল্কমুক্ত সুবিধায় অনেকেই অল্পদামে ভারত থেকে রেশম আনে। কিন্তু সেই রেশম প্রান্তিক তাঁতিরা পান না। খোলা বাজারে বিক্রি করে দেয় সিন্ডিকেট। একই অবস্থা কারখানা মালিকদেরও। কাঁচামালের দাম বাড়ছে। শ্রমিকের মূল্যও বাড়ছে। সেই হিসেবে বিক্রি তেমন নেই। অথচ, ভারতে তাঁতিদের সব ধরনের সহযোগিতা করে সরকার। এ কারণে ভারতে তাঁত ভালো করছে। কারখানা মালিক সুমন বলেন, ‘ভারতে ফ্যাক্টরিগুলোকে বিদ্যুৎ ও ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়। অনেক ভর্তুকি দেওয়া হয়। আমরা কিছু পাই না। আমাদের কারচুপি কারখানায় কমার্শিয়াল বিল দিতে হয়। নানা হয়রানি করা হয়। কারখানার নাম শুনলে ভাড়া-বিল বেশি। এজন্য ক্যাম্পের ভেতর বসে বসে শ্রমিক দিয়ে কাজ করাই।’ আরেক কারখানা মালিক বলেন, এখানে সব ফেব্রিক্স ভারতীয় না। আমাদের নিজস্ব কিছু আছে। তবে সেটা সামান্য। কারচুপির পাশাপাশি কম্পিউটার এমব্রয়ডারির কাজ হচ্ছে এখানে। আমাদের কারিগররা ভালো। সুযোগ-সুবিধা পেলে আমাদের পোশাকও ভালো করবে। আর এজন্য ভিনদেশি পোশাক আমদানি বন্ধ করতে হবে। হস্তশিল্প কারচুপি ও হ্যান্ড এমব্রয়ডারি শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মিঠু বলেন, বিদেশি পণ্যের দাপটে আমাদের কাজের চাপ কিছুটা কমেছে। এ পেশার সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার মানুষ। সরকারের উচিত এ খাতে নীতি সহায়তা দেওয়া। আমাদের কাজ নিয়ে বড় বড় ফ্যাশন শো হয়। সবাই অনেক প্রশংসা করে। বিদেশেও আমাদের কাজ যায়। পছন্দের ব্যাপারে ক্রেতারা যা বলছেন সেখানে কথা হয় ক্রেতা বাতেন হকের সঙ্গে। তিনি তার মেয়ের জন্য জামা কিনতে এসেছেন। এই ক্রেতা জানান, কারচুপি বা স্টোনের কাজের এই সব জামা অন্যান্য শোরুমে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। আর ১১ নম্বরের এই মার্কেটটিতে এক থেকে দেড় হাজার টাকায় পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ভারতীয় বা পাকিস্তানি বলে এসব জামা বেশি দামে বিক্রি হয়। অথচ, অনেক ক্ষেত্রেই এসব জামা দেশে তৈরি। বিদেশি পোশাকের কথা বলে দাম বেশি রাখা হয়। আরও পড়ুন ঈদের কেনাকাটার ধুম, বেশি বিক্রির আশা নিউমার্কেটের দোকানিদের ঈদের কেনাকাটায় জমজমাট রিয়াজউদ্দিন বাজারের তামাকুমন্ডি লেন বিদেশি পোশাকের প্রতি আগ্রহ একদিনে তৈরি হয়নি বলে জানান বিক্রেতারা। তারা জানান, প্রথমে কমদামে পণ্য দিয়ে বাজার ধরা হয়েছে। দেশি কারিগরদের হাতে তৈরি পণ্যের কদর কমেছে। মিরপুর অরজিনাল ১০ নম্বরের বেনারসি পল্লিতে পাকিস্তানি পোশাক খুঁজছিলেন গৃহিণী সারা হোসেন। তিনি বলেন, ‘দেশীয় পোশাকও পরা হয়। তবে পাকিস্তানি থ্রিপিসগুলো একটু গর্জিয়াস হয়। পার্টি, বিয়েসহ অনেক অনুষ্ঠানে পরা যায়। দেশি পোশাকের সঙ্গে পাকিস্তানি পোশাকের অনেক পার্থক্য। সেটা কাপড়েই হোক কিংবা ডিজাইনে।’ শারমিন নামের আরেক ক্রেতা বলেন, পার্থক্য তো কিছু আছেই। তা না হলে ১০-১৫ হাজার টাকায় পাকিস্তানি পোশাক তো বিক্রি হতো না। বাংলাদেশের অনেক ব্র্যান্ডের দোকানেও এমন দামে পোশাক বিক্রি হয়। আসল কথা হলো পোশাকের কাপড় ও ডিজাইন। ভালো হলে ক্রেতা সেটা বেশি দাম দিয়ে কেনেন। এসএম/এএমএ/এমএমএআর