জাল নিবন্ধন সনদে ২২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ
2026-03-03 - 09:14
জাল নিবন্ধন সনদে ভুয়া নিয়োগপত্রের মাধ্যমে ঝিনাইদহের অন্তত ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সত্যতা পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগের সময়ে তৎকালীন স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় একাধিক প্রভাবশালী নেতার তদবিরে জাল নিবন্ধন সনদে এসব শিক্ষকরা চাকরিতে যোগদান করেন। অভিযোগের সত্যতা উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারাদেশে ৯৭৩টি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় শিক্ষক নিয়োগে জাল নিবন্ধন সনদের তদন্তে নামে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর (ডিআইএ)। তদন্তে ঝিনাইদহের ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভুয়া নিয়োগ, অন্যের জমি দখল করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি ও জাল সনদ দিয়ে চাকরি করার তথ্য মিলেছে। জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের তদন্তে উঠে আসা দুর্নীতির কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও অভিযুক্তদের এবার বিপুল অংকের আর্থিক দণ্ড ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। ফেরত দিতে হবে অর্থ। কেবল অর্থই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া প্রায় ১৭৬ একরের বেশি জমিও পুনরুদ্ধারের তাগিদ দিয়েছে অধিদফতর। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার ডিগ্রি কলেজ, কে ডি এইচ বি ইউ দাখিল মাদরাসা, ইশ্বরবা দাখিল মাদরাসা, আলহাজ্ব আমজাদ আলী ও ফাইজুর রহমান মহিলা কলেজ, দামোদর কারামতিয়া দাখিল মাদ্রাসা, সুন্দরপুর দাখিল মাদরাসা, কোটচাঁদপুরের বিসিবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মহেশপুরের কালুহাটী দাখিল মাদরাসা, গৌরিনাথপুর দাখিল মাদরাসা, ঘোড়শাল হামিদিয়া দাখিল মাদরাসা, বিদ্যাধরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বৈচিতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সামন্তা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জাল নিবন্ধন সনদে চাকরি প্রদান, দুর্নীতি-অনিয়ম ও জমি সংক্রান্ত অনিয়মের তথ্যপ্রমাণ মিলেছে। এছাড়া শৈলকুপার কামান্না বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, পাঁচপাখিয়া সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদরাসা ও ঝিনাইদহ সদর উপজেলার আমেনা খাতুন কলেজ, জিয়ালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দোহাকুলা দাখিল মাদরাসা, নুরনগর সিদ্দিকীয় আলিম মাদরাসা, হরিশংকরপুর জগৎচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও হলিধানী আলিম মাদরাসায় ভুয়া নিয়োগ, অন্যের জমি দখল করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি এবং জাল সনদ দিয়ে চাকরি করার তথ্য মিলেছে। তদন্তে দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও পরিচালনা পর্ষদ যোগসাজশ করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া ভ্যাট ও আইটি (আয়কর) ফাঁকি দেওয়ার মতো গুরুতর আর্থিক অনিয়মও তদন্তে ধরা পড়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপিগুলো ইতোমধ্যে ডি-নথি ও ই-মেইলের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড এবং জাতীয় ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দফতরে পাঠানো হয়েছে। এদিকে ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাল সনদে চাকরি করা ১০ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) চাকরিচ্যুতি, অর্থ ফেরত, অবসর সুবিধা, কল্যাণ ট্রাস্ট বাতিল, ফৌজদারি মামলা এবং নিয়োগে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিল। মাউশির চিহ্নিত জাল সনদধারী ভুয়া শিক্ষকরা হলেন, হরিনাকুন্ডু পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের সহকারী শিক্ষক (শরীরচর্চা) মঈন উদ্দিন, ঝিনাইদহ শিশুকুঞ্জ ফুল অ্যান্ড কলেজ সহকারী শিক্ষক (হিন্দু ধর্ম) তপন কুমার বিশ্বাস। ডেফলবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (শরীরচর্চা) জাহিদুল ইসলাম, বংকিরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (কৃষি) মামুন অর রশিদ, কালিগঞ্জ উপজেলার নলডাঙ্গা ভুষণ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (সমাজ) হাজেরা খাতুন, কোটচাঁদপুর উপজেলার বহরমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (ইসলাম ধর্ম) ড. মাহফুজা খানম, একই স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষক শামীমা আক্তার, সদর উপজেলার বাসুদেবপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুর রহমান, লালন একাডেমী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) রাজিয়া খাতুন ও মহেশপুর উপজেলার গুড়দা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) মোস্তাফিজুর রহমান। এসব বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা শিক্ষা অফিসার লুৎফর রহমান বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনটি আমার দপ্তরে এখনো আসেনি, তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখেছি। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছি। ডিআইএ’র তদন্ত প্রতিবেদন হাতে এলে অ্যাকশান শুরু হবে। তিনি বলেন, জাল সনদে চাকরি করা ১০ জন শিক্ষক উচ্চ আদালতে মামলা করায় তাদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের বিষয়টি ঝুলে আছে। এম শাহাজান/এমএন/এএসএম