TheBangladeshTime

জোড়া শালিক আর স্মৃতির ভায়োলিন

2026-03-08 - 07:04

অথচ লিকলিকে আপাদমস্তক, পাতলা ফ্যাশন, একটু বড় এলোমেলো চুলের হাওয়াই মিঠাইকেই তো আমার বেশ পছন্দ ছিল! প্রতিদিনের অভ্যাসে মফস্বলের সেই পল্লিগ্রাম, দিনে বিশ-পঁচিশবার বিদ্যুতের আসা-যাওয়া, বদরপুর মেলা থেকে কিনে আনা গ্রাম্য রমণীর হাতের কারুকার্যে ফুটিয়ে তোলা হাতপাখা কিংবা বেতের তৈরি পাখার কদর ছিল অভাবনীয়। চার্জ লাইটের নামটা তখন বেশ নতুন, সন্ধ্যার লগ্ন শুরু আর বিদ্যুতের চোর-পুলিশ খেলার মতোই অবশেষে দূরের দোকানঘরগুলো হ্যাজাকের স্নিগ্ধ আলোয় ঝলমল করতো পল্লিগ্রামের সেই স্মৃতির বাগান। সবার ঘরে ঘরে টেলিভিশনও ছিল না। প্রতি শুক্রবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে সংশপ্তক নাটক দেখে কান্নায় চোখ ভাসিয়ে কষ্ট নেওয়া। দুপুর আড়াইটায় শাবানা অভিনীত রজনীগন্ধা কিংবা ববিতা অভিনীত স্বরলিপি সিনেমা দেখার জন্য আগেভাগেই ব্যাটারির ব্যবস্থা করে রাখা। যাতে বিদ্যুৎবিভ্রাটেও সমস্যা না হয়। এমন এমন স্মৃতির খনির আদ্যোপন্ত ছিল টলমলে কৈশোর। সেই যে, অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন প্রথম বয়ঃস্বন্ধিকালের গুমোট গন্ধ মেখে, প্রথম ঠোঁটে লিপস্টিক মেখে স্কুলে পরিতোষ স্যারের কড়া বকুনি, শাস্তি, মাথার মাঝখানে সিঁথি এঁকে লম্বা দুই বেনী! স্কুল ড্রেসের ক্রস ওড়নার মাঝখানে ফেলে রাখা বাড়ন্ত দুগ্ধবৃন্ত ছুঁয়ে পড়া অনুভূতি; সেও এখন স্মৃতিতে পলি জমায়। কুয়াশা জড়ানো বাড়ন্ত সকাল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে গরম হতে থাকে সূর্যের আলিঙ্গনে ধোঁয়া ওড়া স্কুলের মাঠ, বাবার চাকরির সুবাদে জেলা শহর থেকে উপজেলা শহরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রামীণ পরিবেশের খোলা হাওয়ায় বেড়ে ওঠা আমার কৈশোরকাল। সবুজের হাতছানি আর মেঠো জীবন যাপনে একদম সরল সাধারণের সাথে সখ্য গড়ে ওঠে। বংশগত কারণেই মস্তিষ্ক মেধা ধারণে একটু বেশিই সক্ষম ছিল। তখন আমি শ্যামল ছিপছিপে একদম লাজুক একটি মেয়ে। যার বেড়ে ওঠার বয়স আর মেধাবী পরিচয়ের সাথে যুক্ত হতে থাকে এক এক করে অনেক নাম। বন্ধুমহল বড় হতে থাকে। উপস্থিত বক্তৃতায় একবার তাক লাগিয়ে দেওয়া মেয়ে হিসেবে ‘কুড়িতে বুড়ি নয় বিশের আগে বিয়ে নয়’ শিরোনামের পক্ষে বক্তব্য পেশ করে পুরো স্কুলে তথাকথিত বিস্ময় বালিকা হয়ে উঠি। সেই সাথে মুগ্ধ হতে থাকে আমার আশেপাশের বন্ধু-বান্ধব। গোলাপের পাঁপড়ি মাখানো খামহীন খোলা চিঠি টিফিন পিরিয়ডে একটার পর একটা আসতে থাকে। কখনো বেঞ্চের ওপর ছেড়ে যাওয়া বই-খাতার ভেতর, কখনো বান্ধবীদের হাতের মুঠোয়। এতো এতো ডিজাইনের স্কুল ব্যাগ, ওয়াটার বোতল, রং পেন্সিল, আর্ট পেপারের বাহারি ব্যবহার খুব একটা চোখে পড়েনি। ছিল না বললেই চলে। ছয়টি পাঠ্যবই আর কিছু রাফখাতা বুকের ওপর এক হাতে চেপে স্কুলে যাওয়ার চিত্র এখন স্মৃতির ল্যানটিনে চুম্বনের জীবাশ্মের মতো। কী মোহনীয়তা? কখনো কখনো বন্ধুরা জোড়া শালিক দেখে চেঁচিয়ে উঠতো, কেন উঠতো কখনো জানতে চাইনি। তবে এখনো জোড়া শালিক দেখলে মনের ভেতর সুখ অনুভব হয়। কেন হয় জানি না। হয়তো জানি, হয়তো এ জানার মানেটা ছিল অন্যরকম। রোজকার চিঠির বক্স হয়ে ওঠে আমার বইঘর। একদিন একটি চিঠি হৃদয়ের সমস্ত মুগ্ধতা চুরি করে নেয়। চমৎকার দৃষ্টিনন্দন হাতের লেখা আর সাবলীল ভাষায় লেখা চিঠির প্রেমে পড়ে মন উন্মাদ হয়ে গেল। সুন্দর হাতের লেখাই কি তবে সে ভালো লাগার প্রথম কারণ? স্কুল ছুটির পর এক দারুণ চঞ্চল মন নিয়ে ছুটছিলাম বাসার পথে। মাঝপথে দুই যুবক দাঁড়ানো দেখে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। দুজনই বেশ উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে অথচ মুখে কোনো শব্দ নেই। আমার হাত-পা সব হিম হয়ে আসছিল। জানি না কেন ওইটুকু বয়সে এত অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। একজন লাল শার্ট পরা, সুন্দর বেশ স্নিগ্ধ দেখতে। ডলি সায়ন্তনীর ‘লাল শার্ট পড়া যুবক’ গানটি তখন সুপারহিট। আর একজনের গায়ে ছিল আকাশি রঙের শার্ট, একটু বড় চুল, শ্যামবর্ণের মায়াবী চেহারা, চাহনিতে ছিল নিবিড় মাদকতা। দাঁড়ানোর স্টাইলটা ছিল অতি আধুনিক। সেই সময়ের আধুনিকতার সবটুকু ছোঁয়া তার আপাদমস্তকে দৃশ্যমান ছিল। এক পলকের মুগ্ধতা কেড়ে নিল মন-প্রাণ। সেদিনের ফর্সা ছেলেটি আমার ভালো লাগার ছায়াও মাড়াতে পারেনি অথচ শ্যামবর্ণের স্বাস্থ্যহীন ছেলেটি আমার মন কেড়ে নিয়েছিল। তখনো জানতে পারিনি স্কুল থেকে বাড়ির যাত্রা পথে ওই দুই যুবকের এমন উৎসুক আচরণের কী কারণ। রাতে পড়ার টেবিলে বই খুলতেই চোখের সামনে ভেসে এলো গোলাপের পাঁপড়ি মাখা চিঠিটা। একদিকে মা-বাবার শাসনের দৃষ্টি; অন্যদিকে চিঠিপ্রেম। অসম্ভব ভয় আর অন্যরকম দোলাচলে নিমগ্ন ছিল সেই রাত। ওই রাতের প্রেমময় অনুভূতি আজন্মকালের স্মৃতিচিহ্ন আর মোহনীয় কাল হয়ে আছে। ভোর হতেই যেন অপেক্ষা। শুধু ভাবনার এপিঠ-ওপিঠ তেলেভাজা করে রাত কেটে যায়। চিঠির মতোই হবে হয়তো সে, যে এই চিঠিটা লিখেছে! যেমন তার শব্দ চয়ন; তেমনই অপূর্ব হাতের লেখা। ভাবলাম আর একবার পড়ি চিঠিটা... ডিয়ার লাবন্য, হৃদয় এমনই এক অবুঝ, যারে চায় শুধু তাকেই চায়। নাহি মানে কোনো লাজ ভয়। আসলে পৃথিবীর আঙিনায় হাজারো মানুষ বিচিত্র ধরনের মন নিয়ে বাস করে। বিন্দু বিন্দু জলকণার সমন্বয়ে যেমন বিশাল সমুদ্রের সৃৃৃৃৃৃৃষ্টি; তেমনই আবেগ, অনুভূতি, প্রেম, ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের মায়ায় মানুষের জীবনকে সবচেয়ে ব্যাকুল করে তোলে। সৃষ্টির লগ্ন থেকে দেখা যায় মায়ার বন্ধনে পৃথিবীটা আবদ্ধ। আর স্নেহ, প্রেম, ভালোবাসা ও মমতা আছে বলেই মানুষের জীবনে এক উষ্ণ ছোঁয়ার আবেগ ও অনুভূতি কাজ করে। শুধু একটি কথাই মনে রেখ লাবন্য, মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত পথিক যেমন মরীচিকার পেছনে পেছনে ছুটে হয়রান হয়; তেমনই আমিও বন্ধুত্বের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে নিজের মনটাকে হারিয়ে ফেলেছি শুধু একজনের কাছে। সেটা হলে একমাত্র তুমি। জানি না এর গন্তব্য কোথায় গিয়ে শেষ হয়। তবে এতটুকু বলতে পারি তোমার স্বরলিপির মাধুর্য্য থেকে যেন কোনো দিন বঞ্চিত না হই। তুমি তো একটা কথা জানো যে, লাভ ইজ ভ্যালুয়েবল এসেটস্ হয়েন টু মাইন্ড রিলেশান উইথ ওয়ান কাইন্ড। পুরুষের জীবন যখন জটিলতায় পরিপূর্ণ, প্রাণ যখন ক্লান্তিতে জর্জরিত; ঠিক সেই নিঃস্ব অবস্থায় পুরুষ শান্তি খুঁজে পায় নারীর ভালোবাসায়। প্রেয়সী নারী তার প্রেম ও বন্ধুত্বের মায়ার শেকলে তার মনকে সিক্ত করে তোলে। আমার মতো নগণ্য মানুষের জন্য কি তুমি এত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারবে, বলো তো লাবন্য? আমি একটা নগণ্য গরিব, দুঃখী, আমার জীবনটা দুঃখে জর্জরিত। যাক আমার আশা এবং প্রত্যাশা তুমি আমার দুঃখের ভাগ নেবে।পরিশেষে সৃষ্টিকর্তার দরবারে প্রার্থনা করি, তোমার জীবন হোক ধূপের মতো দহনে দহনে দিতে তৃপ্তি, মঙ্গল হোক তোমার ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা। এই আশা ও প্রত্যাশায়... ইতি, তোমার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি ‘ফাহিম’। চিঠি আদান-প্রদানের কাল দীর্ঘ হতে হতে আমাদের প্রেম গড়াতে থাকে, চোখে নেশা ধরার মতোই এক বেলার মাতাল দৃষ্টির অপেক্ষায় কেটে গেছে আমাদের দুজনের নীলাদ্রি প্রহর। সবচেয়ে বিভীষিকাময় ছিল শুক্রবারটি। স্কুল বন্ধ থাকার কারণে ফাহিমকে দেখতে পেতাম না। বাসায় শুক্রবার নিয়ে হৈ হৈ আমেজ থাকলেও আমার বর্ণিল আকাশে মেঘ জমে থাকতো। দেখা হতো না কারও সাথে কারোর, ফাহিমের পাঠানো শেষ চিঠিটা আমার মনের গভীরে সুঁইফোঁড়ের সেলাইয়ের মতো রক্তাক্ত গিঁট বেঁধে আছে। চিঠিটা মন ও মগজে আজও ভেসে আসে অকারণেই। আমার মুক্সোল কলি, হে স্বপ্নের মাধুরী, পৃথিবীর আঙিনায় কোটি কোটি মানুষের প্রেম, প্রীতি, ইতিহাস শুনে সত্যি উল্লসিত মনে তাদের স্বাগত জানাতে ইচ্ছে করে কিন্তু আবার কাঁচের পাত্রের ন্যায় বিলীন হয়ে যায় স্মৃতির পটে আটকে থাকা কথাগুলো। যে আবেগ অতি তাড়াতাড়ি আসে, সে আবেগ বিলীন হতেও অনেক সময় বিলম্ব হয় না। তবে প্রকৃত প্রেম সত্যি যেমন মানব জীবনকে দেয় উৎসর্গ; তেমনই মৃত্যুকেও দেয় মহিমা। আমরা কি পারব সেই সত্যের আদর্শকে রক্ষা করতে? তাছাড়া আমার ভয় হয়, প্রেম ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে অনেকে নিজের ব্যক্তিত্বকে পরিচয় দিতে ভুলে যায়। তখন টেনশন আর ভাবনা ছাড়া আর কোনো সম্বল থাকে না। পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ সমান হয়ে জন্ম নেয় না। যেমন তোমার সমান হয়ে আর কেউ... লাবন্য, তোমার ভাব, ব্যবহার ও চারিত্রিক মাধুর্য সত্যিই আমাকে নিয়ে যায় নিকট থেকে আরও নিকটে। রজনীগন্ধার অনাবিল সৌরভের ছোঁয়া হৃদয় স্পন্দনে জাগরিত হয় বারবার শুধু ওই একটি কারণে সেটা হলো তোমার মধুময় কথা আর ছন্দমাধুর্য চরণগুলো দেখে। একটি নাম, একটি স্মৃতি, একটি মানুষকে কেন্দ্র করেই গঠিত হলো আমার জীবন। আর কী হবে আমার জীবন ইতিহাস শুনে? আমার জীবন ইতিহাস শোনালে হয়তো তোমাকে দুঃখ ছাড়া আর কিছুই উপহার দিতে পারবো না। শুনতে পারবে যখন দুজন থাকবো আরও কাছাকাছি আরও পাশাপাশি। যেখানে থাকবে না কোনো দ্বিধা, থাকবে না কোনো বাধা ও ভয়। লক্ষ্মীটি আমার, প্রতিটি রোজা রাখবে। নামাজ পড়বে। লেখাপড়া চলমানের মতো ধরে রাখবে। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করবে, যেন শেষপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছতে পারি। পরিশেষে উপরওয়ালার নিকট প্রার্থনা করি, তোমার ভবিষ্যৎ হোক চন্দনের মতো ক্ষয়ে ক্ষয়ে দিতে শান্তি। উত্তর পেতে বিলম্ব হলে নিজেকে অপরাধী মনে করবো। ইতি, তোমারই ‘ফাহিম’। এরপর চিঠির জবাব হাতে ফাহিমের সাথে শেষ দেখা, ফাহিম বলেছিল যেখানেই থাকো ভালো থেকো। বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই দেখা হবে। এরপর আর দেখা হয়নি আমাদের। ইউরোপের সেই নিশ্চিন্তে ঘুমানো আইসল্যান্ডবাসী যেমন হঠাৎ উল্কাপিণ্ড ভলকানোর বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, ভুলতে পারেনি সেই চিরস্থায়ী আঘাতের দাগ। তেমনই ভুলতে পারিনি আমার ভেতরের ছোট দ্বীপ হয়ে বেড়ে ওঠা ফাহিম নামক একটা সম্পর্কের নাম। যে দ্বীপে আলো জ্বলে আজও, নেভে না। পিরোজপুরে বাবার বদলি আমাদের জীবনের বাঁকবদল করে দিয়েছিল। ওখানে গিয়ে নতুন পরিবেশ, কলেজ জীবনের নিয়ম শৃঙ্খলা, কলেজের বখাটে ছেলেদের উৎপাত, রাজনীতির গরম হাওয়া, আধুনিকতার ছোঁয়া লেগে মেয়েদের অশালীন চলাফেরা, গায়েগায়ে ঘেঁষে উন্মুক্ত মাঠে ঠোঁটের উষ্ণতার মঞ্চে মদ গেলা; সবকিছুই যেন আমার ভাবনার ঋণাত্মক। নৈবেদ্য প্রেম শিখিয়েছিল আমায় ফাহিম। কখনো হাত ছুঁয়ে না দেখলেও হৃদয় ছুঁয়ে যেত প্রতি মুহূর্তে। বৈরী পরিবেশেও মনের ভেতরের জোড়া শালিক খেলে গেছে আমাকে নিয়ে, আনন্দ দিয়ে গেছে, কাঁদিয়েছে। ভেতরের সুতো আলগা করে কেউ কোনদিন হৃদয়টা ছুঁতে পারেনি যার জন্য; সেই নামটা ফাহিম। পিরোজপুরের কলেজ জীবন শেষ করে ঢাকা মহানগরীতে পড়াশোনার যাত্রা। যৌবনের সিঁড়িতে পা দিয়েছি কিন্তু যৌবনের একেক বসন্ত কেটে গেছে আমার শুধু অপেক্ষায়। ঠিকানাবিহীন দুটো অনন্ত অপেক্ষার যাত্রী হয়ে কাটিয়ে দিয়েছি লক্ষ্য-লক্ষ্য প্রহর। ভালোবাসা আজ মুঠোফোনের চোরাবালিতে আড়ষ্ট সময় পার করে। এখন আর অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয় না। মন চাইলেই ভিডিও কলে দেখতে পায় দুজন দুজনকে। আজ এতটা বছর পর আমার হাতেও স্মার্টফোন। ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলি নাম্বারে অনেকেই আছে। ফাহিম নেই। ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্টে হাজার হাজার বন্ধু কিন্তু সেই লিস্টে নেই ফাহিম। আজও সব আধুনিকতার বাইরে গিয়ে যার স্মৃতি চিহ্নগুলো বয়ে নিয়ে চলি। যে জোড়া শালিক বহু বছর পূর্বে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। সেই ফাহিম আজ আমার মুখোমুখি। সকালের জার্নিটা শুরু হয়েছিল আমার আজিমপুর থেকে। গন্তব্য গাজীপুর। কিছু পথ পেরোতেই বেশ ক’জন যাত্রী উঠলো বাসে। প্রতিটি সিট ফিলাপ হয়ে বাকি তিনজনের ভাগ্যে পড়লো বাসের বাঁদুড়ঝোলা হ্যান্ড বেল্ট। স্বাভাবিক ভাবেই লেডিস সিট থেকে চোখ আটকে যায় ওই তিনজনের দিকে। কখনো ভাবতেই পারিনি এমন চলন্ত সময়ে এতটা বছর পর জোড়া শালিক মুখোমুখি হবে। সময়ের হাতছানিতে ফাহিমের চোখে চশমা উঠেছে, কাঁচা-পাকা চুলের মিশ্রণে সেই ফাহিম আজ আর অতটা লিকলিকে নেই। সুঠাম দেহ আর ক্যাজুয়াল লুকে বেশ আধুনিক অন্যরকম লাগলেও আমার চিনতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি। অসুবিধা হয়নি ওরও আমাকে চিনতে। দুজনের দৃষ্টি একটুও নড়েনি। বেশ নাটকীয় রিলের মতোই স্মৃতি আওড়াতে আওড়াতে হঠাৎ কানে ভেসে এলো আব্দুল্লাহপুর কে কে নামবেন। নেমে যান। আচমকা দুজনেরই সম্ভিত ফিরে এলো। ফাহিমকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। হঠাৎ কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে বাস থেকে নামার জন্য সামনে এগিয়ে এলো। ঠিক এক হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে ফাহিম। দুজনই বেশ ইতস্তত আর বেশ তাড়াহুড়োতে দুজনের মুখ থেকে এক সাথেই বেরিয়ে এলো কেমন আছ? কে আর কার জবাব দেয়! বাস থামলো, সময় কয়েক সেকেন্ড। ‘আজ আমার একটা বিপদের দিন লাবন্য। দেখা হবে নিশ্চয়ই।’ ফাহিম নেমে গেল। এত বছর পর দেখা তা-ও কথা হলো না, ঠিকানা জানা হলো না। ফোন নাম্বার, ফেসবুক আইডি কিছুই জানতে পারলাম না। তবে কি ফাহিম আমাদের সব স্মৃতি মাড়িয়ে গেছে? ভুলে গিয়েছিল আমায়? জাস্ট সৌজন্যতা করল? নাও তো নামতে পারতো ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম এত ভিড়ের মাঝেও ছোট্ট করে বলেছিল, ‘আজ আমার বিপদের দিন লাবন্য’। কী বিপদ! কী হয়েছে? আমি কী করে জানবো? ইস! কেন যে এভাবে দেখা হলো আমাদের। এরপর প্রায়ই আজিমপুর বাসস্টপ থেকে কারণে-অকারণে ছুটে গেছি আব্দুল্লাহপুর। কখনো কখনো ছুটির দিনেও। আমাদের আর দেখা হয়নি। উন্মুক্ত আকাশে বিচ্ছিন্ন হওয়া জোড়া শালিক আর এক হয়ে হাঁটেনি, ঠোঁটে ঠোঁটে খাবার নিয়ে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে একসাথে ছোটা হয়নি। ফাহিমও কি খুঁজেছিল আমায়, নাকি খোঁজেনি? নাকি আমার মতোই দ্বিগভ্রান্ত হয়ে নস্টালজিয়াকে সাথে নিয়ে এভাবে ছুটে চলেছে আজিমপুর টু আবদুল্লাহপুর! এসইউ

Share this post: