৭ মার্চের ভাষণ এক ঐতিহাসিক দলিল
2026-03-07 - 11:04
বাংলাদেশ নামে যে দেশটি স্বাধীন হয়েছে, সেখানে শেখ মুজিবুর রহমান সর্বদা প্রাসঙ্গিক। ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ও বাংলার মানুষের অনন্য প্রামাণ্য দলিল। বাংলাদেশ সৃষ্টির এক ও অদ্বিতীয় সংবিধান। ‘৬৯’ এর গণ অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ যে মুক্তি বা স্বাধীনতার দিকে যাচ্ছে, তা মূলত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়। ৭ই মার্চ পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশ নামক দেশটির শুভক্ষণের দিন। যার নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৭ই মার্চের ভাষণটি ছিল বাংলার সারা মানুষের জন্য ঐশ্বরিক উপহার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিরল কন্ঠস্বর। মার্চ মাসের দ্বিতীয় দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় প্রথম বাংলাদেশের মানচিত্র অঙ্কিত জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়। পরবর্তীকালে ৭ই মার্চ বাংলাদেশ যে পূর্ণ স্বাধীনতার পথে যাবে সেটা চূড়ান্তভাবে প্রতীয়মান হয় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে। সার্বিক অর্থে শেখ মুজিব ১ মার্চ ১৯৭১ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ধারক,বাহক ও মূল নায়ক ছিলেন। ৭ই মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। ঐ দিনে বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডের বীজ বপন হয়েছিল। ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৮ মিনিটের যে ভাষণ দিয়েছিলেন তার মধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগাম ইঙ্গিত ছিল। ১৮ মিনিটের ভাষণে দেশ ও মানুষের জন্য সব ধরনের নির্দেশনা ছিলো। যেমন স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার, শৃঙ্খলা, শান্তি ও অসম্প্রাদায়িকতা। ঐ ভাষণটি একমাত্র অলিখিত ভাষণ যেটা বিশ্বের ৭৮টি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল, নথি ও বক্তৃতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের অন্যতম সহযোগী সংস্থা ইউনেস্কো বিশ্ব ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল হিসাবে এ ভাষণকে স্বীকৃতি প্রদান করে। পরবর্তীকালে ইউনেস্কো কৃর্তক ৭ ই মার্চের ভাষণকে মেমোরি অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারেও (এমওডব্লিও) সংরক্ষণ করে। ৭ মার্চের ভাষণসহ এখন পর্যন্ত ৪২৭টি গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগৃহীত রয়েছে। ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়ে এখন দাবি করতে পারে তাদের নিকট একটি ব্যতিক্রম, অদ্বিতীয় এবং স্বাধীন দেশ উপহার দেওয়ার ভাষণ সংরক্ষিত রয়েছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের ভাষণ কেউ দিতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। ৭ই মার্চের ভাষণ স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে সমগ্র বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল। ভাষণটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক ঐতিহাসিক ভাষণ। তিনি বিকেল ২টা ৪৫ মিনিটে ভাষণ শুরু করে বিকেল ৩টা ০৩ মিনিটে শেষ করেন। ২, ৪, ৫, ৩ ও ৩ সংখ্যাগুলো যোগ করলে ১৭ এর সমান হয়। এ অলৌকিক সমীকরণ তার জন্মদিন ১৭ই মার্চকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বাঙালি জীবনে এক অবিসংবাদিত নেতা পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যার কল্যাণে একটি স্বাধীন দেশ, একটি পতাকা, একটি মানচিত্র, একটি জাতীয়তার পরিচয় এবং একটি ভূখণ্ড আমরা পাই। অন্যথায় আমাদের হয়ত বা আজীবন শোষিত ও পরাধীন থাকতে হতো। পাকিস্তানী এক গোয়েন্দা রিপোর্টে বঙ্গবন্ধুকে ‘চতুর’ এবং ‘বুদ্ধিমান’ উল্লেখ করা হয়। কারণ শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতা দিয়ে গেলেন,কিন্তু তারা কিছুই করতে পারল না। ৭ মার্চের ভাষণ শুধু স্বাধীনতার ডাক নয়,এটি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের চেতনা। সেই কারণেই এই ভাষণের আদর্শ ও বার্তা সমসাময়িক যেকোনো গণআন্দোলনের সঙ্গে, যেমন জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের সঙ্গে, প্রাসঙ্গিক বলে মনে করা হয়। ৭ই মার্চের ভাষণ একাডেমিক ও আন্তজার্তিক স্বীকৃতি পেলেও বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত জাতীয় দিবস ঘোষণা করেনি। ঐ দিনটিকে জাতীয় ঐতিহাসিক দিবস ঘোষণা করার জন্য অতীতে মহামান্য হাইকোর্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। যাতে মানুষ ৭ই মার্চকে উদযাপন করতে পারে। ইতোমধ্যে সাতই মার্চকে হাইকোর্ট জাতীয় ঐতিহাসিক দিবস ঘোষণা করে এক মাসের মধ্যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। ৭ই মার্চ ১৯৭১ সালে যে মঞ্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানে তার ভাস্কর্য নিমার্ণ করার বিষয়েও প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। ৭ই মার্চের ভাষণ প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ সকল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্য বইয়ে উল্লেখ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এই ভাষণটি ইংরেজি ও জাপানি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় ঐ ভাষণটি তখন পাকিস্তান সরকার রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারের অনুমতি দেয়নি। তবে অডিও রেকর্ডটিও এম আবুল খায়েয়ের মালিকাধীন রেকর্ডে ধারণ করা হয়। শেখ মুজিব কতটুকু নির্লোভ ছিলেন,সেটা ৭ই মার্চের ভাষণ থেকে উপলব্ধি করা যায়। কারণ ঐ ভাষণে বলেছিলেন “আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাইনা”। ৭ই মার্চের ভাষণ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, গরীব-দুঃখি এবং শোষিত-নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলা, সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করা ইত্যাদি। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছিলেন,‘ভালো ভাষণ কিন্তু বক্তারা লিখে বক্তব্য দেন, আমাদের বঙ্গবন্ধু ১৮ মিনিটের সেই ভাষণে তার নিকট কোন কাগজ ছিল না। এটি শুধু ভাষণ নয়,এটি কাব্য,এটি মহাকাব্য।’ ফিদেল কাস্ত্রো বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,‘আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।’ ফিদেল কাস্ত্রো পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত নেতা ছিলেন। তাঁকে অনেকবার হত্যার চেষ্টা করেও কিন্তু হত্যা করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমরা শেখ মুজিবকে বাঁচাতে পারিনি। কি এক দুর্ভাগ্য ও বেইমান জাতি আমরা। এ ভুলের মাশুল সারা জীবন বহন করতে হবে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বপ্ন ধারণ ও বাস্তবায়ন করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। তাইলেই প্রমাণিত হবে বঙ্গবন্ধুকে আমরা ভালবাসি এবং বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও আদর্শ ধারণ করি। ১৮ মিনিটের ভাষণের জন্য বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং এনে দিয়েছে ১০ঃ৬ মাপের একটি জাতীয় পতাকা। এ ভাষণের জন্য বঙ্গবন্ধুকে রাজনীতির কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ৭ই মার্চ এর ভাষণটি ছিল একটি বজ্রকণ্ঠ, একটি ইতিহাস। সোহরাওয়াদীর্ উদ্যানের একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আছে। কারণ এখানে ৭ই মার্চের ভাষণসহ আরও ৪টি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ রয়েছে। তাই এই এলাকাটি বিশেষায়িত এলাকা হিসেবে সংরক্ষণের মযার্দা দেওয়া উচিত। যে লোকটি ৭ই মার্চের ভাষণ শোনেনি বা উপলব্ধি করেনি, তিনি বাংলাদেশের নাগিরক হতে পারেন না। নাগরিক হওয়া উচিত না। ৭ই মার্চের ভাষণ শুধু শুনলে হবে না, ধারণ ও অনুভব করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হলে ৭ই মার্চের ভাষণকে জানতে হবে। সেই অনুসারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নেতৃত্ব দিতে হবে। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাংলাদেশের প্রতিটি সংকটে এ স্লোগান প্রাসঙ্গিক। তারই ধারাবাহিকতায় ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতার সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। আর জুলাই ২০২৪ আন্দোলন ছিল সমসাময়িক সময়ে অধিকার ও গণতান্ত্রিক দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলন। এই দুই ঘটনার মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিকতা দেখা যায়। যেমন- শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ৭ মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতিকে অন্যায়, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। জুলাই ২০২৪ আন্দোলনেও শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে। অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেতনা কাজ করেছে। এছাড়া মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন যে সংগ্রাম চলবে এবং মানুষকে দৃঢ় থাকতে হবে। এই ভাষণ আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস দেয়। জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের সময়ও অনেকেই সেই ঐতিহাসিক চেতনা ও সংগ্রামের ঐতিহ্যকে স্মরণ করেছে। ৭ মার্চের ভাষণ শুধু স্বাধীনতার ডাক নয়,এটি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের চেতনা। সেই কারণেই এই ভাষণের আদর্শ ও বার্তা সমসাময়িক যেকোনো গণআন্দোলনের সঙ্গে, যেমন জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের সঙ্গে, প্রাসঙ্গিক বলে মনে করা হয়। লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়,ময়মনসিংহ। এইচআর/এমএস