পকেট যখন শূন্য তখন ট্যাক্সের চাপ কার স্বার্থে?
2026-03-20 - 02:50
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে গত কয়েক বছরের বৈশ্বিক অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং রিজার্ভের টানাপড়েন, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম। ঠিক এমন সময়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উপায় হিসেবে ট্যাক্স বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর যুক্তি পরিষ্কার—রাষ্ট্রের কোষাগারে টাকা না থাকলে উন্নয়ন বা ঋণ পরিশোধ কোনোটিই সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, যখন সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, যখন দুই অঙ্কের মুদ্রাস্ফীতি মধ্যবিত্তের সঞ্চয় গিলে খাচ্ছে, তখন করের বোঝা বাড়ানো কতটা মানবিক বা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক? ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৬-এর এই সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতি বা মূল্যস্ফীতি গড়ে ৯% থেকে ১০% এর উপরে অবস্থান করছে। বিবিএস-এর (BBS) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক ক্ষেত্রে ১২% ছাড়িয়ে গেছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে বিদ্যুতের দাম পর্যন্ত সবকিছুই এখন সাধারণের নাগালের বাইরে। একজন নিম্ন আয়ের মানুষ বা নির্দিষ্ট বেতনের চাকুরে যখন তার আয়ের ৭০-৮০% কেবল খাদ্য কিনতেই ব্যয় করে ফেলেন, তখন তার ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো মানে হলো তাকে দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে ঠেলে দেওয়া। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় রিগ্রেসিভ ট্যাক্সেশন বা পশ্চাৎমুখী কর ব্যবস্থা, যা অসমতা আরও বাড়িয়ে দেয়। অর্থমন্ত্রীর ট্যাক্স বাড়ানোর বক্তব্যের পেছনে কিছু কঠিন গাণিতিক বাস্তবতা রয়েছে, যেগুলো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম—মাত্র ৭.৪ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যেখানে ভারত বা নেপাল–এর মতো দেশেও এই হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ–এর শর্ত অনুযায়ী, টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশকে এই অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। অন্যদিকে, গত কয়েক বছর ধরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে বাজেট ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ, যা বাজেটের পরিসর সংকুচিত করে ফেলছে। একই সময়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর জন্য আন্তর্জাতিক চাপও সরকারের ওপর জোরালো হচ্ছে। এসব বাস্তবতা মিলিয়ে সরকারের ধারণা—যদি বড় অংকের ট্যাক্স আদায় নিশ্চিত করা না যায়, তবে রাষ্ট্র পরিচালনাই কঠিন হয়ে পড়বে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই অতিরিক্ত রাজস্ব কি সাধারণ মানুষের পকেট কেটে আদায় করা হবে, নাকি দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকি দিয়ে যাওয়া বড় করদাতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে— বিতর্কটা সেখানেই। আমাদের দেশের কর কাঠামোর বড় সমস্যা হলো পরোক্ষ কর বা ভ্যাট (VAT)-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। বাংলাদেশে মোট করের প্রায় ৬২% আসে ভ্যাট বা পরোক্ষ খাত থেকে। ভ্যাটের বৈশিষ্ট্য হলো—এটি একজন কোটিপতিকেও যে হারে দিতে হয়, একজন রিকশাচালককে সাবান কিনলে একই হারে দিতে হয়। যখন অর্থমন্ত্রী ট্যাক্স বাড়ানোর কথা বলেন, তখন যদি ভ্যাটের হার বৃদ্ধি পায়, তবে বাজারে সব জিনিসের দাম এক দফা বাড়বে। এতে মুদ্রাস্ফীতি আরও উসকে যাবে। অথচ হওয়া উচিত ছিল প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর বাড়ানো। দেশের মাত্র ১% মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ জমা থাকলেও, বড় একটা অংশ নিয়মিত আয়কর দেয় না। যারা কর ফাঁকি দিচ্ছে, তাদের ধরা না গেলে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপানো অর্থনৈতিক ইনসাফের পরিপন্থি। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে হলে রক্তের সরবরাহ (রাজস্ব) বাড়াতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রক্ত নেওয়ার সময় যদি রোগীর পালস বা নাড়ি ক্ষীণ থাকে, তবে অতিরিক্ত রক্ত নেওয়া তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষ সেই মুমূর্ষু রোগীর মতো। অর্থমন্ত্রীর উচিত ট্যাক্স আদায়ের ক্ষেত্রে রবিন হুড নীতি অনুসরণ করা—অর্থাৎ যারা অতি ধনী এবং যারা এতদিন কর ফাঁকি দিয়ে আসছে, তাদের থেকে রাজস্ব আদায় করা। একইসাথে নিত্যপণ্যের ওপর থেকে পরোক্ষ কর কমিয়ে মানুষের ওপর থেকে মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমাতে হবে। একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, গত দুই বছরে দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হয়েছে—এ তথ্যই বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি স্পষ্ট আয়না। SANEM ও CPD–এর গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ব্যাংক সঞ্চয় প্রায় ১৫ শতাংশ কমে গেছে, কারণ আয়ের পুরোটা দিয়েই এখন নিত্যব্যয় মেটাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধির ফলে কর দেওয়ার মতো সক্ষম মানুষের সংখ্যাও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় করের হার বাড়ানো হলে বিনিয়োগ কমার আশঙ্কা প্রবল হয়। কারণ কর বাড়লে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, আর সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় করা হয়। দিনশেষে এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে দাঁড়ায় সাধারণ ক্রেতাই। মুদ্রাস্ফীতির এই চরম সময়ে সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থাকলেও মধ্যবিত্তের জন্য এমন কোনো রক্ষাকবচ নেই। তারা না পারছে লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির পণ্য কিনতে, না পারছে কারো কাছে হাত পাততে। উচ্চমূল্যের বাজারে যখন জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে গিয়ে মধ্যবিত্তরা তাদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ভেঙে ফেলছে বা কাটছাঁট করছে সন্তানের শিক্ষার বাজেটে, তখন নতুন করে ট্যাক্সের বোঝা চাপানো মানে হলো তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। করের বোঝা বাড়ানোর আগে সরকারকে ভাবতে হবে, যারা সৎভাবে কর দিচ্ছে, রাষ্ট্র বিনিময়ে তাদের কতটুকু নিরাপত্তা দিচ্ছে? উন্নত বিশ্বে করের বিনিময়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার যে নিশ্চয়তা থাকে, আমাদের দেশে তার ছিটেফোঁটাও অনুপস্থিত। ফলে পর্যাপ্ত সেবা নিশ্চিত না করে কেবল রাজস্ব বাড়ানোর তাগিদ সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও রাষ্ট্রবিমুখতা তৈরি করতে পারে। দেশের অর্থনীতি যখন ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে, তখন সরকারের কোষাগার পূর্ণ করার সহজতম উপায় হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ট্যাক্স বৃদ্ধি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফুটো বালতিতে পানি ভরে কি তা পূর্ণ করা সম্ভব? বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় করের হার বাড়ানোর চেয়েও জরুরি হলো কর আদায়ের ব্যবস্থার ছিদ্রগুলো বন্ধ করা। অর্থাৎ, দুর্নীতি রোধ এবং পদ্ধতিগত করফাঁকি বন্ধ করাই হওয়া উচিত প্রথম পদক্ষেপ। সরকার যখন সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপায়, তখন জনমনে প্রশ্ন ওঠে—সেই টাকার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে তো? প্রতি বছর অডিট রিপোর্টে উঠে আসে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম। মেগা প্রজেক্টের অস্বাভাবিক খরচ থেকে শুরু করে সরকারি কেনাকাটায় পর্দা-বালিশ কাণ্ড—এই যে অর্থের অপচয়, তা বন্ধ করতে পারলে নতুন করে কর বাড়ানোর প্রয়োজনই হতো না। দুর্নীতির মাধ্যমে যে অর্থ অপচয় হয়, তা সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা। এই অপচয় বন্ধ না করে জনগণের পকেট কাটা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। অর্থনীতিবিদরা বারবার বলছেন, করের হার না বাড়িয়ে করের পরিধি বাড়ানো হোক। বাংলাদেশে কয়েক কোটি মানুষের টিন (TIN) সার্টিফিকেট থাকলেও রিটার্ন জমা দেয় মাত্র ৩৫-৪০ লাখ মানুষ। ট্যাক্স বাড়ানো মানে যদি হয় যারা নিয়মিত ট্যাক্স দেয় তাদের ওপর আরও বাড়তি বোঝা চাপানো, তবে তা হবে আত্মঘাতী। আর যদি এর মানে হয় নতুন নতুন ধনকুবেরদের করের আওতায় আনা, তবে তা প্রশংসনীয়। ট্যাক্স বাড়ানোর যৌক্তিকতা তখনই থাকে যখন জনগণ দেখতে পায় তাদের দেওয়া টাকা সঠিকভাবে খরচ হচ্ছে। বাংলাদেশে মেগা প্রজেক্টের খরচ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক অপচয় রোধ করতে পারলে কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব। জনগণের টাকায় বিলাসিতা হবে আর সেই ঘাটতি পূরণে সাধারণ মানুষের ওপর ট্যাক্স বসানো হবে—এটি কোনো কল্যাণকর রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না। সংকট উত্তরণের জন্য বিকল্প পথ হিসেবে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত ট্যাক্স না বাড়িয়ে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, যারা কয়েকশ কোটি টাকার মালিক তাদের ওপর বিশেষ সম্পদ কর আরোপ করা, বিদেশে অর্থ পাচার রোধ করা—যদি বছরে পাচার হওয়া অর্থের অর্ধেকও রাজস্ব হিসেবে আদায় করা যেত, বাজেট ঘাটতি থাকত না। এনবিআর-এর কার্যক্রম পুরোপুরি ডিজিটাল করলে কর ফাঁকি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি সাধারণের নিত্যপণ্যে ভ্যাট কমিয়ে বিলাসপণ্য বা দামি গাড়ি আমদানি ক্ষেত্রে কর বাড়ানোও কার্যকর হতে পারে। এগুলো কেবল রাজস্ব সংগ্রহই বাড়াবে না, বরং অর্থনীতির স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতাকেও শক্ত করবে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের পদক্ষেপ সামাজিক অসাম্য কমিয়ে ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ হ্রাস করে অর্থনীতিকে আরও টেকসই করে তুলতে সহায়ক হবে। সর্বোপরি বলতে পারি, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে হলে রক্তের সরবরাহ (রাজস্ব) বাড়াতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রক্ত নেওয়ার সময় যদি রোগীর পালস বা নাড়ি ক্ষীণ থাকে, তবে অতিরিক্ত রক্ত নেওয়া তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষ সেই মুমূর্ষু রোগীর মতো। অর্থমন্ত্রীর উচিত ট্যাক্স আদায়ের ক্ষেত্রে রবিন হুড নীতি অনুসরণ করা—অর্থাৎ যারা অতি ধনী এবং যারা এতদিন কর ফাঁকি দিয়ে আসছে, তাদের থেকে রাজস্ব আদায় করা। একইসাথে নিত্যপণ্যের ওপর থেকে পরোক্ষ কর কমিয়ে মানুষের ওপর থেকে মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমাতে হবে। জনগণের জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা বালির বাঁধের মতো ক্ষণস্থায়ী হতে বাধ্য। উন্নয়ন তখনই সার্থক হয়, যখন সাধারণ মানুষের পাতে দু-মুঠো অন্ন নিশ্চিত থাকে। লেখক : শিক্ষক। jasim6809786@gmail.com এইচআর/এমএস