TheBangladeshTime

রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ, স্বাধীনতার ডাক

2026-03-06 - 18:13

অসহযোগ আন্দোলন ঘিরে ১৯৭১ সালের মার্চে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন। সর্বত্র গুঞ্জন- ৭ মার্চই হয়তো স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেই প্রত্যাশা নিয়ে সকাল থেকেই লাখো মানুষ সমবেত হতে থাকেন রাজধানীর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ঢাকার আশপাশসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত জনতার ঢল নামে ঐতিহাসিক এই মাঠে। বিকেল সোয়া ৩টায় সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ও কালো কোট (মুজিব কোট) পরিহিত শেখ মুজিবুর রহমান সভাস্থলে পৌঁছালে করতালি ও ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। এবারের সংগ্রাম... ২৩ বছরের বঞ্চনা, বৈষম্য ও নিপীড়নের ইতিহাস তুলে ধরে শেখ মুজিব ঘোষণা করেন, ‘আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।...রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তার এই উচ্চারণে জনতার আবেগ যেন বিস্ফোরিত হয়। চারদিকে ধ্বনিত হতে থাকে- ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘তোমার নেতা আমার নেতা- শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’। এ ঘটনা ঘিরে কবি নির্মলেন্দু গুণ পরবর্তীতে লিখেছিলেন- ‘তারপর থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’ ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ার আহ্বান শেখ মুজিব স্পষ্ট ভাষায় জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না। দেশের মানুষের অধিকার চান। সতর্ক উচ্চারণে বলেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইলো- প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে উত্তাল জনসমুদ্রের সামনে ভাষণ দেন শেখ মুজিবুর রহমান/ছবি: সংগৃহীত তার এই নির্দেশ কার্যত সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানকে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে তার নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার আহ্বান জানায়। বেতার সম্প্রচার নিয়ে নাটকীয়তা ৭ মার্চের ভাষণ সরাসরি সম্প্রচারের ঘোষণা পেয়ে সারা বাংলার মানুষ রেডিও নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করলেও শেষ মুহূর্তে সামরিক কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করে দেয়। প্রতিবাদে ‘ঢাকা বেতার’-এর বাঙালি কর্মচারীরা কাজ বর্জন করেন এবং বিকেল থেকেই সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। গভীর রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ ভাষণের পূর্ণ বিবরণ প্রচারের অনুমতি দিলে তা দিয়েই ঢাকা বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচার পুনরায় শুরু হয়। চূড়ান্ত পরিণতির পথে সেই রাতেই আওয়ামী লীগ ১০ দফার ভিত্তিতে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে, গভর্নর হিসেবে টিক্কা খান ঢাকায় আসেন। বিভিন্ন স্থানে বাঙালি-অবাঙালি সংঘর্ষ ও সামরিক বাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। ৭ মার্চের ভাষণ ছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। যে ভাষণ বাঙালিকে প্রস্তুত করেছিল চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য এবং সূচনা করেছিল ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের। তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর ‘৭১ এর দশমাস’, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংবাদপত্র এমএএস/একিউএফ

Share this post: