কার স্বার্থে স্কুলে ভর্তিতে ফিরছে পরীক্ষা?
2026-03-23 - 06:00
গত ১৫ মার্চ জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান ভর্তি প্রক্রিয়ায় সমালোচনা করে বলেন, সরকার কি মেধাকে সবসময় এভাবে দমিয়ে রাখবে নাকি এই ভর্তি প্রক্রিয়া পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা আছে? জবাবে শিক্ষামন্ত্রী লটারি পদ্ধতি বাতিলের আভাস দিয়ে বলেন, বিগত সরকার লটারি সিস্টেম করেছিল, যেটা আদৌ আমার মনে হয় না যুক্তিসঙ্গত। আগামী ২০২৭-এর জানুয়ারি ভর্তির বিষয়ে নতুন চিন্তা করবো। এদিন বিকালেই সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘বছরের প্রথমে অ্যাডমিশন যেটা হয়, সেখানে আমরা লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। আগাম জানিয়ে দিলাম, যেন সবাই সুযোগ পায়। আমরা লটারি সিস্টেম উইথড্র করলাম, দ্যাটস ইট।’ মন্ত্রী বলেন, গত এক মাস ধরে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে স্কুলে ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি উঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অথচ মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে অভিভাবক—প্রত্যেকেই স্কুলে ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে পরীক্ষা পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেন। কেননা এটি খুবই স্পষ্ট যে, স্কুলে ভর্তিতে পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর অর্থই হলো কোচিং বাণিজ্যের দরজা খুলে যাবে। তথাকথিত ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য অভিভাবকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চটকদার বিজ্ঞাপন দেবে কোচিং সেন্টারগুলো এবং যাদের পয়সা আছে তারা তাদের সন্তানদেরকে ওইসব কোচিংয়ে পাঠাবেন। যাদের পয়সা নেই, তাদের সন্তানরা হয়তো ভর্তি পরীক্ষায় ছিটকে পড়বে। তার চেয়ে বড় কথা, ভর্তি পরীক্ষা মানেই প্রশ্নপত্র ফাঁস বা সংশ্লিষ্ট স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির বিরাট বাণিজ্য। লাখ লাখ টাকা ডোনেশন নিয়ে এবং ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে ভর্তির যে প্রবণতা চালু আছে, সেটি আরও বাড়বে। এইসব তৎপরতায় নিম্নমধ্যবিত্ত এবং সৎ পথে উপার্জনকারীদের সন্তানদের কাঙ্ক্ষিত স্কুলে ভর্তি অনেক কঠিন হয়ে যাবে। যেখানে এখন লটারি পদ্ধতির কারণে সমাজের প্রান্তিক মানুষদের সন্তানরাও ভালো স্কুল হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পায়—সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। সমাজে বৈষম্য বাড়বে। সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্যমান লটারি সিস্টেমের দুর্বলতা বা এই সিস্টেমটি যে খারাপ বা ব্যর্থ, সেটি প্রমাণের আগে কেন এই পদ্ধতি বাতিল করা হবে? অভিভাবকরা কি এই পদ্ধতি বাতিল চেয়েছেন? বিশ্বের উন্নত দেশেও এভাবেই শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। বাংলাদেশে কী সমস্যা? কার বা কাদের স্বার্থে আবারও স্কুলে ভর্তিপরীক্ষার নামে কোচিং বাণিজ্য এবং দুর্নীতির দরজা খুলতে চাচ্ছেন একসময়ের সফল শিক্ষামন্ত্রী—সেটি এখন বড় প্রশ্ন। তিনি দাবি করেছেন, এক মাস ধরে স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ দেখা গেলো তিনি সংসদের হাসনাত আব্দুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে সাথে সাথে বললেন যে তারা ভর্তি পদ্ধতি পরিবর্তনের চিন্তা-ভাবনা করছেন এবং ওইদিন বিকালেই সচিবালয়ে এই ঘোষণা দিলেন। তিনি এক মাস ধরে কাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন? সেই স্টেকহোল্ডার কারা? প্রশ্নটা এ কারণে যে, এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন দেশের খ্যাতিমার শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা গবেষকরা। তাহলে শিক্ষামন্ত্রী কোন স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা করলেন? এরকম একটি বিরাট সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তিনি অভিভাবকদের পরামর্শ বা মতামত নিয়েছেন? যাদের সন্তানরা স্কুলে পড়ে বা ভর্তি হবে, তাদের মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই? হাসনাত আব্দুল্লাহ সংসদে যখন প্রশ্নটি উত্থাপন করলেন, তখন বিষয়টা নিয়ে সংসদেই আরও বেশি আলোচনা হলো না কেন বা পয়েন্ট অব অর্ডারে কেন অন্য কোনো সদস্য বিষয়টি উত্থাপন করে আলোচনার দাবি জানালেন না? একটি ভালো পদ্ধতি, যেটি নিয়ে অধিকাংশ মানুষেরই কোনো অভিযোগ বা আপত্তি নেই, সেটি মন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে কিংবা কোনো একজন ব্যক্তির দাবির মুখে বাতিল হয়ে যাবে? ভর্তির যুদ্ধটা হয় মূলত স্বনামধন্য তথা তথাকথিত ভালো স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে। অথচ এই ভালো স্কুলের ধারণাটিই ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক। আধুনিক বিশ্বের পদ্ধতি হলো ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা এলাকাভিত্তিক ভর্তি। অর্থাৎ প্রত্যেক এলাকাতেই কাছাকাছি মানের একাধিক স্কুল থাকবে, সেই স্কুলে ওই এলাকার শিক্ষার্থীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভর্তি হবে। কিন্তু ঢাকা শহরের হাতেগোণা কয়েকটি স্কুলে সন্তানদের ভর্তির ব্যাপারে অভিভাবকরা উন্মাদ হয়ে যান। প্রশ্ন হলো, তথাকথিত ওইসব ভালো স্কুলগুলো কী কারণে ভালো স্কুল? সেখানে শিক্ষকরা ভালো পড়ান বা সেখানের পরিবেশ ভালো, খেলার মাঠ আছে, যাতায়াত সুবিধা আছে ইত্যাদি কারণেই তো। যদি তাই হয়, তাহলে অন্য স্কুলগুলোকেই সরকার কেন একই সুবিধা নিশ্চিতের জন্য চাপ দেয় না বা সব স্কুলকে কাছাকাছি মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয় না? ঢাকা শহরে কেন হলিক্রস, নটরডেম, ভিকারুন নিসা বা আইডিয়ালের মতো অন্তত ৫০টি স্কুল থাকবে না? তার চেয়ে বড় কথা, পাড়ায় মহল্লায় ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি স্কুল গড়ে তুলে শিক্ষার যে বারোটা বাজানো হলো, সেটা বন্ধে অতীতের কোনো সরকার কেন উদ্যোগ নিল না? এহছানুল হক মিলন শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষার মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার বদলে ভর্তিপদ্ধতির মতো একটি বিষয়কে কেন গুরুত্ব দিচ্ছেন? এটি কি এই মুহূর্তে আদৌ প্রয়োজনীয় কোনো বিষয়? তিনি বলছেন বা যারা স্কুলে ভর্তিতে পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার পক্ষপাতি, তাদের দাবি হলো, লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মেধা যাচাই হয় না। যে শিশুটি প্রথম শেণিতে ভর্তি হবে, তার মেধা যাচাইয়ের প্রয়োজনটা কী? তার মেধা যাচাইয়ের তরিকাটা কী হবে? যখনই তার মেধা যাচাইয়ের প্রশ্ন উঠবে, তখন ভর্তি পরীক্ষায় বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের বলা হবে মেধাহীন। শিশু বয়সেই তাদের মেধা যাচাইয়ের নামে একটি যুদ্ধে নামিয়ে দিতে হবে কেন? মেধা যাচাই হবে স্কুলে ভর্তির পরে, ফাইনাল পরীক্ষায়। তার মেধার বিকাশ ঘটানোর দায়িত্ব শিক্ষকের। একটা শ্রেণিতে ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থী থাকলে সবশেষ বেঞ্চের শিক্ষার্থীর কথা শিক্ষক যেমন শোনেন না, তেমনি শিক্ষকের কথাও তার কানে পৌঁছায় না। ফলে শিক্ষক একগাদা হোমওয়ার্ক দিয়ে দেন। কিছুদিন পরপর পরীক্ষা নেন। অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে দেন। সেই হোমওয়ার্ক ও অ্যাসাইনমেন্ট করে দেন মূলত তার অভিভাবক। এভাবে শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ ঘটে? একটি ক্লাসে সর্বোচ্চ কতজন শিক্ষার্থী থাকবে, সেটি ঠিক করে দেয়ার মতো জরুরি কাজে হাত না দিয়ে; স্কুলে পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত না করে; প্রতি বছর ভর্তিসহ নানা নামে অভিভাবকের পকেট কাটা বন্ধের উদ্যোগ না নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী এমন একটি বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, যা কেউ চায় না। যেটির আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই। শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার নামে শিশুদের ওপর একটা অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেবেন না; সমাজে একটা বৈষম্য তৈরি এবং কোচিং বাণিজ্য ও স্কুল কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির দরজা উন্মুক্ত করবেন না। ভর্তিতে যে লটারি পদ্ধতি আছে, সেখানে যদি কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে, সেগুলোর সমাধান করুন। একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি বাতিলের আগে সেই পদ্ধতিটি কেন খারাপ, সেটি বলতে হবে। মেধা যাচাইয়ের নামে শিশুদের এবং তাদের অভিভাবকদের পেরেশানিতে ফেলার কোনো মানে হয় না। সর্বোপরি, রাজধানীর সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলোতে কেন সমাজের মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত শ্রেণির লোকজন তাদের সন্তানদের ভর্তি করতে চায় না, তার কারণ উদ্ঘাটন করে সরকারি স্কুলগুলোর মান বাড়ান—যাতে তথাকথিত ভালো স্কুলগুলোয় ভর্তি করাতে অভিভাকদের ঘুম হারাম না হয়। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য; সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য; আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। অর্থাৎ একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং একটি নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র কি সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছে? না পারলে সেটি নিশ্চিত করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ গ্রহণ করাই নতুন সরকারের বড় কাজ হওয়া উচিত। বিশেষ করে শিক্ষা যে সাংবিধানিক অধিকারের বদলে একটা পণ্যে পরিণত হলো, এবং বেসরকারি খাতে যে পণ্যটি কিনতে হয় অনেক দাম দিয়ে, সেখান থেকে জনগণকে মুক্তি দেয়াই সরকারের দায়িত্ব। আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক। এইচআর/জেআইএম