ফুটবল মাঠে শোকের ছায়া, শিশুদের স্কুলব্যাগ হাতে শ্রদ্ধা জানাল ইরান
2026-03-28 - 13:30
খেলা শুরুর আগে ফুটবলাররা মাঠে নামেন একজন শিশুর হাত ধরে। ফিফার একটি স্লোগানই রয়েছে, ‘শিশুদের প্রতি হ্যাঁ বলুন’। প্রতিজন ফুটবলারের হাতে ধরা থাকে একটি করে শিশুর হাত। তারা মাঠে দাঁড়ান, পতাকা প্রদর্শন হয়, দলীয় বা জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়, এরপর প্লেইং একাদশ মাঠে থেকে যায়, শিশুরাসহ বাকিরা সবাই মাঠ ছেড়ে যান- এটাই নিয়ম। কিন্তু ২৭ মার্চ তুরস্কের আনাতোলিয়ায় আরদান স্টেডিয়ামে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ফিফা প্রীতি ম্যাচে ইরানি ফুটবলাররা কোনো শিশুর হাত ধরে মাঠে নামেননি। তাদের সবার হাতে ধরা ছিল একটি করে স্কুলব্যাগ। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর প্রথম দিনই, ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণাঞ্চলে একটি স্কুলে ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হয়। যেখানে মৃত্যু বরণ করে ১৬৫ জনেরও বেশি মানুষ। যাদের অধিকাংশই ওই স্কুরের শিশু শিক্ষার্থী। আনাতোলিয়ায় ইরান জাতীয় ফুটবল দল এক আবেগঘন মুহূর্ত উপহার দিয়ে দিয়ে স্মরণ করল ভয়াবহ ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া সেই শিশুদের। ছোট ছোট স্কুলব্যাগগুলো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ইরানি ফুটবলাররা নিহত শিশুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালো। একই সঙ্গে স্কুলের নীরিহ, নিরপরাধ শিশু হত্যায় জড়িতদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও প্রতিবাদ জানালো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়, তার দায় এখনো কেউ স্বীকার করেনি- না যুক্তরাষ্ট্র, না ইসরায়েল। তবে ঘটনাটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাস সারাবিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এ ঘটনার তদন্ত করছে এবং বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো নীতি তাদের নেই। শুক্রবারের ম্যাচে জাতীয় সঙ্গীত চলাকালে ইরানি খেলোয়াড়রা নিজেদের হাতে গোলাপি ও বেগুনি রঙের ছোট স্কুলব্যাগ হাতে দাঁড়ান- যা নিহত শিশুদের স্মৃতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের হাতে ছিল কালো আর্মব্যান্ড, যা চলমান সংঘাতে নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশের আরেকটি প্রতীক। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় তুরস্কের আনতালিয়ায়, যা ছিল আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপ সামনে রেখে ইরানের প্রস্তুতির অংশ। তবে ম্যাচের ফল ইরানের পক্ষে যায়নি- নাইজেরিয়া ২-১ ব্যবধানে জয় পায়। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ইরানের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। আগামী জুনে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে। তবে নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে ইরান চায় ম্যাচগুলো মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়া হোক। মেক্সিকো সিটিতে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত ইতোমধ্যে এ বিষয়ে ফিফার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বিশ্বকাপ বয়কট করতে চায় না; কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি তাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বিশ্বকাপ নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই আয়োজন করা হবে এবং ভেন্যু পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই। এদিকে মাঠের বাইরেও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একই দিনে ইরানের বিচার বিভাগ জাতীয় দলের তারকা ফুটবলার সরদার আজমাউনের সম্পত্তি জব্দ করার হুমকি দিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির দুটি আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা। সরকারের সমালোচনায় যুক্ত থাকা সেলিব্রিটিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, শোক, আবেগ, রাজনীতি এবং ফুটবল- সবকিছু মিলিয়ে এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইরান। মাঠে প্রতীকী প্রতিবাদ যেমন ছিল, তেমনি মাঠের বাইরের পরিস্থিতিও ইঙ্গিত দিচ্ছে- আগামী দিনগুলোতে দেশটির ফুটবল আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। আইএইচএস/ আইএইচএস/