রাঙ্গামাটি থেকে ঢাকা-চট্টগ্রামে যাচ্ছে ‘মাইনীর তরমুজ’
2026-03-15 - 16:03
হ্রদ-পাহাড়ের শহর রাঙ্গামাটির বাজারে মৌসুমি ফল তরমুজে সয়লাব। আর এসব তরমুজ ‘মাইনীর তরমুজ’ নামে বেশি পরিচিত। শহরের বনরুপা, কলেজগেট, রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি—সব বাজারে মাইনীর তরমুজ বিক্রি করছেন মৌসুমি ফল ব্যবসায়ীরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার লংগদু উপজেলার মাইনী ও কাচালং নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা বাজারের নাম মাইনীমুখ বাজার। আর এ বাজারে স্থানীয়দের উৎপাদিত তরমুজের পাইকারি হাট বসে প্রতি শনিবার। জেলা শহরে বিক্রি হওয়া তরমুজের বেশিরভাগ সরবরাহ আসে মাইনীমুখ বাজার থেকে। মাইনীমুখ বাজার ছাড়াও কাপ্তাই হ্রদের জলে ভাসা জমিতে চাষ করা সব তরমুজের নাম এখন ‘মাইনীর তরমুজ’ হিসেবে জনপ্রিয়। রাঙ্গামাটি পাহাড়ি এলাকায়, বিশেষ করে কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী ও চেঙ্গী নদীর অববাহিকায় এবার তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এ রসালো ও সুমিষ্ট তরমুজ ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে, যা কৃষকদের ভালো মুনাফা দিচ্ছে। কম খরচে ও অনুকূল আবহাওয়ায় ভালো ফলন পাওয়ায় চাষিরা লাভবান হচ্ছেন। রাঙ্গামাটি শহরের বনরুপা এলাকায় ফুটপাতে সারিবদ্ধভাবে তরমুজ বিক্রি করতে বসেছেন মৌসুমি বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানের সব তরমুজ ‘মাইনীর তরমুজ’ বলে তারা বিক্রি করেন। যদিও এসব তরমুজ জেলার সুবলং, বরকল, নানিয়ারচর থেকেও রাঙ্গামাটির পাইকারি মৌসুমি ফলের বাজার সমতাঘাটে নিয়ে আসেন চাষিরা। ব্যবসায়ী সোহেল চাকমা বলেন, আমি বিশ বছর হলো কাঁচামালের ব্যবসার পাশাপাশি তরমুজ ও আনারস বিক্রি করি। মৌসুমের শুরুর দিকে স্থানীয় তরমুজের সরবরাহ বাজারে বেশি থাকে। তাই এখানকার উৎপাদিত তরমুজ, বিশেষ করে মাইনীর তরমুজের জনপ্রিয়তা বেশি, চাহিদাও বেশি থাকে। আমরা সমতাঘাট থেকে পাইকারি কিনে ফুটপাতে বসে বিক্রি করি। এবার তরমুজের দাম বেশ চড়া। পাইকারি কিনতে হয়েছে ১৮০ টাকা পিস হিসেবে। এরপর পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ আছে। অ্যাভারেজে ২০০ টাকা পিস দাম পড়েছে প্রতিটি তরমুজের। এরপর ছোটগুলো বিক্রি করতে হয় ১০০ টাকার মধ্যে, আর বড়টা সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা। মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. জাফর ও বেলাল হোসেন বলেন, এখানে সব তরমুজ ‘মাইনীর তরমুজ’ বলে বিক্রি হয়। তবে অন্য এলাকা থেকেও তরমুজ আসে বাজারে। আমরা মাইনী থেকে সরাসরি তরমুজ নিয়ে আসছি। একশ তরমুজ কিনতে প্রায় বিশ হাজার টাকা খরচ পড়েছে। এরপর প্রতিদিন ৫–৬টা নষ্ট হয়। আর একশ তরমুজের মধ্যে ২০–২৫টা বড় সাইজের হলে বাকিগুলো মাঝারি ও ছোট সাইজের বেশি থাকে। অনেক হিসাব করে বিক্রি করতে হয়। বেলাল হোসেন বলেন, আমি নিজে আগে চাষ করতাম। চাষ করে খুব বেশি লাভবান হওয়া যায় না। তাই গত দুই বছর হলো ব্যবসা শুরু করেছি। সিজনের শুরুতে দাম ভালো ছিল। ৬–৭ শ টাকা দামেও বড় তরমুজ বিক্রি করেছি। এখন সর্বোচ্চ সাড়ে ৪০০ টাকায় বিক্রি করছি। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে ঢাকা থেকে রাঙামাটিতে বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে এসে মৌসুমি ফলের ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় দুই বন্ধু তাহমিদ ও সাকিবের। এরপর গত এক মাস যাবৎ রাঙ্গামাটি থেকে মৌসুমি ফল আনারস, কাঁঠাল নিয়ে যান ঢাকার ফলের আড়তে। আনারসে ভালো লাভ হলেও কাঁঠাল নিয়ে লোকসান হয়েছে বলে জানান এ তরুণ মৌসুমি ব্যবসায়ী দুই বন্ধু। বর্তমানে রাঙ্গামাটির ফুটপাতে খুচরা তরমুজ বিক্রির পাশাপাশি ঢাকার আড়তেও পাঠাচ্ছেন নিয়মিত। অল্প সময়ে ব্যবসার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তাহমিদ ও সাকিব জাগো নিউজকে বলেন, মৌসুমি ফলের ব্যবসা অনেক কঠিন। প্রতিনিয়ত দাম ওঠানামা করে। এরপর প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে লাভ-লোকসান। বৃষ্টি হলে তরমুজের চাহিদা শূন্যে নেমে যাবে। এরপর এ সেক্টরে প্রতারণা বেশি হয়। কলা পাকাতে কার্বাইড, আনারসে হরমোন, তরমুজে কৃত্রিম রং মেশান অসাধু ব্যবসায়ীরা। আমরা এ প্রতারণার দেওয়াল ভাঙতে চাই। আমরা চাই রাঙ্গামাটির কেমিকেলমুক্ত মৌসুমি ফল ঢাকার মানুষ নিরাপদে খেতে পারে। রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর প্রায় সাত হাজার ২০০ মেট্রিক টন তরমুজ উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাঙ্গামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এ বছর আবহাওয়া ভালো হওয়ার কারণে তরমুজের ফলন ভালো হয়েছে। ইতোমধ্যে বাজারে তরমুজ আসতে শুরু করেছে। এ বছর চাষিরা আগাম জাতের কিছু তরমুজের চাষ করেছেন। এতে করে বাজারে দামও ভালো পাচ্ছেন চাষিরা। আরমান খান/আরএইচ/এমএস