TheBangladeshTime

জাপান থেকে গ্রামগঞ্জে মানবতার আলো ছড়াচ্ছেন কুমিল্লার আমির

2026-03-16 - 03:04

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান সমাজের অসহায়, দুস্থ, নিঃস্ব ও প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি তার এক বুক মায়া। ২০১৭ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তিনি স্থাপন করেছেন ৪৭টি টিউবওয়েল, ৬২ জন প্রতিবন্ধী মানুষকে দিয়েছেন হুইলচেয়ার এবং তিনজন অসহায় কন্যার বিয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন নিজ কাঁধে। নিজে রক্ত দিয়েছেন ২৩ বার। মানবতার তাগিদে গড়ে তুলেছেন ‘রংধনু ব্লাড ড্রাইভার্স’ ও ‘বি-নেগেটিভ ডোনার বাংলাদেশ’ নামের দুটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সমাজকল্যাণে অন্তপ্রাণ এই মানুষটির নাম কেএম আমির হোসাইন। বর্তমানে তিনি জাপানে একটি রেস্টুরেন্টে ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। তার জন্ম কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রামে। কৃষক বাবার সংসারে চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে আমির সবচেয়ে ছোট। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ডিগ্রি প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দেওয়ার পর আমির জাপানে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি আইটি বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। প্রবাসে থাকার সময়ও সমাজের অসহায় মানুষদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। অনেকেই এসে আমিরের কাছে তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলতেন। তখনই আমির ভাবতে শুরু করেন চেষ্টা করলে এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। এই ভাবনা থেকেই ২০১৭ সালে শুরু হয় আমিরের মানবিক কাজের পথচলা। একই বছরের ১৮ মার্চ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘রংধনু ব্লাড ড্রাইভার্স’। শুরুর দিকে নিজের অর্থেই সব ধরনের মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও পরবর্তীতে ফেসবুকের মাধ্যমে ফান্ড সংগ্রহ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি দুইভাবে মানবিক কাজের অর্থের সংস্থান করেন নিজের আয়ের একটি অংশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহ্বানের মাধ্যমে প্রাপ্ত সহায়তা। এই দুই উৎস থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়েই সংগঠনের কর্মীদের মাধ্যমে অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি। বিদেশে থেকেও দেশের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য যে কার্যকরভাবে কিছু করা সম্ভব কেএম আমির হোসাইন তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক গ্রাম রয়েছে, যেখানে বিশুদ্ধ পানির প্রকট সংকট। কোথাও নেই টিউবওয়েল। এমন সব এলাকার খোঁজ নিয়ে আমির ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৪৭টি টিউবওয়েল স্থাপনের ব্যবস্থা করেছেন। একইভাবে হুইলচেয়ারের অভাবে প্রতিবন্ধী মানুষদের কষ্ট তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই কষ্ট লাঘব করতে তিনি ৬২টি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করেন। এর মধ্যে চান্দিনা ও আশপাশের এলাকার অধিকাংশ প্রতিবন্ধী তার দেওয়া হুইলচেয়ার পেয়েছেন। পাশাপাশি চাঁদপুর, রংপুরসহ দেশের অন্যান্য এলাকার প্রতিবন্ধীরাও এই সহায়তার তালিকার বাইরে নেই। চান্দিনার রসুলপুর গ্রামের হুইলচেয়ারপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী মাসুদ বলেন, ‘আগে কারো সাহায্য ছাড়া ঘর থেকে বের হতে পারতাম না। আমির ভাইয়ের দেওয়া হুইলচেয়ার পাওয়ার পর এখন নিজেই চলাফেরা করতে পারি। মনে হয়, আবার নতুন করে জীবন শুরু করেছি।”‘রংধনু ব্লাড ড্রাইভার্স’ ও ‘বি-নেগেটিভ ডোনার বাংলাদেশ’ এই দুই সংগঠনের সদস্যরা সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় অসহায় ও অভাবী মানুষদের খুঁজে পেতে আমিরকে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। আমিরের নিজ গ্রামের নাম মেহার। এই গ্রামের তিনজন অসহায় পিতা মেয়েদের বিয়ের বিষয়ে তার কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। তখন কোনো দ্বিধা না করে আমির নিজের পকেট থেকে তিনটি পরিবারকে মোট ৭৫ হাজার টাকা অর্থসহায়তা প্রদান করেন। ২০২৩ সালে মেহার এলাকায় আমির অসহায় ও এতিম ছাত্রের জন্য এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এই এতিমখানায় বর্তমানে ২জন শিক্ষক ও ৩৫জন ছাত্র আছেন। এতিমখানার খরচ আমির বহন করেন। তবে কখনো সাহায্যের প্রয়োজন হলে ফেসবুকের পোস্টের মাধ‍্যমে তা সংগ্রহ করেন। আমির জানান, প্রতিমাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকার মত খরচ হয় এতিমখানার জন্য। রক্তের প্রয়োজনে শুধু নিজে পাশে দাঁড়ানোতেই থেমে থাকেননি আমির। রক্তদাতাদের সংগঠিত করতে ২০১৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বি-নেগেটিভ ডোনার বাংলাদেশ’। এই সংগঠনের মাধ্যমে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানা যায়। কোথাও কোনো মুমূর্ষু রোগীর রক্তের প্রয়োজনের খবর পেলেই সংগঠনের সদস্যরা ছুটে যান। বিভিন্ন এলাকায় তাদের সদস্যদের মোবাইল নম্বর প্রকাশ্যে রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে যে কেউ সহজেই যোগাযোগ করতে পারে। আমির নিজে রক্ত দিয়েছেন ২৩ বার। তার রক্তদানের যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালে। তার রক্তের গ্রুপ বি নেগেটিভ যা অত্যন্ত বিরল। সেই প্রথম রক্তদানের ঘটনাটি আজও তাকে আবেগাপ্লুত করে। একদিন একটি ছাত্রের বাসায় পড়াতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ওই পরিবারের এক আত্মীয় গুরুতর অসুস্থ। রক্তের অভাবে পরিবারটি কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। রক্তের গ্রুপ মিললেও রক্ত দিতে হলে যে ন্যূনতম ওজন প্রয়োজন, তার চেয়ে আমিরের ওজন দুই কেজি কম ছিল। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি। তখন দুই কেজি পানি পান করে প্রয়োজনীয় ওজন পূরণ করে রক্তদান করেন আমির। করোনার সময় মানুষের পাশে দাড়ান আমির ও তার সংগঠন রংধনু ব্লাড ড্রাইভার্সের সদস্যরা। তারা পুরো চান্দিনা এলাকায় অসুস্থদের জন্য ফ্রী অক্সিজেন সেবা প্রদান করেন। মাইকিং, লিফলেট ও মাক্স বিতরণ করেন অনেকদিন ধরে। পরিবেশ ভালো রাখতে গাছের অবদান অনস্বীকার্য। এই সত্য অন্যদের মত আমির ও জানেন। সে কারণে কুমিল্লা জেলার প্রতিটা উপজেলায় গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করেছেন সংগঠনের সদস্যদের মাধ্যমে। তিনি জানান গত পাচ বছরে এই গাছের সংখ্যা লাখ পেরিয়ে গেছে। তারা বিভিন্ন প্রোগ্রাম করে তার মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ করেছেন। এরমধ্যে বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছ গাছ। কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় একদল মানুষের নানান রকম বাজে কথা শুনেছেন তিনি। তবে এসব একদমই পাত্তা দেননি। তিনি বলেন, ‘ভালো কাজ করতে গেলে বাধা আসতেই পারে। তাই বলে চুপ করে বসে থাকা তো যায় না। কে কি বললো সেসব ভাবি না। মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারলে আমার খুব ভালো লাগে।’ গ্রামগঞ্জের অসহায় মানুষরা যেন নামমাত্র মূল্যে সঠিক চিকিৎসা সেবা পান। একটু হলেই তাদের জেলা সদরে ছুটতে না হয়। সেজন্য আমির একটি হাসপাতাল করতে চান। এটাই তার আগামী দিনের পরিকল্পনা। আরও পড়ুন দেউলিয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল ব্রিটিশদের সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলো কেএসকে

Share this post: