TheBangladeshTime

আয়ুষ্কাল শেষ ৫ দশক আগে, মরিচা ধরা লাইনেই চলছে উত্তরবঙ্গের রেলযোগাযোগ

2026-03-19 - 04:00

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজশাহী-আব্দুলপুর রেলপথটি বর্তমানে চরম জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথের ৩৫ কিলোমিটারই এখন মৃত্যুফাঁদ। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এই রুটে ট্রেনের গতিবেগ ৯৫ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৪০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয়, ভোগান্তিতে পড়ছেন হাজারো যাত্রী। সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্রিটিশ আমলের এই রেললাইনটির আয়ুষ্কাল ৫০ বছর আগেই শেষ হয়েছে। অধিকাংশ স্থানে কাঠের স্লিপার রোদ-বৃষ্টিতে পচে গেছে এবং লাইনে প্রয়োজনীয় পাথরের তীব্র সংকট রয়েছে। বর্তমানে তীব্র গরমে বা শীতে লাইনে ফাটল ধরলে তা কেবল ‘জোড়াতালি’ দিয়ে মেরামত করা হচ্ছে। ২০০০ সালে এই সিঙ্গেল লাইনটিকে ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্প নেওয়া হলেও দুই যুগেও তা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (ফিজিবিলিটি স্টাডি) গণ্ডি পার হতে পারেনি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রেললাইন ভেঙে যাওয়া কিংবা ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া এই ঈশ্বরদী-রাজশাহী রুটে নতুন কোনো ঘটনা না। গত ২-৩ বছরে ঘটে গেছে কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা। সচেতন ট্রেন চালক ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তা বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে হাজার হাজার ট্রেন যাত্রী। ২০২৫ সালে রাজশাহী থেকে পঞ্চগড়গামী বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস সরদহ রোড স্টেশন অতিক্রম করার পর রেললাইনের দুই ফুট ভেঙে যায়। স্থানীয় গ্রামবাসী রাতের আধাঁরে আলো জ্বালিয়ে ও লাল কাপড় নিয়ে রেলপথে দাঁড়িয়ে খুলনা থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস ট্রেনটিকে থামিয়ে দেন। না হলে ৭০০ যাত্রী নিয়ে ট্রেনটি দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতো। এই ঘটনায় তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। ভোগান্তিতে পড়ে ছয় যাত্রীবাহী ট্রেন। এরও আগে লোকমানপুর স্টেশন পাওয়ার আগে রেললাইন ভেঙেছিল ৷ তা দেখে স্থানীয় কয়েকজন লাল গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ট্রেনের চালক গতি থামিয়ে দেন। ঈশ্বরদী-রহনপুরগামী আন্তঃনগর ৫৭ নাম্বার কমিউটার এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছিল দেড় শতাধিক ট্রেন যাত্রী। এছাড়া সরদহ রেলস্টেশনের কাছে ১০ ইঞ্চি রেললাইন ভেঙে যায়। এক কৃষক বিষয়টি দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের ডেকে কাছে থাকা লাল গামছা উড়িয়ে রাজশাহীগামী ‘বরেন্দ্র এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি থামিয়ে দেন। এতে ট্রেনের প্রায় ৫০০ জন যাত্রী প্রাণে বেঁচে যায়। তার আগে দুই কৃষকের বুদ্ধিমত্তায় অল্পের জন্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান ঢাকাগামী ননস্টপ ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ৮৫০ জন রেলযাত্রী। রেললাইন ভাঙা দেখে লাল গামছা উড়িয়ে নিশানা তৈরি করেন তারা। ওই লাল নিশানা দেখে চালক ট্রেন থামিয়ে দেন। আড়ানী রেলব্রিজের লাইনের ১৫ ইঞ্চি ভেঙে যায়। সেখানকার অস্থায়ী গেটকিপার বিষয়টি দেখতে পেয়ে লাল কাপড় উঁচিয়ে উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেন থামিয়ে যাত্রীদের রক্ষা করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী থেকে আব্দুলপুর পর্যন্ত রেললাইনটি সর্বশেষ বড় ধরনের সংস্কার করা হয় ১৯৬২ সালে। এরপরে আর কোনো সংস্কার কাজ হয়নি। ৪৫ কিলোমিটার এই রেললাইন সিঙ্গেল ব্রডগেজ থেকে ডাবল লাইনে উত্তীর্ণ করতে কাজ শুরু করা হয় ২০০০ সালের দিকে। দুই যুগেও সেই প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত কোনো অগ্রগতি নেই। এখনও প্রকল্পটি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে জরাজীর্ণ রেললাইনে অনেক কম গতিতে ট্রেন চলছে। পাকশী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) হাসিনা খাতুন জানান, পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের আওতায় এই রেলপথ দিয়ে ১৩ জোড়া আন্তঃনগর, ৪ জোড়া মেইল ও ৩ জোড়া লোকাল রাজধানী ঢাকাসহ উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে চলাচল করে ৷ পুরোনো এই রেললাইনে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা না হয়, তা এড়াতে রেললাইনগুলো দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। রাজশাহী সহকারী প্রকৌশলী (এইএন) বাবুল হোসেন জানান, অনেক আগের পুরোনো রেললাইন। ব্রিটিশ আমলের রেললাইন হওয়ায় এই রেলপথে রেল কর্মচারীরা সবসময় সতর্ক থাকে। কোথাও তাৎক্ষণিক দুর্ঘটনা ঘটলে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করা হচ্ছে। পাকশী বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ নাজিব কায়সার জানান, আবদুলপুর-রাজশাহী রেলরুটে রেললাইন আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যে ৫০ বছর অতিক্রম করেছে। এই রুটে নতুন লাইন বসানো এখন সময়ের দাবি। বর্তমান সরকারের রেলপথ মন্ত্রণালয় নির্দেশক্রমে ডাবল লাইন প্রজেক্টের ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ জোরেশোরে শুরু হয়েছে। সেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগ। পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবু হেনা মোস্তফা জানান, সড়কপথের চেয়ে মানুষ ট্রেনে চড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। স্বল্প খরচে কম ভোগান্তি হওয়ার কারণে কিন্তু রাজশাহী থেকে সারা দেশে মানুষ ট্রেনে চলাচল করে। ঈদকে সামনে রেখে নিরাপদে ট্রেন চালানো হচ্ছে। দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু হবে। শেখ মহসীন/কেএইচকে/এমএস

Share this post: