TheBangladeshTime

নতুন সরকারের যে চ্যালেঞ্জগুলো এখনই মোকাবিলা করতে হবে

2026-03-03 - 04:13

দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গণরায়ের প্রত্যাশা, পরিবর্তনের অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব- সব মিলিয়ে দলটির সামনে এখন এক কঠিন সময়। বিজয়ের উচ্ছ্বাস যত দ্রুত ম্লান হয়, বাস্তবতার চাপ তত দ্রুত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই প্রশ্ন হলো- কোন চ্যালেঞ্জগুলো এখনই মোকাবিলা করা জরুরি? আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সরকার পরিচালনার প্রথম শর্তই হলো স্থিতিশীলতা। নির্বাচনের পরপরই অনেক সময় প্রতিহিংসা, সহিংসতা বা প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার প্রবণতা দেখা যায়। এই পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে উন্নয়ন ও সংস্কারের এজেন্ডা বাধাগ্রস্ত হবে। সবার আগে প্রয়োজন প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও পেশাদারভাবে কাজে লাগানো, দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এবং স্পষ্ট বার্তা দেওয়া- আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। বিরোধী মতকে দমন নয়, বরং গণতান্ত্রিক পরিসরে স্থান দেওয়া- এটাই একটি দায়িত্বশীল সরকারের পরিচয়। অর্থনৈতিক চাপ ও মূল্যস্ফীতি নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে এক জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের নীতি-অসামঞ্জস্যের প্রভাবে অর্থনীতির ওপর বহুমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতিতে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে সরকারের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। বর্তমানে খাদ্য ও জ্বালানি খাতে মূল্য বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে প্রায় সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। আয় বৃদ্ধি না পেয়ে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাস্তব আয় কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডলারের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সমস্যা। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি কঠোর করার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। সুদের হার সমন্বয়, বাজারে তারল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে এই সংকট পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত রাজস্ব ও বাণিজ্যনীতি। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে ঋণচুক্তি বাস্তবায়নের শর্তও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। ভর্তুকি কমানো, কর আদায় বাড়ানো এবং আর্থিক খাতে সংস্কারের মতো পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হলেও স্বল্পমেয়াদে জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাই সরকারকে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল নিতে হবে- একদিকে সংস্কার, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা। রাজস্ব ঘাটতি ও উন্নয়ন ব্যয়ের চাপও বড় সমস্যা। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। কর ফাঁকি, অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা রাজস্ব ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে ডিজিটালাইজেশন ও স্বচ্ছতা জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। কৃত্রিম সংকট, মজুদদারি ও সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সরবরাহ চেইন উন্নত করা এবং ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিতরণ কার্যক্রম বিস্তৃত করা দরকার। নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য টিসিবি কার্যক্রম ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও কার্যকর করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আস্থা পুনর্গঠন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে না। নতুন সরকারের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ- একদিকে তাৎক্ষণিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার। ক্ষমতায় আসা যত সহজ, ক্ষমতা ধরে রেখে সুশাসন নিশ্চিত করা তত কঠিন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনগণ পরিবর্তন চায় কিন্তু সেই পরিবর্তন হতে হবে দৃশ্যমান, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক সংস্কার- এই চারটি খাতেই যদি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে আস্থা ফিরবে। অন্যথায়, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাকই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় সংকট। অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠতে সুসমন্বিত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য। মূল্যস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে, তবে নতুন সরকার জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে। আর সেই আস্থাই হবে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। তাই, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি জোরদার, কৃষি উৎপাদনে প্রণোদনা এবং দুর্নীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা সিন্ডিকেট ভাঙার কার্যকর উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংস্কার ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের ঘাটতি বহু দিনের সমস্যা। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়তে হলে আর্থিক খাতকে সুসংগঠিত ও স্বচ্ছ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নীতিনির্ধারণ- এসব বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) খাত আজ অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জে বিপর্যস্ত। অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। এসএমই ফাউন্ডেশন-এর তথ্য বলছে, দেশে শিল্প প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশই এসএমই খাতভুক্ত- যা মোট কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য অংশ জোগান দেয়। ফলে এই খাতের সংকট মানেই সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়া। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ সুদের হার, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ডলার সংকট এবং বাজারে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস- সব মিলিয়ে এসএমই উদ্যোক্তারা টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছেন। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে, অনেকেই ঋণের বোঝায় জর্জরিত। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিছুটা ধাক্কা সামাল দিতে পারলেও ক্ষুদ্র-উদ্যোক্তারা তেমন সক্ষমতা রাখেন না। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারাই। এ অবস্থায় সরকারের দায়িত্ব কেবল নীতিগত ঘোষণা দেওয়ায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; প্রয়োজন বাস্তব ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ। সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণ প্রদান, কর-রেয়াত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার, এবং বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা- এসব উদ্যোগ জরুরি। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর ব্যবস্থাও করতে হবে। এসএমই খাত ঘুরে দাঁড়ালে অর্থনীতির চাকা নতুন করে গতি পাবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্ত ভিত পাবে। তাই জাতীয় স্বার্থেই এখন সময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর। সরকার যদি কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করে, তবে এসএমই খাত আবারও দেশের উন্নয়নযাত্রায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা জনগণের অন্যতম প্রত্যাশা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তবে কঠোরতা দেখাতে হবে। ক্ষমতার পরিবর্তন যেন কেবল মুখ বদলের রাজনীতি না হয়, বরং ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বড় বাধা। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না, মানুষের আস্থা নষ্ট করে এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়ায়। তাই টেকসই উন্নয়ন ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। বিশেষ করে, দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্বে নিয়োজিত। তবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা নির্ভর করে তার স্বাধীনতা, সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে দুর্নীতি কমানো কঠিন। সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন। সরকারি ক্রয়, নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প ও ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল পদ্ধতি সম্প্রসারণ জরুরি। ই-গভর্ন্যান্স ও অনলাইন সেবা বাড়ালে মধ্যস্বত্বভোগী কমে এবং অনিয়মের সুযোগ সংকুচিত হয়। একই সঙ্গে তথ্য অধিকার আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করলে নাগরিকদের নজরদারি বাড়ে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়। দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, শক্তিশালী সংসদীয় তদারকি এবং স্বাধীন গণমাধ্যম সুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের সচেতন অংশগ্রহণও প্রয়োজন। দুর্নীতিকে সামাজিকভাবে ঘৃণিত ও অগ্রহণযোগ্য সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বিষয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে সততা ও নৈতিকতার চর্চা জোরদার করতে হবে। যখন শাস্তির ভয় ও নৈতিক দায়বদ্ধতা একসঙ্গে কাজ করবে, তখনই সুশাসনের ভিত্তি মজবুত হবে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনই পারে ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে। প্রশাসনিক সংস্কার প্রশাসনকে কার্যকর, দক্ষ ও জনবান্ধব না করতে পারলে সরকারের নীতি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হবে না। দীর্ঘদিনের দলীয়করণ ও প্রভাবের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদায়ন ও পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতার কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। যুবসমাজ ও কর্মসংস্থান বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ। এই বিশাল যুবশক্তি দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে, যদি তাদের জন্য পর্যাপ্ত ও টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি এবং সীমিত শিল্পায়ন আজ যুব সমাজের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করেও উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না। আবার শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে বাজার চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ, স্টার্ট-আপ সহায়তা এবং উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ বাড়াতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর যুবকদের প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ সহায়তার মাধ্যমে কর্মসংস্থানে যুক্ত করার কাজ করছে। এসব কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও ফলপ্রসূ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। যুব সমাজকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দক্ষতা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তুলতে পারলে যুবকরাই অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে। টেকসই কর্মসংস্থানই পারে যুবসমাজের শক্তিকে দেশের উন্নয়নে রূপান্তর করতে। পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক ভারসাম্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বৈদেশিক বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ- এসব মোকাবিলায় কূটনৈতিক দক্ষতা এখন বড় পরীক্ষা। সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবাধিকার ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কোনো ধরনের উস্কানি, বিভাজন বা বিদ্বেষমূলক রাজনীতি যাতে মাথাচাড়া না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। মানবাধিকার রক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা- এগুলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক মানদণ্ড। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোই এখন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশার মানদণ্ড। অবাস্তব প্রতিশ্রুতি বা সময়ক্ষেপণ আস্থার সংকট তৈরি করবে। তাই অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, সময়সীমা নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে জনগণকে সম্পৃক্ত রাখা জরুরি। ক্ষমতায় আসা যত সহজ, ক্ষমতা ধরে রেখে সুশাসন নিশ্চিত করা তত কঠিন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনগণ পরিবর্তন চায় কিন্তু সেই পরিবর্তন হতে হবে দৃশ্যমান, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক সংস্কার- এই চারটি খাতেই যদি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে আস্থা ফিরবে। অন্যথায়, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাকই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় সংকট। আমি মনে করি, এখন সময় রাষ্ট্রগঠনের, রাজনৈতিক সংঘাতের নয়। এখন সময় কথার নয়, কাজের। বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ বড় কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা ও দৃঢ় সদিচ্ছা থাকলে সেই চ্যালেঞ্জই হতে পারে সাফল্যের ভিত্তি। লেখক : কলাম লেখক ও শিল্পোদ্যোক্তা। এইচআর/জেআইএম

Share this post: