TheBangladeshTime

ব্যাগের স্তূপে খেলনা বন্দুক, ট্রিগার ছোঁয়ার শিশুটি নেই

2026-03-26 - 11:01

বারান্দায় ডুবে যাওয়া বাস থেকে পাওয়া ব্যাগের স্তূপ। ওপরে একটি লাল-কালো নতুন খেলনা বন্দুক। আছে সবজিভর্তি বস্তাও। ঈদের ছুটি শেষে হয়তো গ্রাম থেকে কম দামে সবজি কিনে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলেন কেউ। এক পায়ের কেডস এখনো ছড়িয়ে আছে পন্টুনে। সবই আছে, শুধু মানুষগুলো সবাই বেঁচে আছে কি না এখনো জানে না কেউ। ব্যাগের স্তূপের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ। এখন পর্যন্ত কোনো মেয়ে ভ্যানিটি ব্যাগের দাবিতে আসেননি। দীর্ঘক্ষণ পানিতে থাকায় প্রত্যেক ব্যাগেই লেগে আছে কাদামাটি। বড় ভাইয়ের ব্যাগ নিতে আসা ছোট বোন তাসলিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাসের ভেতর থাকলে আমার ভাইয়ের লাশ নেওয়া লাগতো। ভাই আগেই বাস থেকে নেমে যান। ব্যাগ ছিল বাসের মধ্যে। ব্যাগে থাকা ভাইয়ের ছবি দেখে ব্যাগটি পেয়েছি।’ খেলানা বন্দুকটি আছে, শিশুটি নেই তাসলিমার ভাইয়ের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিজের চোখে বাস পানিতে পড়া দেখে আমার ভাই কিছুটা অসুস্থতা বোধ করছেন গতকাল থেকেই। তিনি বাড়িতে ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছেন।’ ৩ নম্বর পন্টুনের যেখানে বাস নদীতে পড়ে যায় সেখানে দেখা মেলে একটি জুতা। আরেকটি জুতার খোঁজ মেলেনি। হয়তো তাড়াহুড়া করেই একটি জুতা ফেলেই কোনো একজন যাত্রী নেমে পড়েন। অথবা কোনো একজন নিহত যাত্রীর জুতা হতে পারে এটি। স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, শুনেছি যাত্রী ছিল ৫০ জনের বেশি। এখন পর্যন্ত ব্যাগ নিয়েছেন মাত্র তিনজন। এখনো ২৫-৩০টি ব্যাগ রয়েছে এখানে। হয়তো নিহত ব্যক্তির ব্যাগ হতে পারে এগুলো। যাদের পরিবারের সদস্যরা নিহতের দাফন-কাফন নিয়ে ব্যস্ত। বাস থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যাগ শিশুর খেলনা বন্দুকে হয়তো জড়িয়ে আছে কতশত আবেগ। প্রতিটি ব্যাগে হয়তো জমানো কত মান-অভিমান-ভালোবাসার গল্প। সব গল্পের হয়ে গেছে সলিল সমাধি। এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ২৬ জনের মরদেহের মধ্যে আটজন পুরুষ, ১১ জন নারী এবং সাতজন শিশু। এই সাত শিশুর কোনো একজন হয়তো ঈদ মেলা থেকে আবদার করে কিনে নিয়েছিল বন্দুকটি। তার ছোট্ট হাত আর কখনো স্পর্শ করবে না বন্দুকটির ট্রিগার। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটের পন্টুন থেকে যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় উদ্ধার হয়েছে সৌহার্দ্য বাসটি। বাসে থাকা ব্যাগ উদ্ধার করে দৌলতদিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে। প্রমাণসাপেক্ষে ব্যাগ হস্তান্তর করছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত তিনজনকে তিনটি ব্যাগ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ব্যাগগুলো পড়ে আছে পুলিশ ফাঁড়ির বারান্দায়। পুলিশ বলছে, প্রমাণসাপেক্ষে ব্যাগ হস্তান্তর করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত তিনজন ব্যক্তি ব্যাগ নিয়েছেন। বাকিগুলো পড়ে আছে। বৃহস্পতিবার সকালে খবর পেয়ে ব্যাগ নিতে আসেন আবুল কালাম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘খবর পেয়ে এসেছি। ব্যাগ পেয়েছি। ব্যাগে থাকা টাকা ও সার্টিফিকেট পেয়েছি। তবে পানিতে ভিজে গেছে। এখন রোদে শুকাবো।’ তিনি বলেন, ‘গতকাল বিকেলে দৌলতদিয়া থেকে সৌহার্দ্য বাসে উঠি। বাস পানিতে পড়ে যাওয়ার দুই মিনিট আগে নেমে যাই। ব্যাগ বাসেই ছিল।’ আরও পড়ুন নিহত ২৬ জনের পরিচয় মিলেছে, ১৮ জনই রাজবাড়ীর মৃত্যুর মুখ থেকে মাত্র ৫ সেকেন্ডের ব্যবধানে যেভাবে বেঁচে ফিরলেন খাইরুল মা ও ভাগনের পর জাবি শিক্ষার্থী রাইয়ানের মরদেহ উদ্ধার ব্যাগের ভেতরে থাকা ছবি ও তসবি দেখে ব্যাগ শনাক্ত করেন তাসলিমা আক্তার। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার বড় ভাই বাসে ছিল। বাস নদীতে পড়ার আগেই ভাই নেমে হেঁটে ফেরিতে উঠতে থাকেন। এরপর বাস পানিতে পড়ে গেলে ব্যাগও পড়ে যায়। এরপর আজ পুলিশের কাছে এসে ব্যাগের ভেতরে থাকা তসবিহ ও ভাইয়ের ছবি দেখে ব্যাগ শনাক্ত করি।’ দৌলতদিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল তছলুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘দুপুর পর্যন্ত তিনজন ব্যাগ নিয়েছেন। বাকিগুলো আমাদের কাছে আছে। প্রমাণসাপেক্ষে সবাইকে ব্যাগ বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’ পড়ে থাকা জুতা বুধবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। তিন নম্বর পন্টুনে বাসটি নদীতে পড়ে যায়। ঘটনার পর ১১ জন যাত্রী সাঁতরে পাড়ে ওঠেন। ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, বুধবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রায় ৬০ ফুট গভীরে বাসটি ডুবে যায়। দীর্ঘ সময় অভিযান চালিয়ে রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে বাসটি উদ্ধার করা হয়। বাসটিতে আনুমানিক ৪০ জন যাত্রী ছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয়দের সহায়তায় ৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও পাঁচজন নারী। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক দুই নারীকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ জনে। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার করেছে ২৩ জনকে, স্থানীয়দের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া দুজনকে হাসপাতালে মৃত ঘোষণা করা হয় এবং নৌবাহিনীর ডুবুরিরা উদ্ধার করেন একজনকে। টিটি/এএসএ

Share this post: