ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ আমিরাতের ব্যবসায়ীরা
2026-03-07 - 07:54
ইরানের অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে চরম সংকটে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী নীতির কঠোর সমালোচনা শুরু করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচিত। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গেও বিভিন্ন ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। কিন্তু সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রভাবিত করতে পারেনি বলে মনে করা হচ্ছে। দুবাইয়ের প্রখ্যাত হোটেল ব্যবসায়ী ও বিলিয়নেয়ার খালাফ আল হাবতুর গত ৫ মার্চ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে লেখেন, ‘আমাদের অঞ্চলকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে টেনে নেওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? কোন ভিত্তিতে আপনি এই বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিলেন? আপনি জিসিসি এবং আরব দেশগুলোকে এমন এক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন যা তারা নিজেরা বেছে নেয়নি।’ বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থা ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি সংযুক্ত আরব আমিরাত। যদিও অধিকাংশ হামলা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিহত করা হয়েছে, তবুও এই সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এই অঞ্চলের বড় আকর্ষণ ছিল। আরও পড়ুন>> দুবাইয়ে মার্কিন দূতাবাসে হামলা ইরানের হামলা/ দুবাইয়ের বিমানবন্দর ও বুর্জ আল আরব হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত আমিরাতে অ্যামাজনের একাধিক ডেটা সেন্টারে ‘ড্রোন হামলা’ ইরানের হামলা: উপসাগরীয় দেশগুলো কি এবার যুদ্ধে জড়াবে? দুবাইয়ের আরেক শীর্ষ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চলমান অস্থিরতার কারণে বিভিন্ন খাতে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং অনেক ব্যবসার সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হচ্ছে। যুদ্ধ এক মাসের বেশি দীর্ঘ হলে অনেক কোম্পানিকে উৎপাদন ও সেবা কার্যক্রম নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। যদিও আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা বাহিনী অধিকাংশ ইরানি হামলা প্রতিহত করছে, তবুও যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। ২০২২ সালের মে মাসের পর চলতি সপ্তাহে দুবাইয়ের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন খাত। হাজার হাজার যাত্রী আটকা পড়েছেন। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে আমিরাত প্রতি ঘণ্টায় ৪৮টি ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ‘নিরাপদ আকাশপথ’ চালুর চেষ্টা করছে। এছাড়া, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। বিনিয়োগ প্রত্যাহারের আশঙ্কা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গত বছরের সফরে আমিরাত প্রায় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এছাড়া কাতার ও সৌদি আরব মিলে আরও দুই ট্রিলিয়ন (দুই লাখ কোটি) ডলার বিনিয়োগের কথা ছিল। তবে বর্তমান অস্থিতিশীলতায় অনেক উপসাগরীয় দেশ এই বিশাল বিনিয়োগ পুনর্বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গেও আমিরাতের গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ট্রাম্প অর্গানাইজেশন দুবাইতে টাওয়ার নির্মাণ করছে। আবুধাবির একটি প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে যুক্ত একটি স্টেবলকয়েনে দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক বিশ্লেষক রায়ান বোল মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলো জানতো, ট্রাম্প নিজের মতেই চলবেন। কিন্তু তিনি যে তাদের স্বার্থকে এত বড় ঝুঁকিতে ফেলবেন, তা ছিল অভাবনীয়। ক্ষোভ ইরানের ওপরও আমিরাতের ব্যবসায়ীরা যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করলেও ইরানের ওপরও সমানভাবে ক্ষুব্ধ। আমিরাত তার আকাশপথ বা ভূখণ্ড মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না দিলেও তেহরান কেন হামলা চালাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আবুধাবির শীর্ষ কর্মকর্তারা। কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, বিনিয়োগ দিয়ে ওয়াশিংটনে হয়তো সুসম্পর্ক কেনা যায়, কিন্তু সংকটের সময় নীতি নির্ধারণে ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতা পাওয়া যায় না। বিশেষ করে যখন হোয়াইট হাউজ মনে করে যে তাদের আধিপত্য ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সময় এসেছে। সূত্র: ব্লুমবার্গ কেএএ/