TheBangladeshTime

নারী নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ: আইন আছে, বাস্তবতা কতটা নিরাপদ?

2026-03-08 - 07:45

ডালিয়া রহমান (ছদ্ম নাম) স্বনামধন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করার পর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেছিলেন। শুরুতে চাকরিটা তার পছন্দের ছিল—দায়িত্বপূর্ণ, চ্যালেঞ্জিং এবং শিক্ষণীয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এক সহকর্মীর অযাচিত মন্তব্য ও অবাঞ্ছিত আচরণ তার কর্মজীবনে মানসিক চাপ তৈরি করতে থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ডালিয়া বাধ্য হন চাকরি ছেড়ে দিতে এবং আবারও স্নাতকোত্তর পড়াশোনায় মন দিতে। স্নাতকোত্তর শেষ করলেও, তিনি আর চাকরিতে পুনরায় প্রবেশের মানসিক শক্তি পাননি। অন্যদিকে, বীনা পারভীন (ছদ্ম নাম) উত্তরার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। স্বামী একটি হত্যা মামলার আসামি হয়ে জেলে থাকায় সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য বীনা একমাত্র উপার্জনের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য ছিলেন। কিন্তু স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিয়মিত সুপারভাইজারের নোংরা ইঙ্গিত ও যৌন হয়রানির শিকার হন তিনি। বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে অন্য কারখানায় যোগ দেন। ডালিয়া ও বীনার এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নারীর কর্মজগতে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের চ্যালেঞ্জের এক বাস্তব উদাহরণ। দেশে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি রোধের জন্য আইন এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবায়ন প্রায় নেই বললেই চলে। ফলস্বরূপ, এ ধরনের নিপীড়ন বেড়েই চলেছে, আর অভিযুক্তরা প্রায়শই পার পেয়ে যাচ্ছেন। ডালিয়া জানান, তার কর্মক্ষেত্রে কোনো যৌন হয়রানি বিরোধী কমিটি ছিল না। ফলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কোনো নিরাপদ পথও ছিল না। বীনা বলছেন, তার কারখানায় একটি কমিটির কাছে অভিযোগ করার সুযোগ থাকলেও, তিনি ঝুঁকি নিতে চাননি। পাশাপাশি তিনি আইনি সুরক্ষা সম্পর্কেও জানতেন না। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ নারী পোশাকশ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মৌখিক, শারীরিক বা যৌন হয়রানির শিকার হন। একই বছর নয়টি শ্রমিক সংগঠন পরিচালনা ও সলিডারিটি সেন্টারের পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৪৫ শতাংশ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা বা হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এছাড়া ২০২১ সালে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, ৮৪ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্র এবং জনসমাগম স্থানে যেমন স্কুল, রাস্তায়, গণপরিবহন এবং ঘরে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়াও আরও অনেক নারী অনলাইনে যৌন হয়রানির সম্মুখীন হন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দুই দশকে নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্পোরেট ও সেবা খাতসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীরা এখন দৃশ্যমান। কিন্তু উপস্থিতি বাড়লেও নিরাপত্তা ও মানসম্মত কর্মপরিবেশ এখনও অনিশ্চিত। হেনস্থা, বৈষম্য এবং মানসিক চাপের মোকাবিলায় কতটা কার্যকরভাবে নীতি ও ব্যবস্থা বাস্তবে কাজ করছে, তা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে অধ্যাদেশের খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেয় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। উল্লেখ্য, নতুন এই অধ্যাদেশগুলোর ভিত্তি হলো বিদ্যমান পারিবারিক সহিংসতা আইন এবংবাংলাদেশ হাইকোর্টের ২০০৯ সালে দেওয়া কর্মক্ষেত্রও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ১১ দফা নির্দেশনা। জানা যায়, কর্মক্ষেত্র-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৬-এর খসড়ায় চারটা অধ্যায় এবং ২০টি ধারা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক হচ্ছে, এই খসড়ায় শারীরিক, মৌখিক, মানসিক, ইঙ্গিতপূর্ণ ও ডিজিটাল স্পেসের আচরণকে যৌন হয়রানি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ অনুযায়ী, নারী নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি মৌখিকভাবে, লিখিতভাবে বা অনলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ করতে পারবে এবং অভিযোগ গ্রহণ করার ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম জাগো নিউজকে বলেন, এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে নারীরা অংশ নিচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবে কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতা কমার বদলে বরং বাড়ছে। তিনি বলেন, প্রত্যেক কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তা নেই; কোথাও থাকলেও কার্যকর নয়। সম্প্রতি এক গণমাধ্যমকর্মী সহকর্মীর যৌন হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহত্যা করলেও অভিযুক্তের বিচার না হওয়ার ঘটনাকে তিনি বিচারহীনতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। সীমা মোসলেম বলেন, নারী শুধু কর্মক্ষেত্রে নয়, সামাজিক পরিসরের সব ক্ষেত্রেই নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। নারীর প্রতি ব্যবহৃত ভাষা ও আচরণও অনেক ক্ষেত্রে মর্যাদাহানিকর ও বর্বরতাপূর্ণ। তার মতে, নারীর অগ্রগতির সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্র সমানভাবে পাশে দাঁড়াতে না পারা, সমতার দৃষ্টিভঙ্গির অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিই কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা বাড়ার বড় কারণ। সীমা মোসলেম আরও বলেন, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক—দুই ক্ষেত্রেই নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি রয়ে গেছে, যা নারীর অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, নারী শ্রমশক্তির সংখ্যা ২০২৩ সালের ২৫.৩ মিলিয়ন থেকে কমে ২০২৪ সালে ২৩.৭ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত ‘জেন্ডারভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ১৮ লাখই নারী, যা মোট চাকরি হারানো মানুষের ৮৫ শতাংশ। বর্তমানে মাত্র ১৯ শতাংশ নারী শ্রমবাজারে সক্রিয়, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরিন পারভীন হক জাগো নিউজকে বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিপীড়নের শিকার হওয়া শুধু দুঃখজনক নয়, বরং মর্মান্তিক; কারণ এমন সহিংসতা নারীদের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে—যার উদাহরণ আমরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় দেখেছি। তার মতে, কর্মক্ষেত্রকে নিরাপদ করা রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কারণ অর্থনৈতিক প্রয়োজনের পাশাপাশি শিক্ষা ও আত্মপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকেও নারীরা এখন কর্মক্ষেত্রে আসছেন। তারা শুধু উপার্জনের জন্য নয়, নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলতেও পেশাজীবনে যুক্ত হচ্ছেন। শিরিন হক বলেন, নারীরা নানা বাধা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে নিজেদের জায়গা তৈরি করার জন্য লড়াই করছেন। তবে বাস্তবতা হলো—অনেক ক্ষেত্রেই কর্মক্ষেত্র এখনো নিরাপদ নয়। ফলে সাধারণ কর্মজীবী নারীরা আরও বেশি অসহায় অবস্থায় থাকেন; অনেক সময় তারা প্রতিবাদের ভাষাও খুঁজে পান না এবং সামাজিক লজ্জা বা চাপের কারণে অভিযোগ জানাতেও নিরুৎসাহিত হন। রাষ্ট্রের পাশাপাশি অধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করা এবং নারীকে সমান মর্যাদায় দেখার মানসিকতা পরিবর্তনে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনসহ সবার ভূমিকা রাখা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নারী দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘সরকার নারীর নিরাপত্তা বিধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সাইবার বুলিং এবং অনলাইনে নারীর বিরুদ্ধে হয়রানি বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন নারীর অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।’ তিনি আরও বলেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে ঘরে বাইরে সামগ্রিক উন্নয়নের সুফল আসবে না। তার সরকার শিক্ষা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও রাজনীতিসহ সর্বস্তরে নারীর সক্রিয় এবং কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতে অঙ্গীকারবদ্ধ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। জেপিআই/এমএমএআর

Share this post: