নেপালে ভোটের প্রচারণায় যে কৌশলে বাজিমাত করেছেন বালেন্দ্র শাহ
2026-03-08 - 07:34
নেপালের নির্বাচনের পর ভোট গণনা এখনো চলছে। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত নাম বালেন্দ্র শাহ এবং তার দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। র্যাপার থেকে রাজনীতিতে আসা বালেন্দ্র শাহ নির্বাচনের শুরুতেই বেশ ভালো ব্যবধানে এগিয়ে আছেন এবং তিনিই হতে যাচ্ছেন দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। নেপালের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের উচ্ছেদ করে ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহকে ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার প্রচারণার সূচনা হয়েছিল পশ্চিম কাঠমান্ডুর একটি ছয়তলা ভবন থেকে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের জেরে ক্ষমতা হারান নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি। অপরদিকে এবারের নির্বাচনে জেন-জিদের পছন্দের প্রার্থী বালেন্দ্র শাহ ভোটে জয়ী হতে যাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের মধ্যে ১৬৫টি আসনের সরাসরি এবং ১১০টি আসনের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বালেন্দ্র শাহর প্রচার কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে রয়টার্স আরএসপির ছয়জন নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। জানা গেছে, প্রচারণার বড় অংশই সমন্বয় করা হয়েছে বালাজু এলাকায় অবস্থিত দলটির সদর দপ্তরের ওপরের তিনটি ফ্লোর থেকে। আর প্রচারণার খরচের বড় অংশের জোগান এসেছিল প্রবাসী নেপালিদের কাছ থেকে। আরএসপির জাতীয় প্রচারণা দলের সদস্য বিজ্ঞান গৌতম বলেন, মাঠ পর্যায়ের মানুষের কাছ থেকে আমরা যে সমর্থন এবং ভালোবাসা পেয়েছি তাতে আমরা অভিভূত। প্রতি আট দিনে একটি ভাষণ আরএসপির রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু ছিল গবেষণা, কৌশল এবং ডকুমেন্টেশন বিভাগ, যা ১১ সদস্যের একটি বোর্ড দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। তারা ৩০০ দলীয় কর্মীকে তিনটি জাতীয় দলে বিভক্ত করেন এবং পৃথক প্রার্থীদের নেতৃত্বে ছোট দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। তিনজন নেতা জানিয়েছেন, জাতীয় পর্যায়ের এসব দল নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ, সমাবেশ আয়োজন, অনলাইন কনটেন্ট তৈরি ও ব্যবস্থাপনা এবং সারা দেশ থেকে প্রচারণা ও জনমতের তথ্য সংগ্রহের কাজ করেছে। ভোটের আগে দলটি খুব হিসাবি একটি কৌশলও অনুসরণ করেছে। বালেন্দ্র শাহ প্রতি আট দিনে একটি করে বড় ভাষণ দিয়েছে এবং প্রতিটি সমাবেশের বার্তা ৬৬০ সদস্যের সোশ্যাল মিডিয়া টিমের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরএসপি প্রতিদিন পাঁচটি থেকে সাতটি জেলায় রোড শো করেছে। একই দিনে নেপালের সাতটি প্রদেশের কোনো একটিতে বালেন্দ্র শাহ ভোটারদের সঙ্গে দেখা করতেন এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির এক নেতা বলেন, আপনি যদি বারবার বক্তৃতা দিতেই থাকেন তাহলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যায়। আমরা বিরোধী দলগুলোকে আগে কিছু বিষয় উত্থাপন করতে দিয়েছি তারপর একবারেই জবাব দিয়েছি। এতে আমাদের বার্তাটা পরিষ্কার থাকে। কেন্দ্রীভূত প্রচারণা ব্যবস্থা এবং বৃহৎ অনুষ্ঠানগুলো সরাসরি দলের অর্থায়ন থেকেই করা হয়েছে। দলটির নেতারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা প্রবাসী নেপালিদের কাছ থেকে তারা বড় অঙ্কের অনুদান পেয়েছেন। সমতল থেকে পাহাড়ে নির্বাচনের আগে গত ডিসেম্বরে আরএসপিতে যোগ দেওয়ার আগে বালেন্দ্র শাহ ছিলেন রাজধানী শহর কাঠমান্ডুর মেয়র। ২০২২ সালে তিনি এই পদে নির্বাচিত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেপালের অন্যতম জনপ্রিয় র্যাপ তারকা হিসেবে তার লাখ লাখ অনুসারী ছিল। সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। গত ১৯ জানুয়ারি নেপালের মাধেশ প্রদেশের রাজধানীতে এক সমাবেশে আরএসপির প্রতিষ্ঠাতা ও টিভি উপস্থাপক থেকে রাজনীতিক হওয়া রবি লামিছানের সঙ্গে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বালেন্দ্র শাহ হাজারো মানুষের সামনে বলেছিলেন, একজন মাধেশি ছেলে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছে। মাধেশ ও আশপাশের তেরাই সমতল অঞ্চল নেপালের সবচেয়ে জনবহুল এলাকা হলেও দেশটির রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করছে কাঠমান্ডু ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতারা। বালেন্দ্র শাহর জানুয়ারির ওই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়। দলটির তিন নেতা জানান, এর মাধ্যমে সেই ধারণাটি জোরদার হয় যে বালেন্দ্র শাহই হতে পারেন সমতল থেকে উঠে আসা প্রথম প্রধানমন্ত্রী। আরএসপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বীরেন্দ্র কুমার মেহতা বলেন, আমাদের কাছে এ বিষয়টি পরিষ্কার ছিল যে দেশটি পুরোনো দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়েছে এবং মানুষ বালেন্দ্র শাহ ও রবি লামিছানের মতো তরুণ নেতাদের মধ্যে আশার আলো দেখতে পেয়েছে। দল এটাকে একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। বালেন্দ্র শাহ ঝাপা-৫ আসনে লড়াই করছেন। এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের নেতা কে পি শর্মা অলির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। গত সেপ্টেম্বরে গণ-অভ্যুত্থানে অলির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। নেপালের এই গ্রামীণ এলাকাতেও বালেন শাহ তার নির্বাচনী প্রচারণার অপ্রচলিত কৌশল বজায় রেখেছেন। সংবাদমাধ্যমে কাছে সাক্ষাৎকার দেওয়ার চেয়ে ভোটারদের কাছে যাওয়া এবং তাদের সঙ্গে কথা বলাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। টিটিএন