TheBangladeshTime

চন্দনারা কই?

2026-03-24 - 03:11

ওদের ডাক একটু ভিন্ন সুরের। শুনে মনে হবে, এটি আমাদের দেশেরই অন্য কোনো প্রজাতির টিয়া হবে। ঠিকই ধরেছেন, চন্দনা টিয়ার কথা বলছি। চন্দনা টিয়া বাংলাদেশের মহাবিপন্ন আবাসিক পাখি। বাসা করার জন্য বড় গাছ, ফোকর ওয়ালা গাছ এদের বেশ প্রিয়। এ টিয়া প্রজাতি কেবল দেশের কয়েকটি জেলায় দেখা যেত। চন্দনা টিয়া মূলত ঘাস-সবুজ রঙের পাখি। কাঁধে আছে মেরুন পট্টি। লম্বা লেজওয়ালা পাখি। চন্দনা টিয়া আকারে কাকের চেয়েও বড়। টিয়া প্রজাতির মধ্যে চন্দনা সবচেয়ে বড় টিয়া। এর দৈর্ঘ্য ৫৩ সেন্টিমিটার। ছেলে পাখি দেখতে মেয়ে পাখির চেয়ে আকারে বড়। ছেলে পাখির গলার পেছনে ও ঘাড়ের পাশে সুস্পষ্ট লালচে-গোলাপি বর্ণের বলয়সহ পুরো দেহ সবুজ। ডানার পালক ও ঢাকনির মধ্যে পরিষ্কার লাল পট্টি চোখে পড়ে। মোট কথা দেখতে খুবই অসাধারণ সুন্দর একটি পাখি! বাংলাদেশ বাদে ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায় এ পাখির বাস রয়েছে। আর্দ্র পাতাঝরা বন, বৃক্ষবহুল এলাকা, উদ্যান, বাগান ও আবাদি জমিতে এ পাখি বিচরণ করে। ইংরেজিতে এই পাখির নাম আলেকজেন্ডার প্যারাকিট রাখা হয়। তার একটি কারণ আছে। ইতিহাসের পাতা থকে পাওয়া যায়, সম্রাট আলেকজান্ডার পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে এই পাখিগুলো ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করেন, যেখানে এগুলো সম্ভ্রান্ত মানুষদের মধ্যে উচ্চমূল্যের শৌখিন পাখি ছিল এবং এগুলো তারা বড় খাঁচায় পুষত। তাই সম্রাট আলেকজান্ডারের নামানুসারে ১৭৬৬ সালে এই প্রজাতি টিয়ার নামকরণ করা হয় অ্যালেকজানড্রিন প্যারাকিট। বাংলায় চন্দনা। চন্দনার বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ সম্ভ্রান্ত বংশীয়, অথবা অভিজাত দেশোদ্ভুত। বৈজ্ঞানিক নামটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় লাতিন শব্দ সিটাকিউলা মানে তোতা আর গ্রিক ইউ মানে সম্ভ্রান্ত বা ভালো এবং প্যাট্রিয়া মানে বংশ অথবা পিতৃভূমি। সুতরাং সম্ভ্রান্ত বংশীয়। ফ্রেঞ্চ প্রাণিবিদ ম্যাথুরিন জ্যাক ব্রিসোঁ প্রথমে একে সিটাকা জিনজিনিয়ানা বা লা পেরুশ দ্য জিঞ্জি অর্থাৎ দ্য জিঞ্জিস প্যারাকিট বলেন ১৭৬০ সালে। যা কিনা দক্ষিণ ভারতীয় একটি শহর যেখানে একদা ফ্রেঞ্চদের ফাঁড়ি ছিল। ১৭৬৬ বা তৎকালীন সময়ে বন্দীদশায় এ পাখিকে খাঁচায় পুরে কথা শেখান হতো। জানা যায়, যে যেসব পাখি বন্দীদশায় শিস দিতে শিখেছিল তারা পরবর্তীতে আর কথা বলতে পারেনি। সে আমলে সার্কাসের চাহিদা থাকায় এই পাখিকে ব্যবহার করে নানা রকম কসরত করিয়ে নেওয়া হতো। ফ্রেঞ্চরা তৎকালীন পাখি শিকারীদের কাছ থকে জেনে ছিলেন যে অন্ধর অস্রবাদ উপত্যকার এবং গুজরাটের রাজপিপলা অঞ্চলের চন্দনা পাখি দ্রুত কথা শিখতে পারে। তাই তাদের চাহিদা ছিল বেশি। এই পাখির একটি বিশেষ গুণ হলো এর দুটো আঙ্গুল সামনে ও দুটো পিছনে, আর এই কারণেই এরা পা বা ঠোঁটের সাহায্যে যেকোনো জিনিস বেয়ে উঠতে পারে। এরা মানুষের মতো খাবার বেলায় ডান বা বাম হাতি। বাংলায় এই পাখিকে হিরামন বা পাহাড়ি তোতা বা চন্দনা টিয়া বলা হয়। আরও পড়ুন: ডিম পাড়তে এসে জীবন দিতে হচ্ছে কচ্ছপদের যন্ত্র নয়, এক তরুণের সাহসের প্রতীক এটি চন্দনা টিয়ার খাদ্যের তালিকায় আছে জাম, ধান, গম, ভুট্টা, জামরুল, খেজুর, বুনো ফল, ফুলের মিষ্টি রস ও ফুলের কচি অংশ। প্রজনন মৌসুমে নারকেল ও নানা জাতের গাছের ফোকরে বাসা বাঁধে। মহাবিপন্ন চন্দনা টিয়া বাংলাদেশের লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্তের কাছে ও শেরপুরে এই পাখি দেখা যেত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লালমনিরহাটের সীমান্তের কাছে একটি বড় শিমুলগাছে প্রতিবছর এ পাখি বাসা করত। শিমুলগাছটি কেটে ফেলা হয়েছে। শেরপুরের যে গ্রামের নারকেলগাছে বাসা করত, সে গাছটিও কেটে ফেলা হয়েছে। এ যেন উদাহরণ মাত্র। দেশের নানা অঞ্চলে মিলবে এমন খবর। হয়ত বইয়ের পাতায় পড়ে আমাদের প্রজন্ম প্রশ্ন করবে- চন্দনারা কই? জেএস/

Share this post: